প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চীনের মানবাকৃতি রোবট নির্মাতা ইউনিট্রি রোবোটিকস সাংহাইয়ের স্টার মার্কেটে তালিকাভুক্তির প্রথম দিনেই বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহের মুখে পড়েছে। লেনদেন শুরুর পর কোম্পানিটির শেয়ারের দাম একপর্যায়ে ৬০০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। পরে কিছুটা কমলেও দিনের শুরুতেই এমন উত্থান চীনের দ্রুত বিকাশমান রোবটশিল্পে বিনিয়োগকারীদের আস্থার বড় ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বহুল প্রত্যাশিত প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর পর ইউনিট্রির শেয়ার প্রায় ১ হাজার ১০০ ইউয়ানে লেনদেন শুরু হয়, যা ছিল কোম্পানিটির নির্ধারিত ইস্যু মূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। পরে শেয়ারের দাম কিছুটা কমে প্রায় ৯০০ ইউয়ানের কাছাকাছি নেমে আসে। তবু প্রথম দিনের এই উত্থান কোম্পানিটির বাজারমূল্য এবং চীনের মানবাকৃতি রোবট খাতের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
চীনের মূল ভূখণ্ডে মানবাকৃতি রোবট নির্মাতা কোনো কোম্পানির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে ইউনিট্রির অভিষেককে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সাংহাইয়ের স্টার মার্কেটকে অনেক সময় চীনের ‘ন্যাসডাক’ বলা হয়। প্রযুক্তিনির্ভর ও উদ্ভাবনী কোম্পানিগুলোর জন্য তৈরি এই বাজারে ইউনিট্রির প্রবেশ চীনের রোবট খাতের পরিণত হওয়ার ইঙ্গিতও দিচ্ছে।
রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা যখন তীব্র হচ্ছে, ঠিক তখনই ইউনিট্রির শেয়ারবাজারে অভিষেক হলো। শিল্পকারখানার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে ঘরোয়া স্মার্ট ভ্যাকুয়াম ক্লিনার পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের রোবট ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখন মানুষের মতো দেখতে এবং দুই পায়ে হাঁটতে সক্ষম মানবাকৃতি রোবট তৈরিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
টেসলা, বিওয়াইডি ও অ্যামাজনের মতো বড় কোম্পানিগুলোও এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। মানুষের মতো হাঁটা, বস্তু বহন, বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার এবং নির্দিষ্ট পরিবেশে মানুষের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা অর্জনের দিকে দ্রুত এগোচ্ছে এই রোবটগুলো।
একসময় মানবাকৃতি রোবট ছিল মূলত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ও চলচ্চিত্রের বিষয়। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেন্সর, কম্পিউটার ভিশন এবং উন্নত ব্যাটারি প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সেই ধারণা এখন বাস্তব শিল্পে পরিণত হচ্ছে। ভবিষ্যতে কারখানা, হাসপাতাল, গুদাম এমনকি মানুষের ঘরেও রোবট সহকারী হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
রোবটশিল্পে নতুন মানদণ্ড
ইউনিট্রির শেয়ারবাজারে প্রবেশ শুধু একটি কোম্পানির তালিকাভুক্তি নয়; এটি চীনের রোবট খাতে বিনিয়োগকারীদের বাড়তে থাকা আগ্রহেরও প্রতিফলন। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান রোবোস্ট্র্যাটেজির জ্যাক পিয়ারসনের মতে, ইউনিট্রির আইপিও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য মানবাকৃতি রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের একটি বিরল সুযোগ তৈরি করেছে।
তার মতে, ইউনিট্রির সাফল্য চীনের রোবটশিল্পকে একটি ‘পরিবর্তনের পর্যায়ে’ নিয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতে একই খাতের অন্যান্য কোম্পানির জন্য এটি একটি মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারে।
এর আগে তুলনামূলক ছোট চীনা রোবট নির্মাতা ইউবিটেক রোবোটিকস হংকংয়ের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানটি এমন কিছু মানবাকৃতি রোবট উন্মোচন করে, যেগুলো মানুষের সঙ্গে দৈনন্দিন যোগাযোগ ও আবেগগত সহায়তার জন্য তৈরি বলে জানানো হয়।
ইউবিটেক ও ইউনিট্রির পর লেজু রোবোটিকস, এজিবটসহ আরও কয়েকটি চীনা রোবট কোম্পানি আগামী কয়েক মাসে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে চীনের রোবট খাতে বিনিয়োগের পরিধি আরও বাড়তে পারে।
তবে এই শিল্প নিয়ে ব্যাপক আশাবাদের পাশাপাশি কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘরের কাজে মানুষের বিকল্প হিসেবে কার্যকরভাবে ব্যবহারযোগ্য রোবট তৈরি করতে এখনো কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। ব্যাটারির স্থায়িত্ব, নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার মতো বিষয়গুলো এখনো সমাধানের অপেক্ষায়।
বিশেষজ্ঞ হ্যারল্ড সো মনে করেন, প্রাথমিক পর্যায়ে কারখানা ও হাসপাতালের মতো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশেই মানবাকৃতি রোবটের সবচেয়ে বড় বাজার তৈরি হতে পারে।
চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন ক্ষেত্র
রোবট প্রযুক্তি এখন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। দুই দেশই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তিকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন গত জুলাইয়ে জাতীয় নিরাপত্তা ও মার্কিন উৎপাদন খাত সুরক্ষার যুক্তিতে চীনে তৈরি নতুন মানবাকৃতি ও চার পায়ের রোবট আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়। বেইজিং অবশ্য এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে এবং ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক বিষয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছে।
চীনা রোবট কোম্পানিগুলোর দ্রুত উত্থান এই প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করছে। পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের ক্রিস্টিন ওয়ানের মতে, রোবটশিল্পে চীনের অগ্রগতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে দেশটির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে কতটা গভীরভাবে যুক্ত হয়ে গেছে।
তার মতে, চীনা সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করলে অনেক দেশের নিজস্ব উৎপাদনব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হতে পারে। ফলে চীনের প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়া সহজ হবে না।
বর্তমানে শিল্পকারখানা ও ভোক্তা পর্যায়ে চীনা রোবট কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি পশ্চিমা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ডায়নামিকস জানিয়েছে, দুই বছরের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাইয়ের কারখানায় তাদের মানবাকৃতি রোবট ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
টেসলাও তাদের ‘অপ্টিমাস’ মানবাকৃতি রোবট নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে কোম্পানিটি জানায়, ক্যালিফোর্নিয়ায় তাদের গাড়ি উৎপাদন কারখানায় অপ্টিমাস তৈরির কাজ করা হবে। অ্যামাজনও ২০২৩ সালে নিজেদের গুদামে মানবাকৃতি রোবট ব্যবহারের পরীক্ষা চালিয়েছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের রোবটপ্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।
চীনের রোবট উত্থান কতটা টেকসই?
রোবট গবেষক ডেভিড সু মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র রোবটপ্রযুক্তিতে নেতৃত্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। তার মতে, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি আলোচনায় এখন চীনা রোবট কোম্পানিগুলোর উপস্থিতিই বেশি চোখে পড়ছে।
ইউনিট্রি রোবোটিকসের প্রথম দিনের শেয়ারদর বৃদ্ধি সেই প্রবণতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে। তবে শেয়ারের অস্বাভাবিক উত্থান কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। রোবট শিল্প এখনো দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত, আর্থিক ও নিয়ন্ত্রক নানা চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে।
তবু ইউনিট্রির আইপিওর সাফল্য একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে—মানবাকৃতি রোবট আর কেবল ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়। এটি ইতোমধ্যে বিনিয়োগ, শিল্পনীতি এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। চীনের রোবট কোম্পানিগুলোর শেয়ারবাজারে প্রবেশ সেই পরিবর্তনকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।