প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস জেমির সামনে এখন উচ্চশিক্ষার নতুন দিগন্ত। নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের আগ্রহ, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি অর্জন করেছেন প্রায় ৭৩ লাখ টাকার আন্তর্জাতিক বৃত্তি। চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে উচ্চশিক্ষার জন্য চার বছর মেয়াদি এই বৃত্তির আওতায় তিনি মোট ৬০ হাজার মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭৩ লাখ টাকা পাবেন।
শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার জহুর চান বিবি মহিলা কলেজের এই শিক্ষার্থীর সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে আনন্দ ও উৎসাহের আবহ। পরিবারের সদস্য, শিক্ষক, সহপাঠী ও এলাকাবাসী তার এই অর্জনকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখছেন না; বরং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচনা করছেন।
জানা গেছে, মঙ্গলবার এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের ভর্তি কমিটির পরিচালক মৌরি রহমান চিঠির মাধ্যমে জেমিকে বৃত্তি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। চার বছরের শিক্ষাজীবনে প্রতি বছর তিনি ১৫ হাজার মার্কিন ডলার করে বৃত্তি পাবেন। উচ্চশিক্ষার ব্যয় নির্বাহে এই বৃত্তি তার জন্য বড় ধরনের সহায়তা হিসেবে কাজ করবে।
জেমি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার জহুর চান বিবি মহিলা কলেজ থেকে ২০২৫ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে এরপর তিনি সুযোগ পান একটি সামার স্কুল প্রোগ্রামে অংশ নেওয়ার। গত ২০ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এক মাসের এই কর্মসূচি শেভরন বাংলাদেশের সহায়তায় পরিচালিত হয়। বিজ্ঞানভিত্তিক ইংরেজি মাধ্যমের ওই সামার স্কুলে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে জেমি নিজের দক্ষতা ও সম্ভাবনাকে আরও বিকশিত করার সুযোগ পান।
তবে সামার স্কুলের পুরো প্রক্রিয়াটি তার জন্য সহজ ছিল না। নতুন পরিবেশ, ইংরেজি মাধ্যমে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা এবং প্রতিযোগিতামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে তাকে পরিশ্রম করতে হয়েছে। কিন্তু সীমাবদ্ধতাকে বাধা হিসেবে না দেখে শেখার আগ্রহকে সামনে রেখে তিনি কর্মসূচিটি সফলভাবে শেষ করেন। তার পারফরম্যান্স ও সম্ভাবনা বিবেচনায় পরবর্তী সময়ে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি হয়।
জেমির এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি সাধারণ পরিবারের সংগ্রাম ও স্বপ্ন। তার বাবা আফজাল আলী শায়েস্তাগঞ্জের পশ্চিম লেঞ্জাপাড়ার বাসিন্দা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। সীমিত আয়ের পরিবারের সন্তান হিসেবে জেমির উচ্চশিক্ষার পথ সহজ ছিল না। আর্থিক ও পারিবারিক নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। এ ক্ষেত্রে তার কলেজের শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বৃত্তি পাওয়ার খবর জানার অনুভূতি জানাতে গিয়ে জেমি বলেন, প্রথমে তিনি বিষয়টি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। বৃত্তি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে পাঠানো চিঠি বারবার পড়ার পর ধীরে ধীরে তার বিশ্বাস তৈরি হয়। এখন তার সামনে নতুন লক্ষ্য—নিজেকে আরও প্রস্তুত করা এবং উচ্চশিক্ষার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
জেমির কথায়, এই অর্জন তাকে যেমন আনন্দিত করেছে, তেমনি আরও বড় দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে। তিনি চান, তার মতো দেশের আরও শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক মানের বৃত্তি অর্জন করুক এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাক। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই সুযোগ ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরতে পারেন না। জেমির সাফল্য তাদের জন্য সেই সম্ভাবনার দরজা খোলার একটি উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
জহুর চান বিবি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন জেমির সাফল্যে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, সদিচ্ছা, প্রচেষ্টা ও প্রতিভার সমন্বয় থাকলে যেকোনো প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। জেমির অর্জন তারই বাস্তব প্রমাণ।
কলেজ অধ্যক্ষ আরও মনে করেন, জেমির এই সাফল্য শুধু তার নিজের কিংবা পরিবারের জন্য গর্বের বিষয় নয়; বরং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা। যথাযথ সহযোগিতা, সুযোগ এবং নিজের প্রতি বিশ্বাস থাকলে গ্রামের বা মফস্বলের শিক্ষার্থীরাও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শিক্ষার সুযোগ অর্জন করতে পারে—জেমির পথচলা সেই বার্তাই দিচ্ছে।
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এখনো অনেক পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বেসরকারি বা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার ব্যয় অনেক পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। জেমির পাওয়া এই বৃত্তিও সেই দৃষ্টিকোণ থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।
শায়েস্তাগঞ্জের মতো একটি মফস্বল এলাকার শিক্ষার্থীর আন্তর্জাতিক বৃত্তি অর্জনের ঘটনা তাই স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। পরিবারের সীমিত সামর্থ্য কিংবা শহরকেন্দ্রিক সুযোগের অভাব যে মেধাবী শিক্ষার্থীর পথচলার শেষ কথা নয়, জেমির সাফল্য তারই প্রমাণ।
জেমির সাফল্যের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীরা তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনে আরও সাফল্য কামনা করছেন। অনেকের কাছে তার এই অর্জন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি একই সঙ্গে মেধা, অধ্যবসায় এবং সুযোগ পাওয়ার গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে।
এখন জেমির সামনে নতুন অধ্যায়। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার পরিবেশে নিজেকে আরও দক্ষ করে তোলা, নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এবং ভবিষ্যতে দেশের জন্য কাজ করার প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে যেতে চান তিনি। তার এই পথচলা কতটা দূর এগোবে, তা সময়ই বলবে। তবে ৭৩ লাখ টাকার এই বৃত্তি ইতোমধ্যেই শায়েস্তাগঞ্জের এক মেধাবী তরুণীর স্বপ্নকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
জেমির গল্প তাই কেবল একটি বৃত্তি পাওয়ার খবর নয়; এটি সীমিত সুযোগের মধ্যেও স্বপ্ন ধরে রাখার, পরিশ্রম করার এবং সুযোগ এলে তা কাজে লাগানোর গল্প। তার সাফল্য প্রমাণ করে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার মতো মেধা ও সামর্থ্য রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সেই মেধাকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং নিজের স্বপ্নের প্রতি অবিচল আস্থা।