প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফ্রান্সের রাজনীতিতে নতুন এক প্রতীকী অধ্যায়ের জন্ম দিচ্ছেন গ্রিনস দলের নেতা মেরিন তন্দলিয়ে। একদিকে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি, অন্যদিকে মাতৃত্বের অপেক্ষা—দুই গুরুত্বপূর্ণ জীবনের অধ্যায়কে একই সময়ে সামলে এগিয়ে চলেছেন ৩৯ বছর বয়সী এই রাজনীতিক। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার চালানোর ঘটনা ফ্রান্সের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল এবং দেশটির রাজনীতিতে নারী, মাতৃত্ব ও কর্মজীবন নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তন্দলিয়ে গত মার্চের শেষ দিকে নিজের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আনেন। তখন তিনি প্রায় তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। এখন তাঁর গর্ভাবস্থার সময় প্রায় আট মাসে পৌঁছেছে। নিজের অনাগত সন্তানকে তিনি ‘অলৌকিক শিশু’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কারণ, মা হওয়ার এই পথ তাঁর জন্য সহজ ছিল না। এর আগে তাঁর গর্ভপাত হয়েছিল। পরে সহায়ক প্রজনন পদ্ধতি এবং ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা আইভিএফের মাধ্যমে কয়েকবার সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করেও সফল হননি তিনি।
একপর্যায়ে মা হওয়ার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন তন্দলিয়ে। ঠিক সেই সময় অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর তাঁর জীবনে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে। একই সময়ে তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ফলে ব্যক্তিগত আনন্দ, দীর্ঘদিনের অপেক্ষা এবং রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা—সবকিছু একসঙ্গে এসে দাঁড়ায় তাঁর সামনে।
তন্দলিয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর জানার পর তিনি নিজেও হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন। কারণ, তখন তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। কিন্তু মাতৃত্বের এই নতুন সম্ভাবনা তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থামিয়ে দেওয়ার কারণ হয়নি। বরং তিনি প্রচার চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং এ বিষয়ে তাঁর মনে বড় কোনো দ্বিধা ছিল না বলে জানিয়েছেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের এখনও অনেকটা সময় বাকি থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার প্রস্তুতি শুরু করেছে। বামপন্থী, মধ্যপন্থী ও ডানপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই ও জোট গঠনের আলোচনা চলছে। এই পরিস্থিতিতে গ্রিনস দলের নেতা হিসেবে তন্দলিয়ে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ একজন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন।
তাঁর সামনে অবশ্য রাজনৈতিক লড়াই সহজ নয়। বামপন্থী ও গ্রিন পার্টির মধ্যে বৃহত্তর নির্বাচনী জোট গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত বামপন্থী শিবির থেকে কতজন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়। ফলে তন্দলিয়ের প্রার্থিতা কতটা শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সমীকরণ, জোটের সিদ্ধান্ত এবং জনসমর্থনের ওপর।
জনমত জরিপগুলোও তাঁর জন্য খুব সহজ কোনো পথের ইঙ্গিত দিচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে হলে তাঁকে শুধু নিজের দলের সমর্থন নয়, বৃহত্তর বামপন্থী ও পরিবেশবাদী ভোটারদের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে মধ্যপন্থী ভোটারদের একটি অংশকে আকৃষ্ট করার চ্যালেঞ্জও থাকবে।
এর মধ্যেই গর্ভবতী অবস্থায় প্রচারণা চালানোর বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক যাত্রাকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। তন্দলিয়ে স্বীকার করেছেন, এই অবস্থায় নির্বাচনী প্রচারণা চালানো ‘সত্যিই বড় চ্যালেঞ্জ’। বিশেষ করে গত জুলাইয়ে ফ্রান্সজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যেও তাঁকে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে হয়েছে। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় প্রচারের জন্য বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ানো তাঁর শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার জন্যও বড় পরীক্ষা ছিল।
তবে তন্দলিয়ের এই অবস্থান শুধু তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় হয়ে থাকেনি। এর মধ্য দিয়ে ফ্রান্সে কর্মজীবী নারী, মাতৃত্ব এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের কিছু সামাজিক প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। একজন নারী একই সময়ে মা হওয়ার প্রস্তুতি এবং দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারেন কি না—তাঁর অভিজ্ঞতা সেই প্রশ্নের বাস্তব উদাহরণ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে প্রজনন স্বাস্থ্য ও বন্ধ্যত্বের মতো বিষয়গুলোও তাঁর রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। নিজের অভিজ্ঞতার কারণে তিনি নারীদের মাতৃত্বসংক্রান্ত জটিলতা, সন্তান ধারণে দীর্ঘ অপেক্ষা এবং চিকিৎসার নানা পর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি পরিচিত। ফলে তাঁর সম্ভাব্য নির্বাচনী প্রচারণায় এসব বিষয় আরও গুরুত্ব পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফ্রান্সসহ ইউরোপের অনেক দেশে নারীর কর্মজীবন ও মাতৃত্ব নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক দীর্ঘদিনের। উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক পদে থাকা নারীদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জীবন ও পেশাগত দায়িত্বের ভারসাম্য নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। পুরুষ রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়, নারীদের ক্ষেত্রে একই বিষয় অনেক সময় জনআলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। তন্দলিয়ের অভিজ্ঞতাও সেই বৈষম্যের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে আনতে পারে।
তবে তন্দলিয়ে নিজের মাতৃত্বকে রাজনৈতিক দুর্বলতা হিসেবে উপস্থাপন করতে আগ্রহী নন। বরং তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট যে, শারীরিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যতক্ষণ সম্ভব তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে চান। তিনি জানিয়েছেন, যতক্ষণ বিষয়টি তাঁর কাছে যুক্তিসংগত মনে হবে, ততক্ষণ তিনি প্রচার চালিয়ে যাবেন।
এ অবস্থান তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। পরিবেশ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া গ্রিনস দলের নেতা হিসেবে তন্দলিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক নীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সক্রিয়। মাতৃত্ব ও প্রজননস্বাস্থ্যের মতো ব্যক্তিগত জীবনের বিষয়গুলোকে বৃহত্তর সামাজিক নীতির আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগও তাঁর সামনে তৈরি হয়েছে।
তবে তাঁর গর্ভাবস্থাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আলোচনা যেন তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচিকে আড়াল না করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর মূল্যায়নে তাঁর নীতি, নেতৃত্বের সক্ষমতা, অর্থনীতি, পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে অবস্থানই মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত। একই সঙ্গে একজন নারী রাজনীতিকের মাতৃত্বকে তাঁর রাজনৈতিক যোগ্যতার মাপকাঠি বানানোও সমানভাবে অনুচিত।
তন্দলিয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে তাঁর দীর্ঘ প্রজননসংক্রান্ত সংগ্রামের কারণে। গর্ভপাত এবং আইভিএফের ব্যর্থতার পর হঠাৎ স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে যে গভীর আবেগের বিষয়, তা তিনি নিজেই তুলে ধরেছেন। এ কারণে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার সঙ্গে মাতৃত্বের গল্পটি শুধু নির্বাচনী প্রচারণার একটি ঘটনা নয়; এটি একই সঙ্গে ব্যক্তিগত সংগ্রাম, প্রত্যাশা ও নতুন জীবনের অপেক্ষার গল্পও হয়ে উঠেছে।
২০২৭ সালের নির্বাচনে তন্দলিয়ে শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী হতে পারবেন কি না, কিংবা বামপন্থী শিবিরে তাঁর অবস্থান কতটা শক্তিশালী হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে এরই মধ্যে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা ফ্রান্সের জনপরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তৈরি করেছে। একজন নারী একই সময়ে মাতৃত্বের প্রস্তুতি এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক দায়িত্ব নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছেন—এই দৃশ্য ফ্রান্সের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।
আগামী দিনে নির্বাচনী রাজনীতি যত এগোবে, তন্দলিয়ের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক অবস্থান কীভাবে ভোটারদের কাছে প্রতিফলিত হয়, সেটিই হবে দেখার বিষয়। তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জ একদিকে নির্বাচনী সমীকরণ, অন্যদিকে শারীরিক বাস্তবতা। কিন্তু আপাতত তিনি দুটিকেই পাশাপাশি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে ফ্রান্সের ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আলোচনায় মেরিন তন্দলিয়ের নাম শুধু একজন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নয়, বরং মাতৃত্ব ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে একই সময়ে ধারণ করা এক ব্যতিক্রমী নারীর গল্প হিসেবেও আলোচিত হচ্ছে।