প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাবে বাংলাদেশের পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির ব্যয় এক বছরে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৪ কোটি মার্কিন ডলার। এর আগের অর্থবছর, ২০২৪-২৫-এ এ খাতে ব্যয় ছিল ৫১৪ কোটি ডলারের কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫৫০ কোটি ডলার, যা ১০৭ শতাংশের বেশি। একই সময়ে দেশের সামগ্রিক আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৬৮৯ কোটি ডলার বা ১০ দশমিক ০৭ শতাংশ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫২৪ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৮৩৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ মোট আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে পেট্রোলিয়াম পণ্য।
পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে গত অর্থবছর ব্যয় হয়েছে ৯৪৪ কোটি ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ছিল ৪৫১ কোটি ডলার। ফলে এক বছরে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির খরচ বেড়েছে ১০৯ শতাংশের বেশি।
অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতেও উল্লেখযোগ্য ব্যয় বেড়েছে। গত অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ১২০ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৬২ কোটি ডলারের তুলনায় প্রায় ৯২ শতাংশ বেশি।
জ্বালানি তেল আমদানিতে গত অর্থবছরের ব্যয় এখন পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে করোনা মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতে সর্বোচ্চ ৭৯৯ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল। পরের অর্থবছরে ব্যয় কমে ৫৭৭ কোটি ডলারে নেমে আসে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আবার বেড়ে ৬১৩ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্বাভাবিক ওঠানামা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের ওপরও। চাহিদা বেশি থাকায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি আরও চাপ তৈরি করছে।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেখা গেছে গত জুনে। ওই এক মাসে বাংলাদেশকে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় করতে হয়েছে ১৬০ কোটি ৩৩ লাখ ডলার। অথচ পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাসিক গড় ব্যয় ছিল প্রায় ৮৮ কোটি ৬২ লাখ ডলার।
বর্ধিত আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। শিল্পকারখানায় জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। কোথাও কোথাও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পণ্যের দাম এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে সব ধরনের পণ্যের আমদানি ব্যয় বাড়েনি। নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে ব্যয় কমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তেল, চিনি, ডাল, মসলা এবং দুধ ও ক্রিমসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৫০৩ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল ৫৬৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ এসব পণ্যের আমদানি ব্যয় কমেছে প্রায় ৩৫ কোটি ডলার বা ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ।
চাল আমদানিতেও ব্যয় কমেছে। গত অর্থবছরে চাল আমদানিতে ব্যয় কমে সাড়ে ২২ শতাংশের মতো দাঁড়িয়েছে ৫৩ কোটি ডলারের নিচে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ৬৮ কোটি ডলারের বেশি।
অন্যদিকে গম আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গম আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২০৫ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের ১৬২ কোটি ডলারের তুলনায় ২৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে ডলারের বিনিময় হার ১২২ থেকে ১২৪ টাকার মধ্যে রয়েছে। উচ্চ রেমিট্যান্সের কারণে বর্তমানে ডলারের সরবরাহ নিয়েও বড় ধরনের সংকট নেই। ফলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে বৈশ্বিক বাজারের পরিস্থিতিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে। গত সোমবার দেশের গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম৬ হিসাব অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।
তবে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় উঁচু থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা আরও বাড়বে।
এদিকে শিল্প ও বিনিয়োগ খাতের আমদানিতেও মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। গত অর্থবছরে তৈরি পোশাক-সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি প্রায় ৪ শতাংশ কমে ১ হাজার ৭৭০ কোটি ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে অন্যান্য মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি প্রায় ৯ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৯৩৫ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
মূলধনি পণ্যের আমদানিও বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ ধরনের পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ২৩ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশের বেশি। অন্যান্য পণ্য আমদানির ব্যয়ও ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে ৯৭১ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ব্যাংকারদের মতে, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদহার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কারণে দেশে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিনিয়োগ হচ্ছে না। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতেও। বর্তমানে এ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে, যা এখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন।
বেসরকারি বিনিয়োগের চাহিদা কম থাকায় ডলারের ওপর চাপও তুলনামূলক কম রয়েছে। একই সঙ্গে অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ এবং রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে।
তবে এই স্বস্তি দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে রেমিট্যান্সের পাশাপাশি রপ্তানি আয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার জরুরি।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে হলে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে আমদানি ব্যয়, শিল্প উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজার—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে।