প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জনের পথ আগের তুলনায় অনেকটাই সহজ হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার এই বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় দেশটির তরুণদের একটি বড় অংশ এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।
নয়াদিল্লির কাছের গ্রেটার নয়ডার ‘নলেজ পার্ক’ এই পরিবর্তনের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে। পরিকল্পিত এই শিক্ষা এলাকায় রয়েছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি শিক্ষাকেন্দ্র ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। সেখানে প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। তাঁদের অনেকেই এসেছেন দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে। সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করার আশায় বহু পরিবার নিজেদের সঞ্চয় ব্যয় করছে, কেউ আবার ব্যাংকঋণ নিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাচ্ছে সন্তানকে।
কিন্তু পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর সেই বিনিয়োগের বিনিময়ে কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাওয়া যাবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও ভালো বেতনের কর্মসংস্থান একই গতিতে বাড়ছে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ হাতে নিয়েও অনেক তরুণকে দীর্ঘ সময় চাকরির সন্ধানে থাকতে হচ্ছে।
ভারতের উচ্চশিক্ষা খাতের সম্প্রসারণের চিত্রও বেশ বড়। গত এক দশকে দেশটিতে বেসরকারি কলেজের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ হয়েছে। ২০২৪ সালে ভারতের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখে পৌঁছেছে, যা এক দশকের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেশি। এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছেন।
তবে শিক্ষার সুযোগ বাড়ার বিপরীতে কর্মসংস্থানের চিত্র ততটা আশাব্যঞ্জক নয়। আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ২৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৪০ শতাংশ স্নাতক বেকার। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করেও বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন না। একই সময়ে বছরে ৫০০ ডলারের বেশি বেতনের নতুন চাকরি তৈরি হচ্ছে আনুমানিক আড়াই লাখের মতো।
এই বৈপরীত্য ভারতের তরুণ সমাজের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে পরিবারগুলো বিশ্বাস করছে, উচ্চশিক্ষা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করবে। অন্যদিকে ডিগ্রি অর্জনের পরও উপযুক্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত না হওয়ায় সেই শিক্ষায় করা বিপুল বিনিয়োগ অনেক পরিবারের জন্য আর্থিক ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে।
ভারতের শীর্ষ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি এই সমস্যাকে আরও স্পষ্ট করে। এসব প্রতিষ্ঠানে আসন সীমিত হওয়ায় মেধাবী শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ সেখানে ভর্তির সুযোগ পান না। অথচ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ তুলনামূলকভাবে কম এবং স্নাতকদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও অনেক ক্ষেত্রে বেশি। ফলে যারা সেখানে সুযোগ পান না, তাদের একটি বড় অংশকে উচ্চ ফি দিয়ে বেসরকারি কলেজে ভর্তি হতে হয়।
শিক্ষা খাতের উদ্যোক্তা অক্ষয় সাক্সেনার মতে, ভারতের তরুণদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে একটি সরল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—ডিগ্রি অর্জন করলেই ভালো চাকরি পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা এখন অনেক বেশি জটিল। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় চার লাখ শিক্ষার্থী ২০ হাজার ডলারের বেশি ব্যয় করে বেসরকারি প্রকৌশল কলেজে ভর্তি হন। অথচ স্নাতকদের মধ্যম বার্ষিক বেতন প্রায় তিন হাজার ডলারের কাছাকাছি।
এই হিসাব শিক্ষার খরচ ও সম্ভাব্য আয়ের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধানের ইঙ্গিত দেয়। একজন শিক্ষার্থী যদি উচ্চশিক্ষার জন্য পরিবারের সঞ্চয় ব্যয় করেন কিংবা ঋণ নেন, তাহলে স্নাতক হওয়ার পর তাঁর প্রথম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় দ্রুত আয় শুরু করা। কিন্তু চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও মানসম্পন্ন চাকরির ঘাটতি থাকলে সেই লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে পরিবর্তনটি আরও স্পষ্ট। একসময় ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাত বিপুলসংখ্যক তরুণকে কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়েছে। ইনফোসিস ও টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেসের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে দেশটির প্রযুক্তি শিক্ষিত তরুণদের জন্য বড় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের দ্রুত অগ্রগতিতে প্রযুক্তিনির্ভর চাকরির ধরন বদলে যাচ্ছে।
যেসব কাজ একসময় বিপুলসংখ্যক কর্মীর মাধ্যমে সম্পন্ন করা হতো, তার কিছু অংশ এখন স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি দিয়ে করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শুধু ডিগ্রি থাকলেই হবে না, পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন দক্ষতা অর্জন করাও এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
গ্রেটার নয়ডার শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতায় এই চাপ স্পষ্ট। তাঁদের অনেকেই পরিবারের আর্থিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা জেনেও উচ্চশিক্ষার জন্য এখানে এসেছেন। কেউ শিক্ষাঋণ নিয়েছেন, কেউ পরিবারের সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করছেন। আবার কেউ পড়াশোনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্স কাজ করে নিজের দৈনন্দিন খরচ চালানোর চেষ্টা করছেন।
তাদের অনেকের স্বপ্নও এখন বদলে যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হওয়ার সময় যে বড় চাকরি, ভালো বেতন ও সামাজিক প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ছিল, চাকরির বাজারে প্রবেশের সময় তা অনেকের কাছেই নেমে এসেছে একটি স্থিতিশীল আয়ের প্রত্যাশায়। এমন একটি চাকরি, যেখান থেকে শিক্ষাঋণের কিস্তি পরিশোধ করা যাবে এবং পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
এই পরিস্থিতির সামাজিক প্রভাবও কম নয়। ভারতে তরুণ জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দেশের উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে। কিন্তু এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশ যদি উপযুক্ত কাজ না পায়, তাহলে জনমিতিক সুবিধা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
চাকরির অভাব নিয়ে তরুণদের হতাশা ইতোমধ্যে বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলন ও বিক্ষোভেও প্রতিফলিত হয়েছে। পরীক্ষাব্যবস্থা, নিয়োগপ্রক্রিয়া ও সরকারি চাকরিতে অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও এসব আন্দোলনে সামনে এসেছে। অনেক তরুণের কাছে শিক্ষা শেষ করার পর চাকরি পাওয়া এখন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় নয়; এটি পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক মর্যাদার সঙ্গেও যুক্ত।
অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের কাছে তাই মূল প্রশ্ন শুধু কতজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে তা নয়। বরং তাঁরা কী ধরনের শিক্ষা পাচ্ছেন, সেই শিক্ষা শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং স্নাতকদের জন্য কী পরিমাণ মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চশিক্ষার দ্রুত বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের ফলে যদি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়, কিন্তু তাঁদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষাঋণের চাপ তরুণদের ব্যক্তিগত জীবনেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের সামনে তাই এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে আরও বেশি তরুণকে মানসম্মত উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিতে হবে, অন্যদিকে সেই শিক্ষাকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো বা ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাক্রমের সমন্বয়, ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং উচ্চ উৎপাদনশীল নতুন চাকরি সৃষ্টি।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, শিক্ষা বিস্তার যদি কর্মসংস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে উচ্চশিক্ষা সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির সিঁড়ি হওয়ার বদলে অনেক পরিবারের জন্য ঋণ, হতাশা ও অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে উঠতে পারে। আর ভারতের কোটি কোটি তরুণের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই ব্যবধান কত দ্রুত কমানো যায় তার ওপর।