প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের মধ্যে শিল্পকারখানার অব্যবহৃত ছাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় উৎস হতে পারে। তৈরি পোশাক খাতের ৩ হাজার ৩২০টি কারখানার ছাদ ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট-পিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। এতে পোশাকশিল্পের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৪ শতাংশ মেটানো যেতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘পোশাক কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা: চীনা প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ সুযোগ’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে সমীক্ষার তথ্য প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
সিপিডির সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতে প্রায় ৯৭ লাখ বর্গমিটার অব্যবহৃত ছাদ রয়েছে। এসব ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করা হলে ১ হাজার ৭৬৮ থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট-পিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। অথচ বর্তমানে এ খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার মোট জ্বালানি ব্যবহারের মাত্র ৩ শতাংশ।
সমীক্ষায় আরও বলা হয়, এই বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। ইতোমধ্যে ৩৭৫টি পোশাক কারখানার ছাদ সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। আরও ১ হাজার ১৪২টি কারখানায় বিনিয়োগ সহায়তা প্রয়োজন।
সিপিডির গবেষণা সহযোগী আবরার আহাম্মেদ ভূঁইয়া ও নূর ইয়ানা জান্নাত সমীক্ষার প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। তাঁরা জানান, শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে একদিকে বিদ্যুৎ সংকটের চাপ কমানো সম্ভব, অন্যদিকে পোশাকশিল্পের উৎপাদন খরচও কমানো যেতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কেনার তুলনায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় হতে পারে মাত্র ৩ টাকা ৪ পয়সা। কোনো কারখানার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা গেলে মাসিক বিদ্যুৎ ব্যয় প্রায় ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ কমানো সম্ভব।
তবে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘসূত্রতা, সৌর সরঞ্জাম আমদানিতে উচ্চ শুল্ক, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটকে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সমীক্ষায় বলা হয়, সৌরবিদ্যুতের এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইডকল এবং চীনা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত। ফলে নীতিগত সহায়তা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে পোশাকশিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো সম্ভব।
পোশাক খাতে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনার বাস্তব উদাহরণ হিসেবে হা-মীম গ্রুপের বিভিন্ন কারখানার কথা তুলে ধরা হয়। গ্রুপটির কালীগঞ্জ ও মাওনার ডেনিম, স্পিনিং ও টেক্সটাইল কারখানাগুলোতে বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসছে।
অনুষ্ঠানে হা-মীম গ্রুপের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের প্রধান তানুল চক্রবর্তী জানান, সিলেটে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব চা বাগানের জমি ব্যবহার করে ৭৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে উচ্চ শুল্ক, ব্যাংকঋণের চড়া সুদ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটকে তিনি এ খাতে বিনিয়োগের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বিশ্ববাজারেও পোশাকশিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এইচ অ্যান্ড এম, ইনডিটেক্স, ওয়ালমার্ট ও গ্যাপের মতো বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো সরবরাহকারী কারখানার কার্বন নিঃসরণ কমাতে কঠোর শর্ত আরোপ করছে। ফলে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর জন্য নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।
আলোচনায় বিকেএমইএর পরিচালক মিনহাজ উল হক বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে তুরস্কে ইতোমধ্যে হাজার হাজার কারখানা বন্ধ হয়েছে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পেও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। তাঁর মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী স্বপন কুমার বণিক জানান, বর্তমানে দেশের ৬৪১টি সেচ পাম্প সৌরবিদ্যুতে পরিচালিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে দেশের সব সেচ পাম্পকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির সহসভাপতি জাহিদুল আলম সৌর প্যানেল আমদানিতে শুল্ক কাঠামোর অসঙ্গতির বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, বাণিজ্যিকভাবে প্যানেল আমদানির ক্ষেত্রে সাড়ে ১৩ শতাংশ শুল্কের কথা বলা হলেও বাস্তবে প্রতি কেজিতে তিন ডলার হারে শুল্কায়ন করা হচ্ছে, যা বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ আহমেদ বলেন, টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ওপর এমন অনেক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যেগুলো তাদের মূল কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে সংস্থাটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে প্রয়োজনীয় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
সিপিডির গবেষণা বলছে, পোশাক কারখানার বিশাল ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যয় কমানো, বিদ্যুৎ সরবরাহের চাপ সামলানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের শর্ত পূরণে এগিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানি বাজারে কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপ বাড়তে থাকায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ভবিষ্যতে পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে উঠতে পারে।