এআইয়ের সঙ্গে চাকরি বাঁচানোর লড়াই চীনের কর্মীদের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ২১ বার
এআইয়ের সঙ্গে চাকরি বাঁচানোর লড়াই চীনের কর্মীদের

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তার বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে, তেমনি অনেক প্রচলিত কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে। চীনেও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। চালকবিহীন ট্যাক্সি থেকে শুরু করে অফিসের বিভিন্ন কাজ, এমনকি সৃজনশীল শিল্পেও এআইয়ের ব্যবহার বাড়ায় কর্মীদের মধ্যে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নিজেদের কাজের ধরন ও দক্ষতা বদলানোর চেষ্টা করছেন দেশটির অনেক কর্মী।

চীনের উহান শহরের ৪৫ বছর বয়সী ট্যাক্সিচালক ইয়াও শিননংয়ের অভিজ্ঞতা এ পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ২০২২ সালে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান বাইদু উহানে ‘অ্যাপোলো গো’ নামে চালকবিহীন ট্যাক্সি সেবা চালু করে। ধীরে ধীরে স্বয়ংক্রিয় গাড়ির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচলিত ট্যাক্সি চালকদের আয়ের ওপরও চাপ তৈরি হয়। ইয়াওয়ের ক্ষেত্রে এর প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। চালকবিহীন ট্যাক্সির বিস্তারের পর তার আয় প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায় বলে জানা গেছে।

প্রযুক্তির ওপর মানুষের আস্থার প্রশ্নও অবশ্য সামনে এসেছে। চলতি বছরের মার্চে অ্যাপোলো গো-এর কয়েকটি গাড়ি উহানের রাস্তায় হঠাৎ থেমে যাওয়ার ঘটনায় যাত্রীরা দীর্ঘ সময় আটকে পড়েন। পরে তদন্তের স্বার্থে কয়েক মাস শহরের সড়ক থেকে এসব গাড়ি সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাটি চালকবিহীন প্রযুক্তির সক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করে।

এর আগেও চালকবিহীন ট্যাক্সির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন উহানের ট্যাক্সিচালকেরা। ২০২৪ সালে এ প্রযুক্তির বিরুদ্ধে চালকদের বিক্ষোভের খবর সামনে আসে। তবে ওই বিক্ষোভে কতজন অংশ নিয়েছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। বিক্ষোভ-সংক্রান্ত তথ্য দ্রুত নিয়ন্ত্রণ বা সেন্সর করা হয়েছিল বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এআইয়ের প্রভাব কেবল ট্যাক্সি খাতেই সীমাবদ্ধ নেই। চীনের শ্রমবাজার এমনিতেই নানা চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আবাসন ও শিক্ষা খাতের মতো একসময় বড় কর্মসংস্থানের উৎস হিসেবে বিবেচিত খাতগুলোতে সংকট তৈরি হওয়ায় অনেক কর্মী বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন। তাদের একটি বড় অংশ রাইড-হেইলিং, খাবার সরবরাহ, পণ্য পরিবহনসহ বিভিন্ন গিগভিত্তিক কাজে যুক্ত হয়েছেন।

ফলে এআইয়ের বিস্তার শ্রমবাজারে নতুন ধরনের চাপ তৈরি করছে। যে কাজগুলোতে আগে মানুষের সরাসরি উপস্থিতি প্রয়োজন ছিল, সেগুলোর কিছু অংশ এখন অটোমেশন ও এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে কম দক্ষতার কাজের পাশাপাশি কিছু অফিসভিত্তিক কাজও ভবিষ্যতে প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর চীনে নমনীয় বা অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে যুক্ত মানুষের সংখ্যা ৩২ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। ২০১৯ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ কোটি। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে এ ধরনের কাজের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশটির মোট কর্মশক্তির প্রায় ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত এই ধরনের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন বলে হিসাবটি ইঙ্গিত দেয়।

এই পরিস্থিতিতে এআইয়ের বিস্তারকে শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যাচ্ছে। এটি এখন শ্রমবাজার, আয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কর্মীদের ভবিষ্যৎ দক্ষতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যারা গিগ অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির বিস্তার নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

চীনের সরকারও বিষয়টি নিয়ে আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হচ্ছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলনে এআইকে অভিন্ন সমৃদ্ধি ও সবার নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি হিসেবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অর্থাৎ চীনের নীতিনির্ধারণে এআইকে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে নয়, বৃহত্তর সামাজিক স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

এআইয়ের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ এখন শ্বেত-কলার কর্মীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সফটওয়্যার, কনটেন্ট তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ, গ্রাহকসেবা ও প্রশাসনিক কাজের কিছু অংশ এআইয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হওয়ায় কর্মীদের দায়িত্বের ধরন বদলে যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে কর্মীসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হচ্ছে বলে আলোচনা রয়েছে।

চীনের কয়েকটি আদালতের সাম্প্রতিক রায়ও বিষয়টিকে আলোচনায় এনেছে। এআই প্রযুক্তির কারণে চাকরি হারানো কিছু কর্মীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এর ফলে কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে কর্মীদের অধিকার ও নিয়োগকর্তার দায়িত্বের প্রশ্নও সামনে এসেছে।

তবে কর্মীদের উদ্বেগ শুধু বর্তমান চাকরি হারানো নিয়ে নয়। অনেকের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের আগেই এআই তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে। একজন নতুন কর্মীকে নিয়োগ দেওয়ার পরিবর্তে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি এআইভিত্তিক সফটওয়্যার বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ব্যবহার করে, তাহলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে যেতে পারে। বিশেষ করে একই ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের সম্ভাবনা বেশি।

এ অবস্থায় চীনের অনেক কর্মী নিজেদের দক্ষতা পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন। প্রযুক্তিকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পাশাপাশি সেটিকে নিজেদের কাজের অংশ হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতাও বাড়ছে। এআই পরিচালিত ব্যবস্থার সঙ্গে কাজ করা, প্রযুক্তিনির্ভর নতুন দক্ষতা অর্জন এবং মানুষের জন্য তুলনামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এমন সৃজনশীল বা সিদ্ধান্তনির্ভর কাজে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো—এসবই কর্মীদের টিকে থাকার কৌশলের অংশ হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনা সরকার চাইলে এআইয়ের কারণে কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলকভাবে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে। বেইজিং প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মী নিয়োগে উৎসাহিত বা নির্দেশ দিতে পারে এবং এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থান রক্ষার নীতি গ্রহণ করতে পারে।

তবে প্রযুক্তির গতি এবং সরকারি নীতির বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান কতটা থাকবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। কারণ এআই দ্রুত উন্নত হচ্ছে এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন খরচ কমানো ও দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারে আগ্রহী। অন্যদিকে কর্মসংস্থান ধরে রাখার বিষয়টি সরকারের জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

চীনের অভিজ্ঞতা তাই বিশ্ব শ্রমবাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দিচ্ছে। এআই একদিকে নতুন শিল্প, নতুন দক্ষতা ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে পুরোনো অনেক কাজের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের প্রতিযোগিতা নয়, বরং মানুষ কীভাবে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজের দক্ষতার মূল্য বাড়াতে পারে—সেটিই হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যৎ কর্মজগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত