প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশজুড়ে গরম বেড়ে যাওয়ায় লোডশেডিংয়ের তীব্রতা বাড়ছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবনে দুর্ভোগ বাড়ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসাসেবা, চা উৎপাদন ও বিমানবন্দর পরিচালনাতেও এর প্রভাব পড়েছে।
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে এক সপ্তাহ ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষুব্ধ কয়েকশ বাসিন্দা পিডিবির কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর করেছেন। এ সময় এক প্রকৌশলী আহত হন। পটুয়াখালীতে দিনে-রাতে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসা ও চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দিনে ১০ থেকে ১২ বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। মৌলভীবাজারে লোডশেডিংয়ের কারণে চা উৎপাদনেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
পিজিসিবির হিসাবে, বুধবার রাত ৯টায় দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ২ হাজার ২৬৬ মেগাওয়াট। রাতে ও বৃহস্পতিবার সকালে ঘাটতি কিছুটা কমলেও দুপুরের পর আবার বাড়ে। গতকাল বিকেল ৩টায় লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৭৭৪ মেগাওয়াট এবং রাত ৮টায় তা দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৯৮ মেগাওয়াট। তবে বিতরণ কোম্পানিগুলোর সূত্র বলছে, বাস্তবে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ আরও বেশি।
রাজধানীর সেগুনবাগিচার বাসিন্দা নাসরিন সুলতানা জানান, গরমের মধ্যে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। দুপুরে টানা দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। মগবাজারের বাসিন্দারাও বিশেষ করে রাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় গরমে কষ্টের কথা জানিয়েছেন।
পটুয়াখালীতে পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ। জেলা শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাত মিলিয়ে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য, হাসপাতাল, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির হিসাবে, জেলার দুটি গ্রিডে মোট বিদ্যুতের চাহিদা ১০৬ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ৫৭ মেগাওয়াট। পায়রা গ্রিডে ৪৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ২৩ মেগাওয়াট এবং পটুয়াখালী গ্রিডে ৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৩৪ মেগাওয়াট।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশেষ করে সন্ধ্যার সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে বেচাকেনা কমে যায়। বিদ্যুৎ ফিরে আসার কিছুক্ষণ পর আবার চলে যাওয়ায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
হাসপাতালগুলোতেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে অস্ত্রোপচারসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চালু রাখতে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে হাসপাতালের ব্যয় বাড়ছে এবং রোগীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও। বিমানবন্দর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেখানে দিনে ১০ থেকে ১২ বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে।
বিমানবন্দরে পিডিবির দুটি জরুরি সংযোগ থাকলেও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে লোডশেডিং ঠেকানো যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর জেনারেটর চালু হতে ৩০ থেকে ৪০ সেকেন্ড সময় লাগে। ফলে ওই সময় বিমানবন্দরের বিভিন্ন অংশ অন্ধকার হয়ে পড়ে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতিতে আলাদা ব্যাকআপ ব্যবস্থা থাকায় এখন পর্যন্ত বিমান ওঠানামায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়নি।
মৌলভীবাজারে লোডশেডিংয়ের সরাসরি প্রভাব পড়েছে চা উৎপাদনে। জেলার ৯৩টি চা বাগানে বর্তমানে উৎপাদনের ভরা মৌসুম। কিন্তু দিনে প্রায় ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানা চালু রাখতে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে।
বাগানসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে প্রতিটি বাগানে প্রতিদিন ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ক্ষতি হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ট্রাফ হাউসে থাকা কাঁচা চা পাতা সময়মতো প্রক্রিয়াজাত করা যাচ্ছে না। ফলে বিপুল পরিমাণ কাঁচা পাতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কমলগঞ্জের পাত্রখোলা চা বাগানের শ্রমিকেরা জানিয়েছেন, প্রতিদিন ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। কারখানা সচল রাখতে দৈনিক ১০০ থেকে ২০০ লিটার ডিজেল পর্যন্ত প্রয়োজন হচ্ছে।
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে এক সপ্তাহ ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষুব্ধ হয়ে পিডিবির কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
গতকাল সকালে শিমরাইল গ্রামের প্রায় ২৫০ বাসিন্দা স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসের সামনে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে অফিসের কাচ ও বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাঙচুর করা হয়। এ সময় উপসহকারী প্রকৌশলী রেজাউল করিম আহত হন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ১৩ আগস্ট রাতে ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়ার পর থেকে এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। এতে পানির সংকট, খাবার সংরক্ষণে সমস্যা এবং তীব্র গরমে শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ বেড়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে যান্ত্রিক ত্রুটি ও ট্রান্সফরমার সমস্যার কারণে কোনো কোনো এলাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। তবে সামগ্রিক সংকটের বড় কারণ গ্যাসের স্বল্পতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়া।
দেশে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতিও দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম। ফলে গরমের মধ্যে লোডশেডিংয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে। এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, চিকিৎসা, কৃষি ও বিভিন্ন সেবা খাতে ক্ষতির পরিমাণও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।