প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের মোট জাতীয় ঋণ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার কর্মদিবস শেষে মোট জাতীয় ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক ০৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
ঋণের এই নতুন মাইলফল্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যয়, বাজেট ঘাটতি, সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের ব্যয় এবং জাতীয় ঋণের সুদ পরিশোধের খরচ—সবই বাড়ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মুনাফাও সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সরকারি ব্যয় মেটাতে ইউএস ট্রেজারি নিয়মিত নতুন ঋণ গ্রহণ করছে। যুদ্ধ পরিচালনা, কর ছাড় এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির অর্থায়নের পাশাপাশি আগের ঋণের সুদ পরিশোধেও বিপুল অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলক উচ্চ বাজেট ঘাটতির মধ্যে রয়েছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বাজেট ও করবিষয়ক ফেলো জেসিকা রিডলের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির বাজেট ঘাটতি প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির ৩ থেকে ৪ শতাংশের সমপরিমাণ বাজেট ঘাটতিকেই আর্থিক বাজারের জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু বর্তমানে ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশে পৌঁছেছে বলে উল্লেখ করেছেন রিডল। তাঁর মতে, এত বেশি ঘাটতি আর্থিক বাজারে অস্থিরতা ও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়াতে পারে।
জাতীয় ঋণের পাশাপাশি সুদ পরিশোধের ব্যয়ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য বড় চাপ হয়ে উঠেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার দীর্ঘ সময় তুলনামূলক উচ্চ পর্যায়ে থাকায় সরকারের ঋণ পরিষেবার ব্যয় বেড়েছে। নতুন ঋণের পাশাপাশি আগের ঋণ পুনঃঅর্থায়ন করতেও সরকারকে বেশি সুদ দিতে হচ্ছে।
বয়স্ক জনসংখ্যার সংখ্যা বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে বয়স্ক নাগরিকদের জন্য সরকারি ব্যয় বাড়ছে। এসব ব্যয় কমানো রাজনৈতিকভাবে কঠিন হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে বাজেটের ওপর চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে সরকারি রাজস্ব ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে জাতীয় ঋণের পরিমাণ আরও দ্রুত বাড়তে পারে। সরকারের ব্যয় যদি রাজস্ব আয়ের তুলনায় ধারাবাহিকভাবে বেশি থাকে, তাহলে ঘাটতি পূরণে নতুন ঋণ নেওয়া ছাড়া বিকল্প সীমিত হয়ে পড়ে।
জাতীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়ানোর বিষয়টি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ড বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। ফলে মার্কিন সরকারের ঋণ গ্রহণের মাত্রা, সুদের হার এবং রাজস্ব নীতির পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী বন্ড, মুদ্রা ও আর্থিক বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের সুদ পরিশোধের দায়ও বাড়তে থাকে। এতে শিক্ষা, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য বা অন্যান্য সরকারি খাতে নতুন অর্থ বরাদ্দের জন্য বাজেটের পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে ঋণ ব্যবস্থাপনার ব্যয় বাড়লে ভবিষ্যতে করনীতি ও সরকারি ব্যয় কমানোর বিষয়ে রাজনৈতিক চাপও বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণসীমা অতিক্রম করা একক কোনো ঘটনার ফল নয়। বরং দীর্ঘদিনের বাজেট ঘাটতি, সরকারি ব্যয়ের কাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় এবং ঋণের সুদ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ মিলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।.
এই ঋণের গতি কমাতে হলে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি প্রয়োজন হবে। তবে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন মাইলফল্য পেরিয়ে যাওয়াকে শুধু একটি বড় সংখ্যা হিসেবে নয়, দেশটির দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হিসেবেও দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।