প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিশ্রুত প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার প্রকল্প ঋণের মধ্যে জুন পর্যন্ত ৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ছাড় না হয়ে আটকে আছে। প্রকল্প প্রস্তুতি, মূল্যায়ন, অনুমোদন, অর্থায়ন চুক্তি ও প্রথম কিস্তি ছাড়ের বিভিন্ন ধাপে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল নকশা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাংকের পর্ষদ অনুমোদনের পর অর্থায়ন চুক্তি সই, চুক্তি কার্যকর এবং প্রথম কিস্তি ছাড় হতে গড়ে ১১ দশমিক ৮ মাস সময় লাগে। অথচ বিশ্বব্যাংকের ঋণে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ড থাকে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরুর আগেই গ্রেস পিরিয়ডের প্রায় এক বছর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বর্তমানে চলমান ৩৭টি প্রকল্পের মধ্যে ১৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের বোর্ড অনুমোদিত আরও চারটি প্রকল্প, যার অর্থায়নের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
দুর্বল নকশায় বাড়ছে সময় ও ব্যয়
ইআরডির মূল্যায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হিসেবে দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও অপর্যাপ্ত প্রকল্প প্রস্তুতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ফিজিবিলিটি স্টাডি যথাযথভাবে সম্পন্ন না হওয়ায় অসম্পূর্ণ বা ত্রুটিপূর্ণ নকশার ভিত্তিতে প্রকল্প অনুমোদন করা হচ্ছে।
পরবর্তীতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে অনুমোদিত নকশার মিল পাওয়া যায় না। ফলে নকশা সংশোধন, পুনরায় কাজ এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হয়। এতে প্রকল্পের বাস্তবায়নকালও দীর্ঘায়িত হয়।
এ ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি), বিশ্বব্যাংকের প্রজেক্ট অ্যাপ্রাইজাল ডকুমেন্ট এবং ফাইন্যান্সিং অ্যাগ্রিমেন্টের মধ্যে তথ্যের অসামঞ্জস্যও প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে।
প্রকল্প পরিচালক বদল ও জমি অধিগ্রহণে জট
প্রকল্প অনুমোদনের পর ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের কারণেও বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক প্রকল্পে সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিটে পরিচালক ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা হয় না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জমি অধিগ্রহণের দীর্ঘসূত্রতা এবং দরপত্র আহ্বান ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব। এসব প্রশাসনিক জটিলতা প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরুর পরও দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ ছাড়ের গতি কমিয়ে রাখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যাগুলো চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়; প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থতার জন্য কারা দায়ী, সেটিও নির্ধারণ করা জরুরি। জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে একই ধরনের সমস্যা বারবার ফিরে আসতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও প্রকল্পের গতিপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করা কাঠামোগত সমস্যাগুলো সরাসরি মোকাবিলা না করলে সংস্কারের আহ্বান বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেওয়ার বদলে কেবল আশ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
ঋণ আলোচনাতেও সমন্বয়ের ঘাটতি
ইআরডির মূল্যায়নে প্রকল্প প্রস্তুতির সময় বিশ্বব্যাংকের কারিগরি দল ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির বিষয়টিও উঠে এসেছে। প্রাথমিক ডিপিপি তৈরির সময় প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি যথাযথভাবে প্রস্তুত না থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত ঋণ আলোচনা শুরু করা হয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক লিখিত নথির পরিবর্তে মৌখিক তথ্যের ভিত্তিতেও ঋণ আলোচনা ও কার্যবিবরণী সই করার নজির পাওয়া গেছে।
‘ডিজিটাল সিস্টেমস ফর ট্রান্সপারেন্সি, অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ বা ডি-স্টার প্রকল্পের ঋণ আলোচনার ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভার কার্যবিবরণীতে বেশ কিছু অবাস্তব শর্তের বিষয় সামনে আসে।
একই ধরনের সমস্যা দেখা যায় মেট্রো রেল লাইন-২ (গাবতলী-নারায়ণগঞ্জ) প্রকল্পের ক্ষেত্রেও। মৌখিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ঋণ আলোচনার কার্যবিবরণী সই হওয়ার পর প্রকল্পটি পরবর্তী পর্যায়ে গিয়ে স্থবির হয়ে পড়ে।
চার প্রকল্পে আটকে ১.৫৭ বিলিয়ন ডলার
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প প্রস্তুতির সময়সূচি ও বিশ্বব্যাংকের বোর্ড অনুমোদনের সময়ের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় চারটি প্রকল্পে অন্তত ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন আটকে রয়েছে।
এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ডিজিটাল এন্টারপ্রেনারশিপ প্রজেক্ট, বে টার্মিনাল প্রজেক্ট, এনহ্যান্সিং ডিজিটাল গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ইকোনমি প্রজেক্ট এবং ওয়েস্টার্ন ইকোনমিক করিডোর অ্যান্ড রিজিওনাল এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম।
ইআরডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রকল্প প্রস্তুতির কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়া প্রয়োজন। এতে বোর্ড অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের মধ্যবর্তী সময় কমানো সম্ভব হবে।
অনুমোদনের পরও অর্থ ছাড়ে দীর্ঘ অপেক্ষা
বিশ্বব্যাংকের বোর্ডে প্রকল্প অনুমোদনের পরও অনেক প্রকল্প দ্রুত কার্যকর হচ্ছে না। প্রশাসনিক ও নীতিগত জটিলতার কারণে নতুন অনুমোদিত প্রকল্পগুলো পুরোপুরি কার্যকর হতে এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় নিচ্ছে।
বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্ট এবং ইলেকট্রিসিটি ডিস্ট্রিবিউশন মডার্নাইজেশন প্রোগ্রামসহ চারটি বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে কার্যকর হওয়ার বিলম্বের কারণেই অব্যবহৃত তহবিলের পরিমাণ আরও ১ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।
অর্থাৎ শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি নয়, প্রকল্প কার্যকর করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও ঋণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘অ্যাক্টিভ পোর্টফোলিও’ নিয়েও বিভ্রান্তি
বিশ্বব্যাংক ও ইআরডির মধ্যে ‘অ্যাক্টিভ পোর্টফোলিও’ বা সক্রিয় প্রকল্পের সংজ্ঞায়ও পার্থক্য রয়েছে। বিশ্বব্যাংক তাদের বোর্ড অনুমোদিত প্রতিটি প্রকল্পকে সক্রিয় হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে ইআরডি অর্থায়ন চুক্তি সই হয়েছে এমন প্রকল্পগুলোকে সক্রিয় হিসেবে গণনা করে।
এর ফলে ছাড় না হওয়া ঋণের পরিমাণ নিয়ে ভিন্ন চিত্র তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্ট এবং এনার্জি সেক্টর সিকিউরিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্টের ক্ষেত্রে এমন পার্থক্য রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বোর্ড প্রকল্প দুটি অনুমোদন করলেও এখনো অর্থায়ন চুক্তি সই হয়নি। ফলে বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এগুলো সক্রিয় প্রকল্প হলেও ইআরডির হিসাবে পরিস্থিতি ভিন্ন।
বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্টে বিশ্বব্যাংকের ২৯০ মিলিয়ন ডলার এবং এনার্জি সেক্টর সিকিউরিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্টে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
মেয়াদ বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত অর্থায়নেও সমন্বয়হীনতা
প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো এবং অতিরিক্ত অর্থায়নের ক্ষেত্রেও ইআরডি, বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হেলথ সেক্টর সাপোর্ট প্রোগ্রাম এবং কোভিড-১৯ প্রজেক্টে স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়াই মেয়াদ বাড়ানোর প্রবণতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। আবার বাংলাদেশ সাসটেইনেবল রিকভারি, ইমার্জেন্সি প্রিপেয়ার্ডনেস অ্যান্ড রেসপন্স প্রজেক্ট এবং রিকভারি অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট অব ইনফরমাল সেক্টর এন্টারপ্রাইজেস প্রজেক্টে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই অতিরিক্ত অর্থায়নের আবেদন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাংকের ঋণ বাংলাদেশের উন্নয়ন অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু অর্থ ছাড়ের আগে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতা থাকলে প্রতিশ্রুত অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
তাই শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ বা বড় অঙ্কের ঋণ প্রতিশ্রুতি পাওয়ার দিকে নজর না দিয়ে প্রকল্পের মানসম্মত প্রস্তুতি, বাস্তবসম্মত নকশা, দ্রুত অনুমোদন, দক্ষ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং সময়মতো অর্থ ছাড় নিশ্চিত করাই এখন বড় অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন।