প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জননীতি বিশ্লেষক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসে সদিচ্ছা থাকলেও তা বাস্তবায়নে সক্ষমতা ও সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর মূল্যায়নে, সরকারকে তিনি ‘এ’ দিতে চান, কিন্তু বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে সেটি ‘বি’র দিকে টানছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অর্থনীতির শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধানের দায়িত্ব পালন করা দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সম্প্রতি সরকারের প্রথম ছয় মাস, অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা এবং আগামী দিনের করণীয় নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, বর্তমান সরকার একটি কঠিন উত্তরাধিকার, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, আঞ্চলিক জটিলতা ও রোহিঙ্গা সমস্যার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে। তবে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সামগ্রিক উপলব্ধি ও পরিকল্পনায় ঘাটতি রয়েছে।
দেবপ্রিয় বলেন, সরকার উচ্চাশা প্রকাশ করলেও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়নে হোঁচট খেয়েছে। সরকারের কাছে আগের পরিস্থিতির একটি স্পষ্ট বেঞ্চমার্ক বা সূচনাবিন্দু থাকা প্রয়োজন ছিল। উত্তরাধিকারসূত্রে কী ধরনের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সমস্যা পাওয়া গেছে, তার একটি দলিলও তৈরি করা উচিত ছিল বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর মতে, সরকারের কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমলাতন্ত্রের ধীরগতি, তৃণমূল পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা, চাঁদাবাজি ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পুলিশের দুর্বলতা এবং পুলিশ প্রশাসন পুনর্গঠনের সমস্যাও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
দেবপ্রিয়ের মতে, বাজার অর্থনীতি সচল রাখতে শুধু নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়; বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনীতি ও প্রশাসনের প্রভাব
সরকারের ভেতরে দলীয় রাজনীতির প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন দেবপ্রিয়। তাঁর মতে, বিএনপির ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতির বাস্তবায়ন নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক পদধারীদের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান পদে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বার্থের দ্বন্দ্বের ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয় মূলত জ্ঞান ও মেধার প্রতিষ্ঠান। তাই সেখানে মেধা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি মনে করেন, বর্তমান সরকারের সংসদ সদস্যদের একটি বড় অংশ নতুন। তাঁদের অনেকেরই আগে বড় কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই। ফলে তাঁদের কিছুটা সময় দেওয়া প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে প্রশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি।
জনতুষ্টির চেয়ে কর্মসংস্থানে জোর
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান।
প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তাঁদের জন্য চাকরি সৃষ্টি অথবা উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় চাকরি ও কর্মসংস্থানের দাবি তোলা তরুণদের জন্য কার্যকর কর্মসংস্থান নীতি প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর মতে, সামাজিক সুরক্ষা মানুষের সংকটে সাময়িক সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার প্রধান উপায় হলো বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান।
শিক্ষা খাতে সরকারের কিছু উদ্যোগের সঙ্গে তাঁর মতের মিল রয়েছে। শিশুদের দুপুরের খাবার, পোশাক ও জুতা দেওয়ার পাশাপাশি ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরবরাহব্যবস্থা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
বাজেট নিয়ে সতর্কতা
দেবপ্রিয় মনে করেন, সরকারের বর্তমান বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য কি না, তা নিয়ে দ্রুত পর্যালোচনা প্রয়োজন। তাঁর মতে, বাজেট ঘোষণার তিন মাসের মধ্যেই যদি বোঝা যায় যে এটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না, তাহলে সংশোধিত বাজেটের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা ঠিক হবে না।
তিনি একটি ‘কোর বাজেট’ বা মৌলিক বাজেট তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন, যেখানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারগুলো রাখা হবে এবং বাস্তবায়নযোগ্য অংশকে সুরক্ষা দেওয়া হবে।
সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, প্রায় এক দশক ধরে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি। মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে নিম্নস্তরের সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার সংকটও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
জ্বালানি ও ব্যাংক খাতে রোডম্যাপের দাবি
বর্তমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন দেবপ্রিয়। তাঁর মতে, দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সমুদ্র ও স্থলভাগে নতুন গ্যাসের উৎস অনুসন্ধান জরুরি।
বাপেক্সকে আরও সক্রিয় করা, নতুন কূপ খনন এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস আহরণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
ব্যাংক খাতেও একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে আর্থিক খাত সংস্কার, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা এবং মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন।
তাঁর মতে, জ্বালানি আমদানি, ব্যাংক খাতের তারল্য ও বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এসব বিষয়ে সমন্বিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
বৈদেশিক ঋণ নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেবপ্রিয়। তাঁর মতে, ২০২৬ সালকে তিনি আগেই বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের জন্য একটি জটিল সময় হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতি তাঁর আশঙ্কার চেয়েও কঠিন হয়েছে।
তিনি বলেন, আগের সরকারের সময়ের কিছু অপরিশোধিত দায়, বাজেট ঘাটতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজনীয়তার কারণে সরকারকে নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে চাপ তৈরি করতে পারে।
পরবর্তী প্রজন্মের ওপর ঋণের বোঝা কতটা চাপছে, সেটিও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় বিবেচনা করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের জন্য পাঁচ অগ্রাধিকার
আগামী ছয় মাসে সরকারের পাঁচটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
প্রথমত, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সংকটের মধ্যমেয়াদি সমাধান বের করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংক খাত সংস্কারের জন্য একটি স্পষ্ট ও বোধগম্য রোডম্যাপ দিতে হবে।
চতুর্থত, ব্যাংক ও জ্বালানি খাতের বাইরে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। বিশেষ করে বিনিয়ন্ত্রণ ও করব্যবস্থার বিষয়গুলোতে সংস্কার প্রয়োজন। পঞ্চমত, নাগরিক সুবিধা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে দুর্নীতি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সবচেয়ে ভালো ও খারাপ সিদ্ধান্ত
গত ছয় মাসে সরকারের সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হিসেবে পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রধানমন্ত্রী, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার জীবনবৃত্তান্ত সরানোর সিদ্ধান্তকে উল্লেখ করেছেন দেবপ্রিয়। তাঁর মতে, পাঠ্যপুস্তকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জীবনবৃত্তান্ত অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন নেই।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে সরকারের সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হিসেবে তিনি নিজেদের ভুল সংশোধনের সক্ষমতাকে দেখেছেন। অন্যদিকে সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রশাসনে রাজনৈতিক পদায়নের কথা বলেছেন তিনি।
দেবপ্রিয়ের ভাষায়, প্রশাসনিক পদায়নে রাজনৈতিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া সরকারের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
‘এ’ দিতে চান, কিন্তু টানছে ‘বি’র দিকে
সরকারের ছয় মাসের সার্বিক মূল্যায়নে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের বক্তব্য হলো—আরও সদিচ্ছা, আরও সক্ষমতা এবং আরও সমন্বয় প্রয়োজন। তাঁর মতে, সরকারকে তিনি ‘এ’ দিতে চান; কিন্তু বাস্তবায়নের দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতা সেটিকে ‘বি’র দিকে টেনে নিচ্ছে।
আগামী কয়েক মাসকে তিনি সরকারের জন্য নিজেদের পুনর্মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখছেন। শুধু মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং নীতিনির্ধারণের পদ্ধতিও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর মতে, সরকারের উচিত জনগণের কাছে বাস্তব পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা, অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের জন্য সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান কমাতে পারলেই সরকারের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।