প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের কণাকে সাধারণভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। খাবার, পানি, বাতাস এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন পণ্যের মাধ্যমে এসব কণা মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস, যকৃত, প্লাসেন্টা এবং রক্তনালির প্লাকে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে শরীরে প্রবেশ করা প্রতিটি কণার কারণে নির্দিষ্ট রোগ হয়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো মানবদেহভিত্তিক প্রমাণ এখনো সীমিত।
মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে উদ্বেগের বড় কারণ হলো, এগুলো শুধু পরিবেশে নয়, মানুষের শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতেও শনাক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক উপাদান—যেমন বিসফেনল-এ (BPA) ও কিছু ফথ্যালেট—হরমোন ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও সংশ্লিষ্ট রাসায়নিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা ক্রমেই বাড়ছে।
কীভাবে শরীরে ঢোকে মাইক্রোপ্লাস্টিক
মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের প্রধান পথ তিনটি—খাদ্য ও পানি, শ্বাসপ্রশ্বাস এবং কিছু ক্ষেত্রে ত্বকের সংস্পর্শ।
খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে: বোতলজাত পানি, সামুদ্রিক মাছ, লবণ, বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং প্লাস্টিকের সংস্পর্শে থাকা খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার সংরক্ষণ বা গরম করার সময়ও প্লাস্টিকজাত কণা ও রাসায়নিক খাবারে স্থানান্তরিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিশেষ করে উচ্চ তাপমাত্রায় প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। মাইক্রোওয়েভে খাবার গরম করার সময় প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার না করে কাচ বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করা তুলনামূলক নিরাপদ অভ্যাস।
শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে: ঘরের ধুলা, সিন্থেটিক কাপড়, কার্পেট ও বিভিন্ন প্লাস্টিকজাত উপকরণ ক্ষয় হয়ে ক্ষুদ্র কণা বাতাসে ছড়াতে পারে। এসব কণা শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে। শিল্পকারখানায় প্লাস্টিক বা সিন্থেটিক তন্তুর সংস্পর্শে থাকা কর্মীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
ত্বকের মাধ্যমে: মাইক্রোপ্লাস্টিকের ত্বক দিয়ে শরীরে প্রবেশের বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চলছে। ত্বক অক্ষত থাকলে বড় মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা সহজে শরীরের ভেতরে ঢুকে যায়—এমন শক্ত প্রমাণ নেই। তাই খাদ্য ও শ্বাসপ্রশ্বাসের পথকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
রক্তে পৌঁছানোর পর কী ঘটে
পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করা অতি ক্ষুদ্র কণার একটি অংশ অন্ত্রের প্রাচীর অতিক্রম করে শরীরের অন্যান্য অংশে পৌঁছাতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এরপর রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে এসব কণা বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করলে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে পরিবর্তনের মতো প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে বলে পরীক্ষাগার ও প্রাণীভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা, তা এখনো পুরোপুরি নির্ধারিত হয়নি।
পরিপাকতন্ত্রে সম্ভাব্য প্রভাব
অন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি অন্ত্রের জীবাণুসমষ্টি বা গাট মাইক্রোবায়োমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন প্রমাণ পরীক্ষামূলক গবেষণায় পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ ও অন্ত্রের স্বাভাবিক পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে এসব কণার সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা চলছে।
তবে মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি মানুষের হজমশক্তি নষ্ট করে বা ভালো ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো দেওয়া যায় না।
শ্বাসতন্ত্রে ঝুঁকি
বাতাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করা প্লাস্টিকের কণা শ্বাসনালিতে প্রদাহ বা জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘদিন উচ্চ মাত্রায় প্লাস্টিক বা সিন্থেটিক তন্তুর সংস্পর্শে থাকা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ফুসফুসের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ রয়েছে।
কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুক ভার লাগা বা হুইজিংয়ের মতো উপসর্গ থাকলে শুধু মাইক্রোপ্লাস্টিককে কারণ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। এসব উপসর্গের পেছনে অ্যাজমা, সিওপিডি, সংক্রমণসহ নানা কারণ থাকতে পারে।
হরমোন ও প্রজননস্বাস্থ্য
প্লাস্টিক উৎপাদনে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক, বিশেষ করে BPA ও নির্দিষ্ট ফথ্যালেট, এন্ডোক্রাইন-ডিসরাপ্টিং কেমিক্যাল হিসেবে পরিচিত। এগুলো শরীরের হরমোন ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক ও এসব রাসায়নিকের প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও গবেষণা হচ্ছে। পুরুষের শুক্রাণুর গুণগত মান এবং নারীর প্রজননস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্কের কিছু প্রমাণ পাওয়া গেলেও মানুষের ক্ষেত্রে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক এখনো নিশ্চিত নয়।
হৃদ্যন্ত্র ও স্ট্রোকের ঝুঁকি নিয়ে কী জানা গেছে
২০২৪ সালে The New England Journal of Medicine-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ক্যারোটিড ধমনির প্লাকে মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিক পাওয়া রোগীদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা মৃত্যুর ঘটনা বেশি দেখা যায়। গবেষণায় এই ঝুঁকি প্রায় সাড়ে চার গুণ বেশি ছিল।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা। অর্থাৎ মাইক্রোপ্লাস্টিকই ওই রোগগুলোর সরাসরি কারণ—এমন প্রমাণ গবেষণাটি দেয়নি। তাই ‘রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকলেই হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি সাড়ে চার গুণ’—এভাবে বিষয়টি সরলীকরণ করা ঠিক হবে না।
ক্যানসারের ঝুঁকি কতটা?
মাইক্রোপ্লাস্টিক কোষে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, প্রদাহ এবং অন্যান্য জৈবিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে—এমন প্রমাণ পরীক্ষাগারে পাওয়া গেছে। এসব পরিবর্তন তাত্ত্বিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টি করে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো নেই। তাই ক্যানসারের ঝুঁকি ‘বহুগুণ বেড়ে যায়’ বলে নিশ্চিতভাবে দাবি করার বদলে, বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন বলে বিবেচনা করাই বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিসংগত।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমাবেন যেভাবে
পরিবেশ থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলা বর্তমানে বাস্তবসম্মত নয়। তবে দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করে অপ্রয়োজনীয় সংস্পর্শ কমানো সম্ভব।
প্রথমত, সম্ভব হলে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতলের পরিবর্তে স্টেইনলেস স্টিল বা কাচের বোতল ব্যবহার করা যেতে পারে। খাবার সংরক্ষণের জন্য কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র বেছে নেওয়া ভালো।
দ্বিতীয়ত, প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার রাখা বা গরম করা এড়িয়ে চলুন। বিশেষ করে মাইক্রোওয়েভে খাবার গরম করার সময় কাচ বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করা উচিত।
তৃতীয়ত, ঘরের ধুলা নিয়মিত পরিষ্কার করুন। ভেজা কাপড় দিয়ে মেঝে ও আসবাব মুছে নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভ্যাকিউম ক্লিনার ব্যবহার করলে বাতাসে ভাসমান ধুলা ও কণার পরিমাণ কমানো যেতে পারে।
চতুর্থত, সিন্থেটিক টেক্সটাইলের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা প্রয়োজন না হলেও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো যেতে পারে। কাপড় ধোয়ার সময় বের হওয়া সিন্থেটিক তন্তু পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের একটি উৎস।
পঞ্চমত, অতিরিক্ত প্লাস্টিক মোড়কজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে তাজা ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার বেছে নেওয়া ভালো। পানির ক্ষেত্রে নিরাপদ ও মানসম্মত উৎস ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে, মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে বাস্তবসম্মত সতর্কতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা এখনো এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকি কমাতে নয়, পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।