প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জামালপুরের মাদারগঞ্জে চাচা-ভাতিজা হত্যা মামলায় দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং আরও সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড এবং যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ নেজাম উদ্দীন এ রায় ঘোষণা করেন।
রায় ঘোষণার পর মামলার বাদীপক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে স্বজন হারানোর বেদনা এবং বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা পরিবারের কাছে আদালতের এই রায় নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রায় এক দশক আগে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আদালতের রায়ে মোট ১৪ আসামির সাজা হওয়ায় মামলাটির বিচারিক পরিণতি নিয়ে এলাকায়ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন সাখাওয়াত, সোহেল, আল আমিন, সাদ্দাম, উজ্জল, অন্তর ও ফয়জুর। অন্যদিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন চাঁন মিয়া, মো. জিয়ার, শাহ আলম, কাওসার, রিফাত, সুমন ও মোস্তফা। আদালতের রায়ে তাদের প্রত্যেককে অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।
মামলার নথি ও রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে মাদারগঞ্জ উপজেলার আদারভিটা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী আলতাফুর রহমান আতা এবং বিদ্রোহী প্রার্থী ইছাহাকের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনার পর এক মামলায় ইছাহাকের সমর্থক এবং আদারভিটা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মোস্তফাকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশ অভিযান চালায়।
২০১৬ সালের ১০ এপ্রিল পুলিশ গজারিয়া গ্রামে মোস্তফাকে গ্রেপ্তার করতে গেলে তার বাড়ির অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে স্থানীয় বাসিন্দা মহর আলী ও তার ভাতিজা স্বপন মিয়ার কাছে জানতে চায়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ মোস্তফার বাড়ি শনাক্ত করে তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে মোস্তফা জামিনে মুক্ত হয়ে ওই ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করেন বলে মামলার তদন্ত ও রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যে উঠে আসে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিশোধের অংশ হিসেবে মহর আলী ও স্বপন মিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৬ সালের ১৬ মে রাতে গান-বাজনার কথা বলে তাদের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায় মোস্তফার সমর্থক সাখাওয়াত ও সোহেল। পরে সাদ্দামের কথিত প্রেমিকাকে তুলে আনার কথা বলে তাদের জোড়খালী ইউনিয়নের কুকুরমারী এলাকার একটি পাটখেতে নেওয়া হয়।
সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করা হামলাকারীরা মহর আলী ও তার ভাতিজা স্বপন মিয়ার ওপর হামলা চালায়। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদের কুপিয়ে গুরুতর জখম করার পর হত্যা করা হয়। পরে তাদের মরদেহ পাটখেতে ফেলে রাখা হয়। ঘটনার তিন দিন পর সেখান থেকে দুজনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহত মহর আলী ছিলেন গজারিয়া এলাকার আব্দুস সালাম দফদারের ছেলে। তিনি মির্জা আজম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। অন্যদিকে তার ভাতিজা স্বপন মিয়া একই এলাকার জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে এবং সানাইবান্দা ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। সম্পর্কে তারা আপন চাচা-ভাতিজা। একই পরিবারের দুই সদস্যকে এভাবে হারানোর ঘটনা স্বজনদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে গভীর শোকের ছাপ রেখে যায়।
হত্যাকাণ্ডের পর নিহত স্বপন মিয়ার বাবা জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে মাদারগঞ্জ মডেল থানায় মামলা করেন। মামলায় মোট ২২ জনকে আসামি করা হয়। তদন্ত শেষে পুলিশ ১৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরবর্তী সময়ে আদালতে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয় এবং রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার এগিয়ে যায়।
মামলাটিতে মোট ১৮ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। সাক্ষ্য, নথিপত্র ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য পর্যালোচনা শেষে আদালত বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাতজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তদের প্রত্যেকের ওপর আরোপ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী দিদারুল ইসলাম দিদার বলেন, ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধ থেকেই হত্যাকাণ্ডের পটভূমি তৈরি হয়। পুলিশকে একজন আসামির বাড়ি দেখিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মহর আলী ও স্বপন মিয়ার ওপর প্রতিশোধ নেওয়া হয় বলে মামলার বিচারিক কার্যক্রমে উঠে এসেছে। রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই আদালত এই সাজা দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
মামলার ঘটনাটি শুধু দুটি প্রাণহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল দুটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা এবং একটি স্থানীয় বিরোধের ভয়াবহ পরিণতি। তরুণ বয়সে শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে থাকা স্বপন মিয়া এবং তার চাচা মহর আলীর মৃত্যু পরিবার দুটিকে গভীর সংকটে ফেলে। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর আদালতের রায় সেই অপেক্ষার একটি আইনি পরিণতি তৈরি করেছে।
তবে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পরই তা চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয় না। উচ্চ আদালতে আপিলসহ আইনগত প্রতিকারের সুযোগ থাকে। ফলে বৃহস্পতিবারের রায় মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ হলেও পরবর্তী আইনি কার্যক্রমের সুযোগও রয়েছে।
জামালপুরের এই মামলার রায় স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বিরোধ, প্রতিশোধ এবং ব্যক্তিগত বিরোধ কীভাবে ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিতে পারে, সেই বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। একটি গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত দুই স্বজনের হত্যাকাণ্ডে গড়ায়। প্রায় ১০ বছর পর আদালতের রায়ে ১৪ আসামির সাজা হওয়ায় মামলাটি আবারও আলোচনায় এসেছে।
আইনজীবীদের মতে, কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার শুধু অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয় নয়; এর সঙ্গে নিহতদের পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা এবং সমাজে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থার বিষয়টিও জড়িত। জামালপুরের এই মামলায় আদালতের রায় সেই দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিরোধ যেন প্রাণঘাতী সংঘাতে রূপ না নেয়, সে জন্য স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক সহনশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে সামনে এসেছে।