প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়ে ‘চায়না-শক’ বা চীন-ধাক্কার একটি বহুল প্রচলিত ধারণা রয়েছে। এই ধারণা অনুযায়ী, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্পে বিপুলসংখ্যক চাকরি হারিয়েছে এবং দেশটির শিল্পভিত্তি দুর্বল হয়েছে। একই সঙ্গে অনেকে মনে করেন, এটি ছিল একটি শক্তিশালী অভিজাত গোষ্ঠীর নেওয়া সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
তবে অর্থনৈতিক গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি শ্রমবাজারের তথ্য বলছে, বাস্তবতা এতটা সরল নয়। চীনা আমদানি যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলে ও শিল্পে চাকরি কমানোর ক্ষেত্রে অবশ্যই ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু উৎপাদনশিল্পে দীর্ঘদিন ধরে চলা কর্মসংস্থান হ্রাসের একমাত্র বা প্রধান কারণ হিসেবে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যকে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না।
২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে স্থায়ী স্বাভাবিক বাণিজ্যসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। পরের বছর ২০০১ সালে চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যোগ দেয়। এরপর দুই দেশের বাণিজ্য দ্রুত বাড়ে। এই সময়টিকেই অনেক ক্ষেত্রে ‘চায়না-শক’-এর সূচনাকাল হিসেবে দেখা হয়।
অর্থনীতিবিদ ডেভিড অটর, ডেভিড ডর্ন ও গর্ডন হ্যানসনের ২০১৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, চীনা পণ্যের আমদানি প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্পে কর্মসংস্থান কমার সম্পর্ক রয়েছে। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্পে নিট প্রায় ১৫ লাখ চাকরি কমে যায়।
পরবর্তী গবেষণায় অটর, ডর্ন ও হ্যানসন অর্থনীতিবিদ ড্যারন অ্যাসেমোগ্লুর সঙ্গে কাজ করে দেখান, চীনা আমদানি প্রতিযোগিতার কারণে ২০১১ সাল পর্যন্ত সর্বোচ্চ প্রায় ২৪ লাখ চাকরি হারিয়ে থাকতে পারে।
এই সংখ্যা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের স্বাভাবিক গতিশীলতার সঙ্গে তুলনা করলে এর প্রকৃতি আরও স্পষ্ট হয়।
২০০০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত একটি সাধারণ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ চাকরি হারাতেন, চাকরি ছাড়তেন অথবা তাঁদের চাকরির মেয়াদ শেষ হতো। এর মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ২৫ হাজার ছিলেন উৎপাদনশিল্পের শ্রমিক। অর্থাৎ শ্রমবাজারে চাকরি সৃষ্টি ও হারানোর বিশাল প্রবাহ আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তথ্যেও চাকরি ছাড়ার ও হারানোর হার মোটামুটি একই ধরনের রয়েছে।
শুধু আমদানি নয়, রপ্তানিও গুরুত্বপূর্ণ
‘চায়না-শক’ নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই আমদানি প্রতিযোগিতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বাণিজ্যের আরেকটি দিক হলো রপ্তানি। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য এবং বৃহত্তর অর্থে বিশ্বায়ন যেমন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শিল্পে বিদেশি প্রতিযোগিতা বাড়িয়েছে, তেমনি দেশটির রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন বাজারও তৈরি করেছে।
অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, বাণিজ্য উন্মুক্ত হলে একটি দেশের মোট কর্মসংস্থানের ওপর এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত হওয়ার কথা। কোনো একটি খাতে আমদানি প্রতিযোগিতার কারণে চাকরি কমলে অন্য কোনো রপ্তানিমুখী খাত বা প্রতিষ্ঠানে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ রবার্ট ফিনস্ট্রা ও তাঁর সহলেখকদের ২০১৯ সালের গবেষণায় বাণিজ্যের দুই দিকই বিবেচনায় নেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৯১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে চীনা পণ্যের আমদানি প্রতিযোগিতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৯ লাখ চাকরি কমেছিল। অন্যান্য দেশের আমদানি প্রতিযোগিতার কারণেও কিছু চাকরি হারায়।
কিন্তু একই সময়ে রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে প্রায় সমপরিমাণ নতুন চাকরিও তৈরি হয়েছিল। ফলে শুধু আমদানি কমানোর সংখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক কর্মসংস্থানে বাণিজ্যের প্রভাব বিচার করলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
উৎপাদনশিল্পে পতন চীনের আগেই শুরু
যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্পে কর্মসংস্থান কমার ইতিহাস আরও পুরোনো। ১৯৫০-এর দশকের শুরু থেকেই মোট কর্মসংস্থানে উৎপাদনশিল্পের অংশ ধীরে ধীরে কমেছে। এই প্রবণতা ২০০০ সালে চীনের সঙ্গে স্থায়ী স্বাভাবিক বাণিজ্যসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বহু আগেই শুরু হয়েছিল।
এখানে উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে একই পরিমাণ পণ্য আগের তুলনায় কম শ্রমিক দিয়েই উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। ফলে উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদনশিল্পে কর্মসংস্থান কমতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি তথ্যও দেখায়, ২০০০ বা ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্পে কর্মসংস্থানের অংশে এমন কোনো আকস্মিক পরিবর্তন ঘটেনি, যাকে এককভাবে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের মোড় বলা যায়।
অর্থাৎ চীনা আমদানি প্রতিযোগিতা নির্দিষ্ট শিল্প ও অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্পে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান হ্রাসকে কেবল চীনের ওপর দায় চাপিয়ে ব্যাখ্যা করা অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
চীনের সঙ্গে বাণিজ্য কি একক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল?
আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ক্ষমতাবান অভিজাত গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য উন্মুক্ত করেছিল। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, বিষয়টি এতটা সরল ছিল না।
২০০০ সালে স্থায়ী স্বাভাবিক বাণিজ্যসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিবছর চীনের বাণিজ্য মর্যাদা নবায়ন করতে হতো। ফলে স্থায়ী মর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনিশ্চয়তা কমিয়েছিল এবং চীনা রপ্তানির প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল।
তবে চীনের রপ্তানি বৃদ্ধির পেছনে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নীতিই কাজ করেনি। চীন নিজেও ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে শুল্ক কমিয়েছে, বাজার সংস্কার করেছে এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যও ২০০১ সালের আগেই দ্রুত বাড়ছিল। ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানিতে চীনা পণ্যের অংশ ছিল প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ। ১৯৯৩ সালে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছায় এবং ১৯৯৯ সালে প্রায় ৮ শতাংশ হয়।
২০০০ সালে চীনা পণ্যের অংশ ছিল প্রায় ৮ দশমিক ২ শতাংশ। ২০০৭ সালের মধ্যে তা দ্বিগুণ হয়ে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছায়।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের যোগদানের আগে থেকেই দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দ্রুত গভীর হচ্ছিল।
ভোক্তা ও ব্যবসার সিদ্ধান্তও ছিল গুরুত্বপূর্ণ
চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণকে শুধু ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখাও সঠিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের লাখো ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিজেরাই ক্রমাগত চীনে তৈরি পণ্য কিনতে শুরু করেছিল।
কম দামে পণ্য পাওয়া, সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্কের বিস্তারের ফলে চীনা পণ্যের চাহিদা বাড়ে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের যোগদানের পর এই প্রবণতা আরও দ্রুত হয়।
অর্থাৎ ‘চায়না-শক’ কোনো একক সিদ্ধান্তের ফল নয়। এর পেছনে ছিল নীতি পরিবর্তন, চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কার, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং কোটি কোটি ভোক্তা ও ব্যবসার বিকেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত।
বড় শিক্ষা: শ্রমিকদের স্থানান্তর সহজ নয়
তবে এর অর্থ এই নয় যে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের কোনো ক্ষতি হয়নি। বরং ২০০০-এর দশকের অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে।
কোনো অঞ্চলে একটি শিল্পের পতন হলে সেখানকার শ্রমিকেরা সহজেই অন্য খাতে চলে যাবেন—অর্থনীতির প্রচলিত মডেলে এমনটা ধরে নেওয়া হলেও বাস্তবে বিষয়টি অনেক কঠিন। দক্ষতা, পরিবার, আবাসন, স্থানীয় সামাজিক সম্পর্ক এবং নতুন চাকরির ভৌগোলিক অবস্থান—সবকিছু শ্রমিকের স্থানান্তরের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
অর্থনৈতিক সুযোগ কমে যাওয়া অঞ্চল থেকেও মানুষ আগের তুলনায় কম স্থানান্তরিত হতে চান। ফলে একটি শিল্পের পতনের পর শ্রমিকদের নতুন কর্মসংস্থানে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
এ কারণেই ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শুধু বাজারকে কাজ করতে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। শ্রমিকদের নতুন দক্ষতা অর্জনে সহায়তা, চাকরি পরিবর্তনের সময় আয় সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে সরকারি উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সামনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যালেঞ্জ
এই শিক্ষা ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বিশেষ করে জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি শ্রমবাজারে নতুন ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
কোনো অঞ্চলে প্রযুক্তির কারণে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা এলে সেখানকার শ্রমিকদের নতুন অঞ্চলে বা নতুন শিল্পে যাওয়ার জন্য সরকারি সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। নতুন চাকরি পাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে সাময়িক আয় সহায়তা বা ভর্তুকির ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে এর অর্থ অর্থনীতির চারপাশে দেয়াল তুলে দেওয়া নয়। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের গতি থামানোর চেষ্টাও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান হবে না।
‘চায়না-শক’ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—অর্থনৈতিক উন্মুক্ততা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন একই সঙ্গে সুযোগ এবং ক্ষতি তৈরি করতে পারে। ক্ষতির শিকার মানুষ ও অঞ্চলগুলোকে সহায়তা করা দরকার, কিন্তু অর্থনৈতিক গতিশীলতা বন্ধ করে দেওয়া নয়।
দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির জন্য অর্থনৈতিক উদারতা, উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুযোগ ধরে রাখার পাশাপাশি পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে শ্রমিকদের জন্য কার্যকর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করাই বেশি কার্যকর পথ।