চট্টগ্রামে চালু হলো নারীদের বিশেষ বাস সার্ভিস

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬ বার
চট্টগ্রামে চালু হলো নারীদের বিশেষ বাস সার্ভিস

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রাম নগরীতে নারীদের নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চালু হয়েছে বিশেষ ‘মহিলা বাস সার্ভিস’। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) উদ্যোগে প্রাথমিকভাবে দুটি বাস দিয়ে মঙ্গলবার থেকে এ সেবা শুরু হয়েছে। বাস দুটির চালক ও সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নারীরা। নগরীর কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র এলাকা থেকে ফ্রি পোর্ট হয়ে পতেঙ্গা পর্যন্ত নির্ধারিত রুটে চলবে বাস দুটি।

মঙ্গলবার দুপুরে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাস সার্ভিসটির উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের পর চট্টগ্রামের ব্যস্ত সড়কে বিশেষ এই বাস নামার মধ্য দিয়ে নগরীর নারী যাত্রীদের গণপরিবহন ব্যবহারে নতুন একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। রাজধানীর পর চট্টগ্রামেও এমন সেবা চালু হওয়ায় কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

বিআরটিসির এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু নারীদের জন্য আলাদা পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি করা নয়; একই সঙ্গে গণপরিবহন খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। ফলে একদিকে যেমন নারী যাত্রীরা নিজেদের জন্য নির্ধারিত পরিবহনে চলাচলের সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে নারী চালক ও সহকারীদের জন্যও তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র।

চট্টগ্রাম নগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচলের চাহিদা পূরণ করে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, হাসপাতাল ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে যাতায়াত করেন হাজারো নারী। কিন্তু ব্যস্ত সময়ে অতিরিক্ত ভিড়, আসনসংকট, ওঠানামার সময় ধাক্কাধাক্কি এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেক নারীকে প্রতিদিন নানা ধরনের ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে কর্মজীবী নারী ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিনের যাতায়াত অনেক সময় বাড়তি মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এই বাস্তবতায় নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিসের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল। নতুন এই সেবা সেই প্রয়োজনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক উত্তর হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে উদ্যোগটি কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে বাসগুলোর নিয়মিত চলাচল, সময়ানুবর্তিতা, নিরাপত্তা, যাত্রী ওঠানামার শৃঙ্খলা এবং চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাসের সংখ্যা বাড়ানোর ওপর।

চট্টগ্রামের জন্য নির্ধারিত দুটি বাসের মধ্যে একটি দ্বিতল বাস। এতে রয়েছে ৭৫টি আসন। অপর বাসটিতে রয়েছে ৪৫টি আসন। দ্বিতল বাসটিতে একজন নারী চালকের পাশাপাশি দুজন নারী সহকারী দায়িত্ব পালন করবেন। অন্য বাসটিতে থাকবেন একজন নারী চালক ও একজন নারী সহকারী। নারী কর্মীদের মাধ্যমে বাস পরিচালনার বিষয়টি এই উদ্যোগকে অন্য সাধারণ গণপরিবহন সেবা থেকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

বাস দুটি কালুরঘাট থেকে শুরু করে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা অতিক্রম করে পতেঙ্গায় পৌঁছাবে। এ রুটে আবাসিক এলাকার পাশাপাশি রয়েছে শিক্ষা, ব্যবসা, শিল্প ও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে নিয়মিত যাতায়াতকারী নারী যাত্রীদের একটি বড় অংশ এই সেবা থেকে উপকৃত হতে পারেন। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত রুটে ১২টি পয়েন্টে নারী যাত্রীদের ওঠানামার সুযোগ রাখা হয়েছে।

বিশেষ করে কালুরঘাট, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, জিইসি, আগ্রাবাদ, ফ্রি পোর্ট ও পতেঙ্গার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে একই রুটে যুক্ত করার ফলে নতুন বাস সার্ভিসটি নগরীর পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের মধ্যে নারী যাত্রীদের যাতায়াতে সহায়ক হতে পারে। কর্মস্থলে যাওয়া নারী, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন প্রয়োজনে নগরীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করা নারীদের জন্য নির্দিষ্ট এই পরিবহন ব্যবস্থা দৈনন্দিন যাত্রায় কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করা সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারের উদ্দেশ্য অনুযায়ী নারী যাত্রীরা এই সেবা থেকে নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য পাবেন। একই সঙ্গে নারী চালক ও সহকারীদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টিকে তিনি নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধির একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিভাগের প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশ প্রশাসনের প্রতিনিধি, বিআরটিএ ও বিআরটিসির কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের উপস্থিতিতে নতুন সেবাটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, এখন সেটিকে বাস্তব সেবায় রূপ দেওয়াই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বড় দায়িত্ব।

নারীদের জন্য পৃথক বাস চালুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে নিরাপত্তা ও নিয়মিত পরিচালনা। একটি বাস শুধু নারী যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত করলেই নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত হয় না। বাসের চালকের দক্ষতা, সহকারীদের আচরণ, সড়ক নিরাপত্তা, নির্ধারিত স্টপেজে যাত্রী ওঠানামা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সার্ভিসের ক্ষেত্রে এসব বিষয় নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পরিবহনসংশ্লিষ্টরা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়সূচি। কর্মজীবী নারী ও শিক্ষার্থীদের কাছে একটি বাস সার্ভিস তখনই কার্যকর হয়ে ওঠে, যখন তারা নির্ভরযোগ্যভাবে জানেন কখন বাসটি নির্দিষ্ট স্টপেজে পাওয়া যাবে। দীর্ঘ অপেক্ষা বা অনিয়মিত ট্রিপ হলে যাত্রীদের প্রত্যাশিত সুবিধা অনেকটাই কমে যেতে পারে। ফলে যাত্রী চাহিদা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রিপের সংখ্যা সমন্বয় করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

চট্টগ্রামের নারী যাত্রীদের জন্য এই উদ্যোগের আরেকটি তাৎপর্য রয়েছে কর্মসংস্থানের দিক থেকে। গণপরিবহন খাতে নারী চালক ও সহকারীর উপস্থিতি এখনো তুলনামূলকভাবে কম। ফলে নারী কর্মীদের সামনে একটি নতুন পেশাগত ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে এই উদ্যোগ। একজন নারী চালক যখন প্রতিদিন নগরীর ব্যস্ত সড়কে বাস চালাবেন, তখন তা শুধু একটি পরিবহন সেবার অংশ হবে না; একই সঙ্গে পরিবহন খাতে নারীর সক্ষমতা ও অংশগ্রহণের একটি দৃশ্যমান উদাহরণও হয়ে উঠবে।

তবে এই উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদে সফল করতে হলে নারী কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ ও পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। একজন চালক বা সহকারীকে শুধু বাস পরিচালনার দায়িত্ব দিলেই হবে না, তাঁকে যাত্রী ব্যবস্থাপনা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা, সড়ক নিরাপত্তা এবং যাত্রীদের সঙ্গে পেশাদার আচরণের ক্ষেত্রেও যথাযথ প্রস্তুতি দিতে হবে।

প্রাথমিকভাবে দুটি বাস দিয়ে শুরু হওয়া এই সেবা ভবিষ্যতে কতটা বিস্তৃত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যাত্রীদের চাহিদা বাড়লে শুধু একই রুটে বাসের সংখ্যা বাড়ানো নয়, চট্টগ্রাম নগরীর আরও গুরুত্বপূর্ণ রুটে এই সুবিধা সম্প্রসারণের প্রয়োজন হতে পারে। কারণ নগরীর এক বা দুটি রুটের নারী যাত্রীরা সুবিধা পেলেও অন্য এলাকার নারীরা একই সমস্যায় থেকে গেলে উদ্যোগটির সামগ্রিক প্রভাব সীমিত থাকবে।

এ কারণে নতুন এই বাস সার্ভিসকে একটি পরীক্ষামূলক সূচনা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। প্রথম পর্যায়ে যাত্রীসংখ্যা, নির্ধারিত সময় মেনে চলাচল, যাত্রীদের অভিজ্ঞতা এবং পরিচালনাগত সমস্যাগুলো পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী বাস বাড়ানো এবং রুট সম্প্রসারণ করা গেলে চট্টগ্রামের নারী যাত্রীদের জন্য একটি বড় পরিসরের নারীবান্ধব গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

চট্টগ্রামের রাস্তায় নারী চালকের হাতে বিশেষ বাসের স্টিয়ারিং ওঠা তাই শুধু একটি নতুন পরিবহন সেবা চালুর ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপদ চলাচলের প্রত্যাশা, কর্মজীবী নারীর প্রতিদিনের সময় বাঁচানোর আকাঙ্ক্ষা, শিক্ষার্থীদের নিশ্চিন্তে যাতায়াত এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর স্বপ্ন। এখন এই উদ্যোগ কতটা সফল হয়, তা নির্ভর করবে বাস্তব পরিচালনা ও যাত্রীসেবার মানের ওপর।

দুটি বাস দিয়ে শুরু হওয়া এই যাত্রা যদি নিয়মিত, নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধবভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে তা চট্টগ্রাম নগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। আর সেই পরিবর্তন শুধু নারী যাত্রীদের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে না, পরিবহন খাতে আরও বেশি নারীর অংশগ্রহণের পথও খুলে দিতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত