জুলাইয়ে ব্রিটেনের বাজেট ঘাটতি ১৮০ কোটি পাউন্ড

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার
জুলাইয়ে ব্রিটেনের বাজেট ঘাটতি ১৮০ কোটি পাউন্ড

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ব্রিটেনের সরকারি অর্থব্যবস্থায় নতুন করে চাপের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। চলতি বছরের জুলাই মাসে দেশটির সরকার অপ্রত্যাশিতভাবে ১৮০ কোটি পাউন্ড বাজেট ঘাটতিতে পড়েছে। মূল্যস্ফীতির প্রভাবে সরকারি ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়াই এই ঘাটতির অন্যতম প্রধান কারণ বলে জানিয়েছে দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তর। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, জুলাই মাসে ব্যক্তিগত আয়কর থেকে সরকার রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহ করলেও সেই বাড়তি আয় সরকারি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে পারেনি।

জুলাই মাস সাধারণত ব্রিটিশ সরকারের জন্য রাজস্ব আদায়ের দিক থেকে তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ সময়। বিশেষ করে স্বনির্ধারিত আয়কর থেকে এ সময় উল্লেখযোগ্য অর্থ সরকারি কোষাগারে আসে। সেই কারণে অর্থনীতিবিদেরা আশা করেছিলেন, জুলাইয়ে সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে অন্তত ভারসাম্য থাকবে। এমনকি বাজেট দায়বদ্ধতা কার্যালয় বা ওবিআরও জুলাইয়ে প্রায় ৫০ কোটি পাউন্ড বাজেট উদ্বৃত্তের পূর্বাভাস দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা গেছে।

সরকারি হিসাবে জুলাইয়ে ১৮০ কোটি পাউন্ড ধার করতে হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসের তুলনায় এটি বড় ধরনের বিচ্যুতি। ওবিআরের পূর্বাভাস অনুযায়ী জুলাইয়ে উদ্বৃত্ত থাকার কথা ছিল। সেই পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে করোনাভাইরাস মহামারির আগের সময়ের পর কোনো জুলাইয়ে প্রথমবারের মতো ব্রিটেনের সরকারি অর্থব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত দেখা যেত। কিন্তু বাড়তে থাকা সরকারি ব্যয়ের কারণে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেয়নি।

জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় চলতি বছরের জুলাইয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সামাজিক সুবিধা খাতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২০০ কোটি পাউন্ড। একই সময়ে পণ্য ও সেবা খাতেও সরকারি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১২০ কোটি পাউন্ড। সরকারি কর্মীদের বেতনসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যয়ও এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত। মূল্যস্ফীতি যখন সরকারি পরিষেবা, কর্মীদের বেতন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, তখন সরকারের জন্য আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করাও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে জুলাইয়ে ব্যক্তিগত আয়কর থেকে ব্রিটিশ সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ ছিল শক্তিশালী। স্বনির্ধারিত আয়কর থেকে সরকারের আয় ১৭১০ কোটি পাউন্ডে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭০ কোটি পাউন্ড বেশি। সাধারণত জুলাইয়ে আয়কর আদায়ের পরিমাণ বাড়ে, ফলে সরকারের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থায় এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা। কিন্তু এবার বাড়তি রাজস্বের তুলনায় ব্যয়ের চাপ বেশি হওয়ায় সেই আয় বাজেট ঘাটতি ঠেকাতে পারেনি।

চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসের হিসাবও সরকারের জন্য পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৬৭০ কোটি পাউন্ড। অথচ এই সময়ের জন্য ওবিআরের পূর্বাভাস ছিল ৫৪৪০ কোটি পাউন্ড। অর্থাৎ সরকারের প্রকৃত ঋণ পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় ২৩০ কোটি পাউন্ড বেশি হয়েছে। যদিও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সামগ্রিক ঋণ কিছুটা কমেছে, প্রত্যাশার তুলনায় বেশি ঋণ নেওয়ার বিষয়টি সরকারের আর্থিক পরিকল্পনার ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।

তবে সব সূচকই যে নেতিবাচক, তা নয়। এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত সরকারের বর্তমান বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৪৭০ কোটি পাউন্ড, যা একই সময়ের জন্য ওবিআরের ৩৬৭০ কোটি পাউন্ডের পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় ২০০ কোটি পাউন্ড কম। অর্থাৎ সামগ্রিক কিছু সূচকে সরকার পূর্বাভাসের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু জুলাইয়ের অপ্রত্যাশিত ঘাটতি এবং সামনে থাকা ব্যয়ের চাপ অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ব্রিটেনের সরকারি ঋণের পরিমাণও এখন অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। জুলাই শেষে দেশটির সরকারি ঋণ প্রায় ২ দশমিক ৯৮ ট্রিলিয়ন পাউন্ডে পৌঁছেছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৯৪ শতাংশের সমান। একই সময়ে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার এবং সরকারি বন্ডের ফলন উঁচু থাকায় ভবিষ্যতে ঋণ ব্যবস্থাপনার ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম এবং অর্থমন্ত্রী জন হিলির সামনে আর্থিক ব্যবস্থাপনা বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে অর্থমন্ত্রী হিলির জন্য আগামী অক্টোবরের বাজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। সরকারের আয় বাড়ানো, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমানো এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে তাকে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের সামনে কিছুটা আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক কিছু অর্থনৈতিক সূচক প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল দেখিয়েছে। তবে প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি সরকারি ব্যয় যদি একই গতিতে বাড়তে থাকে, তাহলে বাজেট ঘাটতি কমানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা, সরকারি পরিষেবা এবং কর্মীদের বেতন বাবদ ব্যয় বাড়তে থাকলে সরকারের হাতে থাকা আর্থিক সুযোগ আরও সংকুচিত হতে পারে।

এদিকে ব্রিটেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রাখার কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। জুলাইয়ের মুদ্রানীতি প্রতিবেদনে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এলেও জ্বালানি ও অন্যান্য খরচের প্রভাবের কারণে বছরের পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে পারে। ফলে সরকারের ব্যয় এবং রাজস্ব নীতির সঙ্গে মুদ্রানীতির সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

অর্থমন্ত্রী জন হিলি অবশ্য সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আর্থিক শৃঙ্খলা যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। সরকার নির্ধারিত আর্থিক নিয়ম মেনে চলার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন কোনো অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তা মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, চলতি অর্থবছরে যদি সরকারি ঋণ প্রত্যাশার তুলনায় বেশি থাকে, তাহলে আগামী বাজেটে সরকারের হাতে থাকা আর্থিক সুযোগ আরও সীমিত হতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ সুদের হার ও সরকারি বন্ডের ফলন ঋণের খরচ বাড়িয়ে দিলে ভবিষ্যৎ বাজেটে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে সরকারকে একদিকে ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিনিয়োগ ও জনসেবায় অর্থ ব্যয়ের চাপও সামলাতে হবে।

ব্রিটেনের জন্য জুলাইয়ের ১৮০ কোটি পাউন্ড ঘাটতি তাই শুধু একটি মাসের হিসাব নয়; এটি সরকারের সামনে থাকা বৃহত্তর আর্থিক চ্যালেঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। রেকর্ড আয়কর আদায় সত্ত্বেও যদি ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে বাজেট ঘাটতি কমানোর সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আরও কঠিন হবে। আগামী অক্টোবরের বাজেটে সরকার কীভাবে এই চাপ সামাল দেয়, কোন খাতে ব্যয় কমায় এবং প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়—সেদিকেই এখন নজর অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত