প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও নিজে ভোট দিতে পারবেন না জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। কারণ, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার সংসদ সদস্যদের। অলি আহমদ বর্তমানে জাতীয় সংসদের সদস্য না হওয়ায় তিনি নির্বাচনের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হননি। ফলে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকলেও ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকছে না তাঁর।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আজ ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হওয়ার কথা রয়েছে। দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে। এবারের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থী থাকায় এবার সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা এবং ভোট দেওয়ার যোগ্যতা এক বিষয় নয়। অলি আহমদ রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করায় তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে নির্বাচনি কর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন তাঁর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেন। এর আগে ১৩ আগস্ট তাঁর পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। যাচাই-বাছাইয়ে একটি বৈধ হওয়ায় অন্যটি আর বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তালিকায় রয়েছেন জাতীয় সংসদের সদস্যরা। এবার চট্টগ্রাম-৪ আসনটি শূন্য থাকায় মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এর মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের ৫০ জন সদস্যও রয়েছেন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হতে একজন প্রার্থীকে প্রয়োজন হবে অন্তত ১৭৫ ভোট। সংসদে বিএনপির ২৪৭ সদস্য থাকায় দলটির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংখ্যাগতভাবে স্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছেন।
অলি আহমদের ক্ষেত্রে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি নিজে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাঁর পক্ষে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী দিয়েছে, কিন্তু সেই নির্বাচনে নিজের ভোটটি দেওয়ার সুযোগ তাঁর নেই। অর্থাৎ তিনি এমন একটি নির্বাচনে প্রার্থী, যেখানে তাঁর ভাগ্য নির্ধারণ করবেন অন্য সংসদ সদস্যরা। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রচলিত কাঠামোর কারণে একজন প্রার্থীর জন্য তৈরি হওয়া এই ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলাদা করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ আসনে বসে ভোট দেবেন। ব্যালট গ্রহণের আগে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ব্যালটের মুড়ি অংশে প্রয়োজনীয় তথ্য লিখে স্বাক্ষর করতে হবে। এরপর মূল ব্যালটে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে নাম লিখে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে ভোট দিতে হবে। ভোট গ্রহণ শেষে সংসদ কক্ষেই ভোট গণনা করা হবে এবং নির্বাচনি কর্তা হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ফল ঘোষণা করবেন। পরবর্তী সময়ে নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হবে।
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক গুরুত্বের অন্যতম কারণ হলো, দীর্ঘ বিরতির পর আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ওই বছর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। এরপর অনুষ্ঠিত কয়েকটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কার্যত একক প্রার্থী থাকায় ভোটাভুটির প্রয়োজন হয়নি।
এবার অলি আহমদ প্রার্থী হওয়ায় সেই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান ভেঙে ভোটাভুটির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে তাঁকে প্রার্থী করার ঘোষণা দেওয়া হয় এবং তাঁর মনোনয়নপত্র নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়। জোটের পক্ষ থেকে তাঁকে বিরোধী শিবিরের প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করেছে। তাঁর মনোনয়নপত্রও বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের লড়াই নয়; এর মধ্য দিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক জোটগুলোর অবস্থানও প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে অলি আহমদের অংশগ্রহণ তাই বিরোধী রাজনৈতিক জোটের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সংসদের বর্তমান সংখ্যাগত সমীকরণে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুলের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অলি আহমদের নিজের ভোট দিতে না পারার বিষয়টি একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও সামনে এনেছে। সাধারণ নির্বাচনে প্রার্থী ও ভোটারের সম্পর্ক যেমন সরাসরি, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে কাঠামোটি ভিন্ন। এখানে জনগণ সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন না; সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ফলে একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে পারলেও সংসদ সদস্য না হলে তিনি সেই নির্বাচনের ভোটার হতে পারেন না।
এ কারণে আজকের ভোটে অলি আহমদের ভূমিকা থাকবে শুধু একজন প্রার্থী হিসেবে। ভোট দেওয়ার অধিকার থাকবে সংসদের ৩৪৯ সদস্যের। অসুস্থতার কারণে দেশের বাইরে থাকা বিএনপির সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস ভোট দিতে পারবেন না বলে সংসদ সূত্রে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল সংসদ সদস্য হিসেবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
সব মিলিয়ে আজকের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে উঠেছে। প্রায় সাড়ে তিন দশক পর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকায় সংসদ কক্ষে ভোটাভুটির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আর এই নির্বাচনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিকগুলোর একটি হলো—রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কর্নেল (অব.) অলি আহমদ নিজেই তাঁর জন্য নির্ধারিত নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না। প্রার্থী হিসেবে তাঁর উপস্থিতি থাকলেও ভোটার তালিকায় নেই তাঁর নাম। আজ সংসদ কক্ষের ব্যালটে তাঁর নাম থাকবে, কিন্তু সেই ব্যালটে নিজের পছন্দের প্রার্থী হিসেবে নিজের নামের পাশে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকবে না তাঁর।