প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বলিউড অভিনেতা সালমান খানকে ঘিরে ১৯৯৮ সালের বহুল আলোচিত কৃষ্ণসার হরিণ শিকার মামলার ছায়ায় নির্মিত ‘কালা হিরণ: দ্য ব্যাটল ফর লিগ্যাসি’ সিনেমা নিয়ে আইনি লড়াই এবার ভারতের সুপ্রিম কোর্টে গড়িয়েছে। সিনেমাটির টিজার ও প্রচারণামূলক বিভিন্ন উপকরণ সরিয়ে নিতে দিল্লি হাইকোর্টের দেওয়া অন্তর্বর্তী নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন ছবিটির প্রযোজক অমিত জানি।
ঘটনাটি শুধু একটি সিনেমার প্রচারণা বন্ধের আইনি বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে একজন তারকার ব্যক্তিত্বের অধিকার, তাঁর নাম ও পরিচিতিকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের প্রশ্ন, চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বাধীনতা এবং জনপরিসরে থাকা বাস্তব ঘটনা নিয়ে সিনেমা তৈরির ক্ষেত্রে নির্মাতাদের অধিকার। ফলে মামলাটি এখন বলিউডের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর আইনি ও সাংস্কৃতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
গত ২৭ জুলাই দিল্লি হাইকোর্ট ‘কালা হিরণ: দ্য ব্যাটল ফর লিগ্যাসি’ সিনেমার টিজারসহ সংশ্লিষ্ট প্রচারণামূলক উপকরণ সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আদালতের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, এসব উপকরণের মাধ্যমে সালমান খানের ব্যক্তিত্বের অধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে এসব প্রচারণার কারণে অভিনেতার ভাবমূর্তি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও আদালত বিবেচনা করেছিলেন।
এরপরই ছবির প্রযোজক অমিত জানি হাইকোর্টের ওই নির্দেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর বক্তব্য, হাইকোর্টের আদেশে সালমান খানের ব্যক্তিত্বের অধিকার ঠিক কোন নির্দিষ্ট উপায়ে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা নেই। তিনি মনে করেন, জনপরিচিত কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে ইতোমধ্যে জনপরিসরে থাকা ঘটনা নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বাধীনতাকে ব্যক্তিত্বের অধিকারের নামে অযথা সীমিত করা উচিত নয়।
বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে গত ১৭ জুলাই। ওই দিন সিনেমাটির টিজার ও পোস্টার প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছবিটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সিনেমাটির নির্মাতারা দাবি করেন, ছবির গল্প ১৯৯৮ সালের কৃষ্ণসার হরিণ শিকার মামলার ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত। তবে সালমান খানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর পরিচিতি ও ব্যক্তিত্বকে ছবির প্রচারণায় ব্যবহার করা হয়েছে।
সালমানের করা মামলায় বলা হয়, প্রায় দুই মিনিটের টিজারে ‘আয়ান খান’ নামে একটি কাল্পনিক চরিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। যদিও চরিত্রটির নাম সরাসরি সালমান খান নয়, অভিনেতার দাবি, বিভিন্ন ইঙ্গিতের মাধ্যমে দর্শকের কাছে ওই চরিত্রটিকে তাঁর সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে সালমান অভিনীত ‘দাবাং’ ও ‘সিকান্দার’ সিনেমার প্রসঙ্গ এবং কৃষ্ণসার হরিণ শিকারসংক্রান্ত দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের ইঙ্গিত টিজারে রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এই জায়গাতেই ব্যক্তিত্বের অধিকার বা ‘পারসোনালিটি রাইটস’-এর প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো পরিচিত ব্যক্তির নাম, ছবি, কণ্ঠ, স্বতন্ত্র পরিচয় কিংবা জনপরিচিত বৈশিষ্ট্য অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হলে তাঁর ব্যক্তিত্বের অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে—এমন আইনি ধারণা বিভিন্ন দেশে ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে বিনোদন জগতের তারকারা তাঁদের পরিচিতিকে একটি বাণিজ্যিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন।
সালমান খানের পক্ষের অভিযোগের মূল বিষয়ও এখানেই। তাঁর পরিচিতি বা জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো ঘটনা যদি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যাতে দর্শকের মধ্যে তাঁর সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি হয় এবং সেই উপস্থাপন থেকে নির্মাতারা বাণিজ্যিক সুবিধা পান, তাহলে সেটি ব্যক্তিত্বের অধিকারের প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। দিল্লি হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী আদেশে মূলত এই ধরনের সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
অন্যদিকে প্রযোজক অমিত জানির অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর যুক্তি, ১৯৯৮ সালের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে ভারতের জনপরিসরে আলোচিত। এ ধরনের প্রকাশ্য ও আলোচিত ঘটনা নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সৃজনশীল কাজের অংশ। যদি কোনো জনপরিচিত ব্যক্তিকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনা সিনেমায় তুলে ধরতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনুমতি বাধ্যতামূলক হয়ে যায়, তাহলে বাস্তব ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত বহু চলচ্চিত্র নির্মাণই কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
প্রযোজকের আবেদনে ব্যক্তিত্বের অধিকারকে ‘ব্যক্তিগত সেন্সরশিপের’ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, কোনো তারকার ব্যক্তিগত পরিচিতি বা বাণিজ্যিক ভাবমূর্তি রক্ষার অধিকার থাকলেও সেই অধিকার ব্যবহার করে জনস্বার্থ, সৃজনশীল স্বাধীনতা বা বাস্তব ঘটনা নিয়ে শিল্পচর্চার পথ বন্ধ করা উচিত নয়।
এই বিতর্কে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। প্রযোজক পক্ষের আশঙ্কা, কোনো জনপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনা চলচ্চিত্রে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু বিনোদন জগতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সাংবাদিকতা, তথ্যচিত্র নির্মাণ এবং বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে সিনেমাটির বিষয়বস্তু ও সালমান খানের সঙ্গে এর সম্পর্কের কারণে মামলাটির আবেগের দিকও রয়েছে। ১৯৯৮ সালে রাজস্থানে ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’ সিনেমার শুটিং চলাকালে কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের অভিযোগ ওঠে সালমান খানের বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সময় ধরে আদালতে মামলা চলেছে এবং ঘটনাটি ভারতীয় বিনোদন জগতের অন্যতম আলোচিত আইনি অধ্যায় হয়ে আছে।
দুই দশকেরও বেশি সময় পর সেই পুরোনো ঘটনার ছায়ায় নতুন সিনেমা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্বাভাবিকভাবেই তা আবার আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। কিন্তু এবার আলোচনার বিষয় শুধু পুরোনো শিকার মামলা নয়; বরং সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে সিনেমা বানানোর অধিকার কার, কোন সীমার মধ্যে একজন তারকার পরিচিতি ব্যবহার করা যাবে এবং চলচ্চিত্রের সৃজনশীল স্বাধীনতা কোথায় শেষ হবে—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।
‘কালা হিরণ: দ্য ব্যাটল ফর লিগ্যাসি’ সিনেমায় একজন সুপারস্টারকে ঘিরে চলা মামলার কাহিনি, আদালতকেন্দ্রিক নাটক এবং সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদের মতো বিষয় তুলে ধরা হয়েছে বলে নির্মাতাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। কিন্তু চরিত্রটি কাল্পনিক হলেও যদি দর্শক সেটিকে বাস্তব কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সহজেই মিলিয়ে ফেলেন, তাহলে আইনগতভাবে সেই উপস্থাপনের প্রভাব কতটা হতে পারে—সেটিও মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
এখন সুপ্রিম কোর্টের সামনে মূলত হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশের বিরুদ্ধে প্রযোজকের চ্যালেঞ্জটি রয়েছে। সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের আদেশে হস্তক্ষেপ করেন কি না, কিংবা মামলাটিকে আরও বিস্তারিত শুনানির দিকে নিয়ে যান কি না, সেটিই এখন নজর রাখার বিষয়। আদালতের পরবর্তী অবস্থান সিনেমাটির প্রচারণা ও ভবিষ্যৎ মুক্তির পথেও প্রভাব ফেলতে পারে।
একদিকে সালমান খান তাঁর ব্যক্তিত্ব, পরিচিতি ও ভাবমূর্তি রক্ষার আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। অন্যদিকে প্রযোজক অমিত জানি চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বাধীনতা এবং জনপরিসরে থাকা বাস্তব ঘটনা নিয়ে সৃজনশীল কাজ করার অধিকারকে সামনে রাখছেন। দুই পক্ষের এই অবস্থান শেষ পর্যন্ত ভারতীয় বিনোদন জগতে ব্যক্তিত্বের অধিকার ও সৃজনশীল স্বাধীনতার মধ্যকার ভারসাম্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে।
ফলে ‘কালা হিরণ’ এখন শুধু একটি সিনেমার নাম নয়, বরং বলিউডে তারকাদের ব্যক্তিগত অধিকার এবং বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বাধীনতার মধ্যকার টানাপোড়েনের একটি নতুন উদাহরণ। সুপ্রিম কোর্টে মামলাটির অগ্রগতি তাই সালমান খান বা সিনেমাটির নির্মাতাদের জন্যই নয়, ভবিষ্যতে বাস্তব ঘটনা ও জনপরিচিত ব্যক্তিদের নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চান এমন নির্মাতাদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।