প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত সহযোগিতা আরও জোরদারের পথে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতার। এরই অংশ হিসেবে কাতারের কাছে প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্ভাব্য এই অস্ত্রচুক্তির আওতায় আকাশে জ্বালানি সরবরাহে সক্ষম চারটি পর্যন্ত কেসি-৪৬এ পেগাসাস বিমান এবং এসব বিমানের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরঞ্জাম ও সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বৃহস্পতিবারের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কাতার চারটি পর্যন্ত কেসি-৪৬এ বিমান কেনার পাশাপাশি এসব বিমানের জন্য আটটি পিডব্লিউ৪০৬২ টার্বোফ্যান ইঞ্জিন, ১০টি এএন/এএলআর-৬৯এ রাডার সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, ১৫টি গার্ডিয়ান লেজার ট্রান্সমিটার এবং আটটি এলএআইআরসিএম সিস্টেম প্রসেসর কেনার অনুরোধ জানিয়েছে। সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় এসব মূল সামরিক সরঞ্জামের পাশাপাশি বিভিন্ন সহায়ক যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ, পরিবহন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য লজিস্টিক সেবাও থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত বিক্রয় কাতারের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে মার্কিন ও মিত্র বাহিনীর সঙ্গে কাতারের সামরিক সমন্বয় ও আন্তঃকার্যক্ষমতা আরও উন্নত হবে। এর ফলে বর্তমান ও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় কাতারের সক্ষমতা বাড়বে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই চুক্তির গুরুত্বও কম নয়। উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। আঞ্চলিক সংঘাত, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন দেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের দিকে জোর দিচ্ছে। কাতারের ক্ষেত্রেও সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর এই উদ্যোগ সেই বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেসি-৪৬এ পেগাসাস এই সম্ভাব্য চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিমানটি মূলত আকাশে অন্য সামরিক বিমানকে জ্বালানি সরবরাহের জন্য তৈরি। দীর্ঘপথে যুদ্ধবিমান পরিচালনা এবং সামরিক অভিযানের সক্ষমতা বাড়াতে এ ধরনের ট্যাংকার বিমানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি যুদ্ধবিমানকে মাঝ আকাশে জ্বালানি সরবরাহ করা গেলে সেটিকে ঘাঁটিতে ফিরে এসে পুনরায় জ্বালানি নেওয়ার প্রয়োজন কমে যায়। ফলে সামরিক অভিযানের পরিধি ও স্থায়িত্ব বাড়ানো সম্ভব হয়।
তবে কেসি-৪৬এ শুধু আকাশে জ্বালানি সরবরাহের কাজে সীমাবদ্ধ নয়। এতে কার্গো পরিবহন এবং জরুরি চিকিৎসা স্থানান্তরের সুবিধাও রয়েছে। ফলে সামরিক অভিযানের পাশাপাশি বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতিতেও বিমানটি ব্যবহার করা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো কেসি-১৩৫ ট্যাংকার বিমানের তুলনায় কেসি-৪৬একে আরও আধুনিক ও উন্নত সক্ষমতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কাতারের জন্য এমন বিমান সংগ্রহের অর্থ হলো দেশটির সামরিক বিমান পরিচালনার সক্ষমতায় একটি নতুন মাত্রা যোগ হওয়া। বিশেষ করে দেশটির নিজস্ব যুদ্ধবিমান বহরের কার্যকর ব্যবহার এবং দীর্ঘপাল্লার সামরিক অভিযানে সহায়তার ক্ষেত্রে আকাশে জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ায়ও এই সক্ষমতা কাজে লাগতে পারে।
প্রস্তাবিত চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত রাডার সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিও কাতারের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। শত্রুপক্ষের রাডার বা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার সক্ষমতা সামরিক বিমানকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে সহায়তা করতে পারে। এ ধরনের প্রযুক্তি আধুনিক সামরিক অভিযানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কাতারকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘কৌশলগত আঞ্চলিক অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ওয়াশিংটনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রেও কাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে কাতারের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোকে শুধু একটি বাণিজ্যিক অস্ত্রচুক্তি হিসেবে দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র; বরং এর সঙ্গে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কও জড়িত।
সম্ভাব্য এই চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পও বড় ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা পেতে পারে। চুক্তির প্রধান মার্কিন ঠিকাদারদের মধ্যে রয়েছে বোয়িং, প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি মিলিটারি ইঞ্জিনস, আরটিএক্স করপোরেশন এবং নর্থরপ গ্রুম্যান। বিমান, ইঞ্জিন, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, রাডার সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সরঞ্জাম সরবরাহের সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
তবে এই অস্ত্র বিক্রির ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন কাতারের পক্ষ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যবহারের জন্য দেওয়া একটি বিমান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপত্তা ও স্বার্থসংক্রান্ত নানা প্রশ্ন উঠেছে। ট্রাম্প জুলাই থেকে ওই নতুন জেট ব্যবহার শুরু করেছেন। বিমানটিকে উন্নত করে ব্যবহারের সর্বোচ্চ সক্ষমতা কাজে লাগানোর পরিকল্পনার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
কাতারের দেওয়া বিমান নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই দেশটির কাছে বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির অনুমোদন দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। একদিকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা, অন্যদিকে প্রতিরক্ষা বাণিজ্যের বিস্তার—দুই ক্ষেত্রেই কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত সম্ভাব্য চুক্তির অনুমোদন দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশ ও ঠিকাদারদের মধ্যে চূড়ান্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। তাই এই পর্যায়ে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পরিমাণটি সম্ভাব্য চুক্তির আনুমানিক মূল্য। চূড়ান্ত চুক্তির সময় সরঞ্জামের সংখ্যা, সরবরাহের সময়সূচি ও অন্যান্য শর্তে পরিবর্তন হতে পারে।
কাতারের জন্য এই সম্ভাব্য ক্রয় শুধু সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের বিষয় নয়; এর মাধ্যমে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগও পাচ্ছে। কাতারে দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন প্রজন্মের সামরিক সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগ দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সামরিক আধুনিকায়নের প্রতিযোগিতাও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে। অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন, রাডার এবং আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান কেনার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। কাতারের সম্ভাব্য কেসি-৪৬এ ক্রয় সেই বৃহত্তর সামরিক আধুনিকায়ন প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, আকাশে জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা একটি দেশের সামরিক বিমান শক্তিকে বহুগুণ কার্যকর করতে পারে। কারণ যুদ্ধবিমান শুধু নিজস্ব জ্বালানি ধারণক্ষমতার ওপর নির্ভর না করে মাঝ আকাশে পুনরায় জ্বালানি নিতে পারলে দীর্ঘ সময় আকাশে অবস্থান করতে পারে। ফলে নজরদারি, প্রতিরক্ষা এবং সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে কৌশলগত সুবিধা তৈরি হয়।
অন্যদিকে কাতারের মতো ছোট ভূখণ্ডের একটি দেশের জন্য আকাশ প্রতিরক্ষা ও সামরিক বিমান সক্ষমতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই আধুনিক সামরিক প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য এই চুক্তি সেই ধারাবাহিকতাকে আরও এগিয়ে নিতে পারে।
সব মিলিয়ে, কাতারের কাছে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির মার্কিন অনুমোদন দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের গভীরতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। কেসি-৪৬এ ট্যাংকার বিমানসহ উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি কাতারের সামরিক সক্ষমতায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। একই সঙ্গে মার্কিন অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি বড় বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করছে। তবে এই চুক্তির বাস্তবায়ন এবং চূড়ান্ত সরবরাহের পরিমাণ নির্ভর করবে পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ও চূড়ান্ত চুক্তির ওপর। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-কাতার কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনাই এখন সামনে এসেছে।