ইরানের বিরুদ্ধে কঠোরতম নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, আগামী সোমবার নতুন নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজের বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হলো ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে চাপে রাখা এবং বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার প্রয়োজন কমিয়ে আনা।

বৃহস্পতিবার সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল হবে দুটি দিক থেকে চাপ সৃষ্টি করা। এর মধ্যে থাকবে নৌ অবরোধ এবং কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। তাঁর দাবি, এই দুই পদক্ষেপ একসঙ্গে কার্যকর করা গেলে তেহরানের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করা সম্ভব হবে।

এর এক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ ঘোষণার হুঁশিয়ারি দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, কোনো দেশ যদি তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর কিংবা সরকারি সংস্থার মাধ্যমে ইরানকে সহায়তা করে, তাহলে সেই দেশকেও গুরুতর অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।

বেসেন্ট জানান, আগামী সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। ওই দিন ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী ধরনের অর্থনৈতিক ও আর্থিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

মার্কিন অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলে ইরানের ওপর আরোপ করা নৌ অবরোধ এবং নতুন নিষেধাজ্ঞা একই সঙ্গে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। ওই নৌ অবরোধ জুনের মাঝামাঝি এক মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল। এখন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সেটিকে সমন্বয় করে ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে চায় ওয়াশিংটন।

ইরানের তেল বাণিজ্যও নতুন মার্কিন কৌশলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরান সমুদ্রপথে যে পরিমাণ তেল রপ্তানি করে, তার ৮০ শতাংশের বেশি কিনে থাকে চীন। ফলে ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য টানাপোড়েন নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

চীনকে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে বেসেন্ট সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। তিনি বলেন, এ ধরনের বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা প্রকাশ্যে না করে ব্যক্তিগত পর্যায়ে করাই ভালো। তবে তিনি উল্লেখ করেন, চীনের প্রায় অর্ধেক জ্বালানি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে। তাই হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করা বেইজিংয়েরও স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই চাপ প্রয়োগের নীতির বিরোধিতা করেছে চীন। ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা কিংবা অর্থনৈতিক চাপ কোনো সমস্যার কার্যকর সমাধান নয়। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ করা এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে সংকট সমাধানের চেষ্টা করা উচিত বলে জানিয়েছে বেইজিং।

ইরানও নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করেছে। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে আসছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাস’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে ইরানের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার অবস্থান থেকে দেশটিকে সরানো যাবে না।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে ইরান। গত প্রায় পাঁচ দশকে তেহরানের তেল, ব্যাংকিং, বাণিজ্য ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতকে লক্ষ্য করে একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, নতুন প্যাকেজ আগের সব পদক্ষেপের তুলনায় আরও কঠোর হবে।

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের প্রভাব এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে পড়তে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার মার্কিন হুমকির পর অপরিশোধিত তেলের দাম তিন সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে যায়। বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, নতুন নিষেধাজ্ঞা ইরানের তেল রপ্তানি এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিবহনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি এই জলপথ। ইরান অতীতে সেখানে জাহাজ চলাচল সীমিত করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়ে প্রায় ছয় মাসে পৌঁছেছে। এতে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হওয়ার পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশও সংঘাতের প্রভাবের মধ্যে পড়েছে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এই সংঘাতের অন্যতম বড় আন্তর্জাতিক প্রভাব হিসেবে দেখা দিয়েছে।

সংঘাত থামাতে এপ্রিল ও জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুটি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হলেও কোনোটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সংঘাত অবসানের পথ তৈরি করাই ছিল এসব উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু দুই দফার যুদ্ধবিরতিই দ্রুত ভেঙে পড়ে।

নতুন নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক চাপ রয়েছে। ইরান সংঘাতের কারণে জ্বালানি মূল্য বাড়লে তা মার্কিন অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে উচ্চ জ্বালানি মূল্য ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ট্রাম্পের বক্তব্যেরও সমালোচনা করেছেন। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যার দিক থেকে জনমতের দৃষ্টি সরাতেই ইরানকে কেন্দ্র করে এমন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। তিনি ওয়াশিংটনের নীতির সমালোচনা করে বলেছেন, একই ধরনের চাপ প্রয়োগের ধারাবাহিকতা শেষ পর্যন্ত আরও ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যাবে।

সব মিলিয়ে আগামী সোমবার ঘোষিতব্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নতুন পর্যায় তৈরি করতে পারে। অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি নৌ অবরোধ কার্যকর হলে ইরানের তেল রপ্তানি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক জ্বালানি পরিবহনে এর প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে চীনসহ ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কও নতুন করে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত