এক বছরে ১০ লাখ নতুন গ্রাহক জনতা ব্যাংকে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬ বার
এক বছরে ১০ লাখ নতুন গ্রাহক জনতা ব্যাংকে

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ব্যাংক পিএলসি এক বছরে প্রায় ১০ লাখ নতুন গ্রাহক পেয়েছে। ব্যাংকটির ১৯তম বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রাহকসংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি আমানত, ঋণ ও অগ্রিম, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও ব্যাংকটি কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নতুন গ্রাহক যুক্ত হওয়াকে ব্যাংকিং সেবার বিস্তৃতি এবং মানুষের আর্থিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ বাড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ঢাকার মতিঝিলে জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গত মঙ্গলবার ব্যাংকটির ১৯তম এজিএম অনুষ্ঠিত হয়। ব্যাংকের চেয়ারম্যান মুহ. ফজলুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমানসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

এজিএমে জানানো হয়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে জনতা ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকটির ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ বেড়ে ১ লাখ ৫ হাজার ১১৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ আমানত সংগ্রহের পাশাপাশি অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ঋণ সরবরাহের কার্যক্রমও অব্যাহত রেখেছে ব্যাংকটি।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি ও তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি কৃষি, কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা বা সিএমএসএমই এবং সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিভিন্ন খাতে ঋণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়াতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই খাতে ব্যাংকিং সহায়তা বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে জনতা ব্যাংকের কার্যক্রম শুধু বাণিজ্যিক লাভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, রপ্তানিমুখী ব্যবসা এবং সরকারি অগ্রাধিকার খাতে অর্থায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার ক্ষেত্রেও ব্যাংকটির ভূমিকা রয়েছে। এ কারণে নতুন গ্রাহক যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি কোন খাতে ঋণ যাচ্ছে এবং ঋণের মান কেমন থাকছে, সেটিও ব্যাংকটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এজিএমে বৈদেশিক বাণিজ্য ও প্রবাসী আয়সংক্রান্ত কার্যক্রমের অগ্রগতির তথ্যও তুলে ধরা হয়। আমদানি, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে জনতা ব্যাংকের অর্জন হয়েছে যথাক্রমে ১১৪ শতাংশ, ৮৮ শতাংশ এবং ১০৪ শতাংশ। অর্থাৎ আমদানি ও প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে ব্যাংকটি। তবে রপ্তানি কার্যক্রমে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অর্জন কিছুটা কম হয়েছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও প্রবাসী আয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, পারিবারিক ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখে। ফলে জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী আয় আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করার তথ্য ব্যাংকটির বৈদেশিক মুদ্রা-সংক্রান্ত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের একটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরে।

অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো শ্রেণীকৃত বা খেলাপি ঋণ। জনতা ব্যাংকও দীর্ঘদিন ধরে এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এজিএমে জানানো হয়েছে, গত বছর শ্রেণীকৃত ঋণ থেকে ৬১৪ কোটি টাকা নগদ আদায় করা হয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে নগদ অর্থ ফেরত আসা ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

লোকসানি শাখার সংখ্যাও কমেছে বলে সভায় জানানো হয়। একসময় ব্যাংকটির লোকসানি শাখার সংখ্যা ছিল ৩৮টি। সেটি কমে বর্তমানে ১৮টিতে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক বছরে লোকসানি শাখার সংখ্যা ২০টি কমেছে। শাখাগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও পরিচালন দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে লোকসান কমানোর এই প্রবণতা ব্যাংকের সামগ্রিক কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এজিএমে ব্যাংকটির মোট সম্পদের পরিমাণও তুলে ধরা হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে জনতা ব্যাংকের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। একটি ব্যাংকের মোট সম্পদের আকার তার সামগ্রিক কার্যক্রম ও আর্থিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আমানত, ঋণ, বিনিয়োগ ও অন্যান্য সম্পদের সমন্বয়ে এই সম্পদের পরিমাণ গড়ে ওঠে।

সভায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমান জনতা ব্যাংকের বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রমের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০২৫ সালে ব্যাংকটি করপোরেট আয়কর বাবদ ৭২৪ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে। এর পাশাপাশি উৎসে কর, ভ্যাট ও আবগারি শুল্ক বাবদ আরও ২ হাজার ২২৭ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কার্যক্রম থেকে সরকারের রাজস্ব আহরণেও এ ধরনের অর্থপ্রদান গুরুত্বপূর্ণ।

জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান মুহ. ফজলুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবু সালেহ মো. মহিউদ্দিন খাঁ উপস্থিত ছিলেন। পরিচালনা পর্ষদের সদস্য বদরে মুনির ফেরদৌস, আবদুল মজিদ শেখ, আবদুল আউয়াল সরকার, মো. শাহাদাৎ হোসেন, মো. আহসান কবীর, মো. কাউসার আলম এবং অধ্যাপক এ এ মাহবুব উদ্দিন চৌধুরী সভায় অংশ নেন। ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী আবদুর রহমান ও মো. ফয়েজ আলমও উপস্থিত ছিলেন।

ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে গ্রাহকের আস্থা, সেবার মান, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। নতুন করে প্রায় ১০ লাখ গ্রাহক যুক্ত হওয়ার অর্থ হলো বিপুলসংখ্যক মানুষ ও প্রতিষ্ঠান জনতা ব্যাংকের বিভিন্ন সেবার আওতায় এসেছে। তবে গ্রাহক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের জন্য দ্রুত, নিরাপদ ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করাও ব্যাংকটির জন্য বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রত্যাশা অনেক বেশি। সাধারণ সঞ্চয়কারী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, কৃষক, প্রবাসী পরিবারের সদস্য এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা—বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এসব ব্যাংকের সেবা গ্রহণ করেন। ফলে গ্রাহকসংখ্যা বৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে রূপ দিতে হলে সেবার গুণগত মান এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ধরে রাখা প্রয়োজন।

জনতা ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং স্বল্পমেয়াদি খাতে ঋণ বিতরণে গুরুত্ব দিচ্ছে। কৃষি ও সিএমএসএমই খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর মাধ্যমে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে অর্থের প্রবাহ বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রেণীকৃত ঋণ থেকে অর্থ আদায় এবং লোকসানি শাখার সংখ্যা কমানোর মাধ্যমে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় উন্নতি আনার চেষ্টা চলছে।

তবে নতুন গ্রাহক অর্জন, আমানত বৃদ্ধি কিংবা সম্পদের আকার বড় হওয়ার পাশাপাশি ঋণের গুণগত মান নিশ্চিত করা জনতা ব্যাংকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। কারণ ঋণ বিতরণ বাড়লেও তা যথাসময়ে আদায় না হলে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তাই নতুন গ্রাহক ও ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং সুশৃঙ্খল ঋণ ব্যবস্থাপনার ওপর নজর রাখা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে এক বছরে প্রায় ১০ লাখ নতুন গ্রাহক অর্জন, ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৫০ কোটি টাকার আমানত, ১ লাখ ৫ হাজার ১১৯ কোটি টাকার ঋণ ও অগ্রিম এবং ১ লাখ ৬০ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকার মোট সম্পদের তথ্য জনতা ব্যাংকের বর্তমান অবস্থার একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে লোকসানি শাখা কমানো এবং শ্রেণীকৃত ঋণ থেকে নগদ অর্থ আদায়ের তথ্য ব্যাংকটির পরিচালন দক্ষতা বাড়ানোর প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী দিনে এসব অগ্রগতি কতটা টেকসই হয় এবং গ্রাহকসেবার মান ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় কতটা উন্নতি আসে, সেটিই হবে ব্যাংকটির জন্য বড় পরীক্ষার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত