ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বসছে ৪৯০ এআই ক্যামেরা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বসছে ৪৯০ এআই ক্যামেরা

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিনির্ভর ৪৯০টি ক্যামেরা ও অটো ফাইন সিস্টেম চালু করা হয়েছে। মহাসড়কে গতি সীমা লঙ্ঘন, ট্রাফিক আইন অমান্য, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংসহ বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর ফলে মহাসড়কে যানবাহন চলাচল আরও নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মঙ্গলবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের মেঘনাঘাট এলাকায় হাইওয়ে পুলিশ কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল মনিটরিং সেন্টারে আধুনিক এআই ক্যামেরা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ তথ্য জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যানবাহনের চলাচল সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে মোট ৪৯০টি ক্যামেরা এবং অটো ফাইন সিস্টেমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোনো যানবাহন নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করলে, ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে, উল্টো পথে চললে কিংবা ওভারটেকিংয়ের ক্ষেত্রে নিয়ম না মানলে ক্যামেরার মাধ্যমে তা শনাক্ত করা হবে। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যে সাইন, সংকেত ও নির্দেশনা দেওয়া থাকবে, সেগুলো অমান্য করলেও জরিমানা আরোপের আওতায় আসবে সংশ্লিষ্ট যানবাহন।

নতুন ব্যবস্থায় জরিমানার প্রক্রিয়াটিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, কোনো গাড়ির বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপ হলে সেই তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের কাছে চলে যাবে। পরে গাড়ির নিবন্ধিত মালিকের মোবাইল ফোনে জরিমানার তথ্য জানিয়ে বার্তা পাঠানো হবে। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মোবাইল ফোন বা সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে জরিমানা পরিশোধের সুযোগও থাকবে।

সড়ক পরিবহনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর এই উদ্যোগকে মহাসড়কের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা, অনিয়মিত ওভারটেকিং, উল্টো পথে চলাচল এবং ট্রাফিক সংকেত অমান্য করার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ হওয়ায় এখানে যানবাহনের চাপও তুলনামূলক বেশি।

এই মহাসড়ক দেশের রাজধানী ঢাকার সঙ্গে বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, ব্যক্তিগত গাড়ি, পণ্যবাহী যান ও অন্যান্য পরিবহন এ পথে চলাচল করে। শিল্প ও বাণিজ্যের জন্যও মহাসড়কটির গুরুত্ব অনেক। ফলে এখানে কোনো বড় দুর্ঘটনা বা দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হলে তার প্রভাব শুধু স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; দেশের পণ্য সরবরাহ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

নতুন এআই ক্যামেরা ব্যবস্থা চালুর ফলে যানবাহন চালকদের মধ্যে নিয়ম মেনে চলার প্রবণতা বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এত দিন ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে অনেক সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি এবং সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর নির্ভর করতে হতো। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট কিছু অনিয়ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হলে আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা বাড়তে পারে।

তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি চালকদের সচেতন করাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য হাইওয়ে পুলিশ ও বাংলাদেশ পুলিশ পত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত প্রচার চালাবে। এর মাধ্যমে মহাসড়কে চলাচলের নিয়ম, গতি সীমা, ট্রাফিক সংকেত এবং অন্যান্য বিধিবিধান সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জরিমানা আরোপ করে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা, মহাসড়কের অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যাপ্ত সাইন ও সংকেত স্থাপন এবং নিয়মিত নজরদারি—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। এআই ক্যামেরা সেই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। বিশেষ করে কোনো চালক আইন ভঙ্গ করার পর তা শনাক্ত হওয়ার নিশ্চয়তা তৈরি হলে আইন অমান্যের প্রবণতা কমতে পারে।

এ ব্যবস্থার আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো, মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে ট্রাফিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা। কন্ট্রোল মনিটরিং সেন্টার থেকে ক্যামেরার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো পর্যবেক্ষণ করা গেলে দুর্ঘটনা, যানজট বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দ্রুত শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে। এতে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ইউনিটকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পাঠানো এবং যান চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া সহজ হতে পারে।

অটো ফাইন সিস্টেম চালুর ফলে জরিমানা আদায়ের ক্ষেত্রেও একটি ডিজিটাল কাঠামো তৈরি হবে। গাড়ির নিবন্ধিত মালিকের কাছে সরাসরি বার্তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকায় আইন ভঙ্গের তথ্য দ্রুত জানানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমে জরিমানা পরিশোধের সুযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জরিমানা দিতে আলাদা জায়গায় গিয়ে সময় ব্যয় করতে হবে না।

তবে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে তথ্যের নির্ভুলতা ও প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্যামেরায় কোনো যানবাহনের নম্বর সঠিকভাবে শনাক্ত হচ্ছে কি না, কোনো পরিস্থিতিকে ভুলভাবে আইন ভঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে কি না এবং জরিমানার তথ্য সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি জরিমানার বিরুদ্ধে আপত্তি বা ভুল শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রতিদিন চলাচলকারী চালক ও যাত্রীদের জন্যও নতুন এই ব্যবস্থা একটি পরিবর্তিত বাস্তবতা তৈরি করবে। চালকদের এখন শুধু সড়কে দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নজরদারি নয়, প্রযুক্তিনির্ভর স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। ফলে নির্ধারিত গতিসীমা ও ট্রাফিক বিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্ব বাড়বে।

বিশেষ করে পণ্যবাহী ভারী যানবাহনের চালকদের ক্ষেত্রে গতি নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ ওভারটেকিং গুরুত্বপূর্ণ। মহাসড়কে দ্রুতগতির যানবাহনের পাশাপাশি ধীরগতির যান চলাচল করায় ভুলভাবে ওভারটেকিং প্রায়ই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এআই ক্যামেরা এ ধরনের অনিয়ম শনাক্ত করতে সক্ষম হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে তা সহায়ক হতে পারে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাইওয়ে পুলিশের অ্যাডিশনাল আইজি ফারুক আহমেদ সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের সভাপতি শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসকসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআই ক্যামেরা ও অটো ফাইন সিস্টেম চালুর মাধ্যমে আইন প্রয়োগ আরও কার্যকর হবে। তবে উদ্যোগটির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে প্রযুক্তির নির্ভুল ব্যবহার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতার ওপর।

মহাসড়কে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নয়; চালক, পরিবহন মালিক, যাত্রী এবং পথচারী—সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। প্রযুক্তি সেই দায়িত্ব পালনের পরিবেশ তৈরি করতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য আইন মানার সংস্কৃতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৪৯০টি এআই ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ তাই কেবল নজরদারি বাড়ানোর পদক্ষেপ নয়। এটি সড়ক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর একটি বড় উদ্যোগ, যার লক্ষ্য দুর্ঘটনা ও অনিয়ম কমিয়ে মহাসড়কে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা। এখন এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায় এবং এর মাধ্যমে চালকদের আচরণে কতটা পরিবর্তন আসে, সেটিই হবে পরবর্তী সময়ে এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত