প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
অস্ট্রেলিয়ায় স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করেছে সরকার। স্থানীয় সংবাদ প্রকাশকদের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি না করলে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে কর দেওয়ার বিধান রেখে দেশটির পার্লামেন্টে ‘নিউজ বার্গেইনিং ইনসেনটিভ’ নামে নতুন আইন পাস হয়েছে। এর ফলে সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়া প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছ থেকে স্থানীয় সাংবাদিকতা ও সংবাদ উৎপাদনে অর্থ ফেরত দেওয়ার পথ আরও শক্তিশালী হলো।
বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টে আইনটি পাস হওয়ার পর দেশটির সংবাদমাধ্যমের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজারে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আধিপত্য এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আলোচনায় রয়েছে। নতুন আইন সেই পরিবর্তিত বাস্তবতায় প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম ও সংবাদ প্রকাশকদের মধ্যকার আর্থিক সম্পর্ককে নতুন কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় সংবাদ ও সার্চ সেবা পরিচালনাকারী বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে নির্দিষ্ট ধরনের বাণিজ্যিক চুক্তিতে না গেলে তাদের বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করা হবে। অর্থাৎ সংবাদ কনটেন্টকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারী আকৃষ্ট করা এবং সেই ব্যবহারকারীদের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন থেকে আয় করা প্ল্যাটফর্মগুলোকে স্থানীয় সংবাদ উৎপাদনের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করতেও ভূমিকা রাখতে হবে।
আইনের আওতায় মেটা, গুগল, টিকটক এবং মাইক্রোসফটের লিংকডইনের মতো বড় প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম পড়তে পারে। তবে প্রতিটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একইভাবে আইন কার্যকর হবে না। অস্ট্রেলিয়ায় যেসব প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন থেকে বছরে ২৫ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি আয় হয় এবং যাদের উল্লেখযোগ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সার্চ সেবা রয়েছে, তাদের জন্য এই ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে।
তবে আইনটির মূল উদ্দেশ্য সরাসরি কর আদায় করা নয়; বরং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনে উৎসাহিত করা। কোনো প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে স্থানীয় সংবাদ প্রকাশকদের সঙ্গে চুক্তি করলে তাকে ওই শুল্ক দিতে হবে না। ফলে সরকারের পরিকল্পনায় করের পরিবর্তে সংবাদমাধ্যমে সরাসরি অর্থ প্রবাহ নিশ্চিত করাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন আইনের অধীনে কর এড়ানোর জন্য একটি প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মকে অন্তত আটটি পৃথক স্থানীয় সংবাদ প্রকাশকের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি করতে হবে। এসব চুক্তিতে সংবাদ সংগ্রহ, সাংবাদিকতা, সংবাদ তৈরি অথবা অনলাইনে সংবাদ কনটেন্ট প্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। এর মাধ্যমে কেবল নামমাত্র কোনো চুক্তি করে আইন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
চুক্তির অর্থ কীভাবে হিসাব করা হবে, সেটিও আইনে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। বড় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে করা চুক্তির ব্যয় সংশ্লিষ্ট শুল্কের দায়ের সর্বোচ্চ ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত সমন্বয় করা যাবে। ছোট ও মাঝারি আকারের সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে করা চুক্তির ক্ষেত্রে এই সমন্বয়ের সীমা ২০০ শতাংশ পর্যন্ত রাখা হয়েছে। তবে কোনো একটি চুক্তির মাধ্যমে মোট শুল্কদায়ের ২৫ শতাংশের বেশি সমন্বয় করার সুযোগ থাকবে না।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের দৃষ্টিতে এই ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে ডিজিটাল সংবাদ ব্যবস্থার একটি মৌলিক পরিবর্তন। এখন বিপুলসংখ্যক মানুষ সংবাদ জানতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করেন। এসব প্ল্যাটফর্মে সংবাদ কনটেন্ট ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করে এবং ব্যবহারকারীদের উপস্থিতি বিজ্ঞাপন আয়ের সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু সংবাদ তৈরির মূল দায়িত্ব পালনকারী স্থানীয় সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় সেই আয়ের তুলনামূলকভাবে সামান্য অংশ পায়।
সরকার মনে করছে, এই ব্যবস্থায় স্থানীয় সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখতে প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছ থেকে অর্থনৈতিক অবদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ের সংবাদ সংগ্রহ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশের জন্য সংবাদমাধ্যমের যে ব্যয় হয়, তা বহন করার সক্ষমতা ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দুর্বল হয়ে পড়লে শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়, স্থানীয় সমাজের তথ্যপ্রবাহও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ডিজিটাল যুগে সংবাদমাধ্যমের ব্যবসায়িক মডেল দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় সংবাদপত্র ও সম্প্রচারমাধ্যমের বিজ্ঞাপন ছিল আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে বিজ্ঞাপনের বড় একটি অংশ চলে গেছে প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্মের দিকে। ফলে অনেক স্থানীয় সংবাদ প্রতিষ্ঠানকে সীমিত জনবল ও আর্থিক সম্পদ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার নতুন আইন সেই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বার্তা দিচ্ছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সংবাদ কনটেন্ট থেকে যে বাণিজ্যিক সুবিধা পায়, তার একটি অংশ সংবাদ উৎপাদন ব্যবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো নতুন অর্থের উৎস পেতে পারে এবং সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখার সক্ষমতা বাড়তে পারে।
এর আগে অস্ট্রেলিয়া স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আর্থিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় পদক্ষেপ নিয়েছিল। এবার নতুন আইন করে সেই কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা হলো। এতে সরকার একদিকে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে স্থানীয় সংবাদ প্রকাশকদের সঙ্গে চুক্তিতে যেতে উৎসাহিত করছে, অন্যদিকে চুক্তি না হলে আর্থিক দায় তৈরির ব্যবস্থা রেখেছে।
তবে এই ধরনের আইন প্রযুক্তি কোম্পানি ও সরকারের মধ্যে ভবিষ্যতে আরও আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। কারণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো সাধারণত সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব ব্যবসায়িক কাঠামো, কনটেন্ট নীতি এবং ব্যবহারকারীর আচরণের ওপর নির্ভর করে। সরকার যেখানে সংবাদমাধ্যমের টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করতে চাইছে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে তাদের বাণিজ্যিক স্বাধীনতা ও প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার বিষয়কে গুরুত্ব দিতে পারে।
তারপরও অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোগটি বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের টিকে থাকা, সাংবাদিকদের কর্মসংস্থান এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের সক্ষমতা ধরে রাখতে প্রযুক্তি খাতকে কতটা আর্থিক দায়িত্ব নিতে হবে, সেই প্রশ্ন এখন আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।
নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর এর বাস্তব প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কতগুলো স্থানীয় সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে, এসব চুক্তির আর্থিক মূল্য কত হয় এবং এর ফলে স্থানীয় সাংবাদিকতা কতটা শক্তিশালী হয়—এসব বিষয়ই শেষ পর্যন্ত আইনটির সাফল্য নির্ধারণ করবে।
অস্ট্রেলিয়ার এই উদ্যোগের দিকে বিশ্বের অন্যান্য দেশও নজর রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ সংবাদমাধ্যমের আয় কমে যাওয়া এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন বাজারে আধিপত্য এখন শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়। অনলাইন সংবাদ ব্যবস্থার দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদ উৎপাদনের খরচ এবং সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া আয় কোথায় যাচ্ছে—এই প্রশ্ন আন্তর্জাতিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফলে অস্ট্রেলিয়ার নতুন আইন শুধু প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর কর আরোপের বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত ডিজিটাল অর্থনীতিতে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব এবং জনস্বার্থের সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখার জন্য অর্থনৈতিক কাঠামো কেমন হওয়া উচিত—সে বিষয়ে একটি বড় নীতিগত পরীক্ষাও। আগামী দিনে এই ব্যবস্থার বাস্তব ফলাফল নির্ধারণ করবে, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে টেকসই রাখতে অস্ট্রেলিয়ার এই মডেল কতটা কার্যকর হয়।