প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নামে থাকা স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক এবং অস্থাবর সম্পত্তি অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন ঢাকার সিনিয়র বিশেষ জজ আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার আদালত এ আদেশ দেন। বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে একাধিক আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান ও মামলা চলমান রয়েছে।
দুদকের আবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাবেক রাষ্ট্রপতির প্রায় ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব সম্পদ যাতে হস্তান্তর, বিক্রি বা অন্য কোনোভাবে গোপন করা না যায়, সে জন্য আদালতের কাছে সেগুলো ক্রোক ও অবরুদ্ধ করার আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পদগুলোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ দেন।
আদালতের আদেশের আওতায় থাকা সম্পদের মধ্যে সাহাবুদ্দিনের নামে থাকা ১৮টি প্লট এবং দুটি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। ব্যাংক হিসাব দুটিতে মোট প্রায় ৩৭ হাজার টাকা রয়েছে বলে দুদকের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থাবর সম্পত্তি হিসেবে প্লটগুলো এবং অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে ব্যাংক হিসাবগুলোকে আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়েছে।
এ ধরনের আদেশের মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো মামলার তদন্ত বা বিচার চলাকালে সংশ্লিষ্ট সম্পদ যেন অভিযুক্ত ব্যক্তি হস্তান্তর, বিক্রি, স্থানান্তর বা অন্য কোনো উপায়ে তদন্তের আওতার বাইরে নিয়ে যেতে না পারেন, তা নিশ্চিত করা। সম্পত্তি ক্রোক বা অবরুদ্ধ হওয়ার অর্থ এই নয় যে আদালত ইতিমধ্যে ওই সম্পদের মালিকানাকে অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত বলে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করেছেন। বরং বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত সম্পদের ওপর নির্দিষ্ট আইনগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় পৌনে দুই বছর আগে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের পর তিনি বঙ্গভবন ছেড়ে ব্যক্তিগত বাসভবনে ফিরে যান। তার রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়ার পরপরই বিভিন্ন অভিযোগ ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে তাকে ঘিরে রাজনৈতিক ও জনপরিসরে আলোচনা নতুন মাত্রা পায়।
সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের পরিধিও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। এর আগে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করে দুদকে আবেদন করেছে। ব্যাংকটির অভিযোগ, তিনি ব্যাংকের পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান থাকাকালে একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণসীমা ১০০ কোটি টাকা থেকে ৫০০ কোটি টাকায় বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছিলেন এবং পরে ওই ঋণের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। তবে এসব অভিযোগ এখনো বিচারিকভাবে প্রমাণিত হয়নি।
এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে প্রায় ২৫১ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগে সাহাবুদ্দিনসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে। ওই মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদালত আগামী ২৭ অক্টোবর তারিখ নির্ধারণ করেছেন। মামলাটিতে দুর্নীতি, প্রতারণা ও অবৈধ বলপ্রয়োগের মাধ্যমে শেয়ার অধিগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের আগে সাহাবুদ্দিন ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর গঠিত পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়ান।
বর্তমান সম্পত্তি ক্রোক ও অবরুদ্ধের আদেশটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ এটি সরাসরি তার নামে থাকা সম্পদের ওপর আইনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। দুদকের পক্ষ থেকে আদালতে উপস্থাপিত তথ্যের ভিত্তিতে সম্পদের উৎস, মালিকানা এবং আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় রয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটিই পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সাধারণত তখনই সামনে আসে, যখন কোনো ব্যক্তির ঘোষিত বা বৈধ আয়ের সঙ্গে তার নামে থাকা সম্পদ ও সম্পদ অর্জনের পরিমাণের মধ্যে অসামঞ্জস্যের অভিযোগ পাওয়া যায়। তবে শুধু সম্পদের পরিমাণ বেশি হওয়াই অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। সম্পদের বৈধ উৎস, আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন, জমির দলিল, ক্রয়মূল্য এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা হয়।
সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে দুদক যে প্রায় ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য পাওয়ার কথা আদালতে জানিয়েছে, তা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৮টি প্লট কীভাবে অর্জিত হয়েছে, সেগুলোর ক্রয়মূল্য ও বর্তমান মূল্য কত, সম্পদ কেনার সময় তার বৈধ আয় কত ছিল এবং ব্যাংক হিসাবগুলোর অর্থের উৎস কী—এসব প্রশ্ন তদন্তে গুরুত্ব পেতে পারে।
এর পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে চলমান অন্যান্য মামলাগুলোর সঙ্গে এই সম্পত্তি-সংক্রান্ত অনুসন্ধানের কোনো আর্থিক যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে পৃথক অভিযোগ ও মামলার বিষয়গুলোকে আলাদাভাবে বিবেচনা করাই বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক নিয়ম। কোনো একটি মামলায় অভিযোগ থাকা মানেই অন্য অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগের পর তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে। তার পদত্যাগের পর সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি আইন অনুযায়ী নির্ধারিত কিছু সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হলেও, পদত্যাগের পর তার বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াগুলো আলাদা আইনি কাঠামোর অধীনে চলবে।
এদিকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদের সম্পদ ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে। সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে দুদকের সম্পদ-সংক্রান্ত পদক্ষেপ তাই কেবল একটি ব্যক্তিকে ঘিরে আইনি ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্পদের উৎস ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত।
তবে আইনের দৃষ্টিতে অভিযোগ, অনুসন্ধান, মামলা এবং দোষ প্রমাণ—প্রতিটি পর্যায় আলাদা। আদালতের বর্তমান আদেশ সম্পদ সংরক্ষণ ও আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার একটি পদক্ষেপ। পরবর্তী তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে অভিযোগের বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট সম্পদের আইনগত অবস্থান।
সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের নামে থাকা ১৮টি প্লট ও দুটি ব্যাংক হিসাব নিয়ে আদালতের এই আদেশ এখন পরবর্তী তদন্তের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দুদকের অনুসন্ধান কতদূর এগোয়, সম্পদগুলোর উৎস সম্পর্কে কী তথ্য পাওয়া যায় এবং চলমান অন্যান্য মামলার অগ্রগতি কী হয়—এসব প্রশ্নের উত্তরই সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা ও বিচারিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে এই সম্পদগুলোর চূড়ান্ত আইনগত পরিণতি।