নিউমার্কেটের হোটেলে আগুন, সামনে এলো নিরাপত্তার অনিয়ম

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার আবাসিক হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ও সামগ্রিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নয়জনের মৃত্যুর পর ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকার হোটেলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থার নানা দুর্বলতা সামনে এসেছে।

মঙ্গলবার গভীর রাতে ১৫জি, মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে আগুন লাগে। রাত তখন প্রায় আড়াইটা। অধিকাংশ অতিথি ঘুমিয়ে থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে ঘন কালো ধোঁয়ায় হোটেলের বিভিন্ন কক্ষে আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেক অতিথি ভেতরে আটকা পড়ে শ্বাসকষ্টে অসুস্থ হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত নয়জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশের নাগরিক এবং দুজন ভারতের।

প্রাথমিক তদন্তে হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় একাধিক গুরুতর অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, হোটেলটির ফায়ার লাইসেন্স ছিল না এবং দীর্ঘদিন অগ্নিনিরাপত্তা অডিটও হয়নি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে জরুরি সময়ে বের হওয়ার একটি পথ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি জরুরি বহির্গমনের পথটি দেওয়াল তুলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বলেও জানা গেছে।

আগুনের সূত্রপাতের কারণ হিসেবে প্রাথমিকভাবে এসির শর্টসার্কিটের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুনের সঠিক কারণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

কলকাতার নিউমার্কেট এলাকা বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে দীর্ঘদিনের পরিচিত গন্তব্য। চিকিৎসা, কেনাকাটা ও বিভিন্ন কাজে কলকাতায় যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের অনেকে এই এলাকার আবাসিক হোটেল ও গেস্টহাউসে থাকেন।

কলিন স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট ও মার্কুইস স্ট্রিটসহ আশপাশের এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ হোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো পুরোনো ও ঘনবসতিপূর্ণ ভবনে পরিচালিত হয়। কোথাও সরু করিডর, কোথাও অপর্যাপ্ত সিঁড়ি, আবার কোথাও জরুরি বহির্গমনের ব্যবস্থা নেই। অনেক ভবনে বৈদ্যুতিক তারও অপরিকল্পিতভাবে ঝুলতে দেখা যায়। পুরোনো লিফট ও সংকীর্ণ চলাচলের পথও এই এলাকার অনেক হোটেলের সাধারণ চিত্র।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হোটেলের সৌন্দর্যায়ন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতিতে অতিথিদের দ্রুত বের করে আনার ব্যবস্থা ততটা গুরুত্ব পায় না। ফলে অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা ঘটলে প্রাণহানির ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

অগ্নিকাণ্ডের সময় ‘শিখা ইন’ হোটেলের পঞ্চম তলায় ছিলেন গাজীপুরের বাসিন্দা মো. আসাদুজ্জামান। কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে বেরিয়ে আসেন তিনি।

আসাদুজ্জামান জানান, আগুন লাগার পর পরনের গেঞ্জি দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে কোনোরকমে হোটেল থেকে বেরিয়ে আসেন। তাঁর ভাষায়, আর এক মিনিট দেরি হলেই হয়তো তিনিও প্রাণ হারাতেন।

তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট, আগুনের পাশাপাশি ধোঁয়াও হোটেলের অতিথিদের জন্য বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় অনেকেই দ্রুত বের হওয়ার সুযোগ পাননি।

হোটেলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কলকাতার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও।

বিজেপির কনভেনার নবীন মিশ্র অভিযোগ করেন, আগের বামফ্রন্ট ও তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সময়ে অনেক আবাসিক ভবনকে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, অবৈধ হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত শুরুর দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিমও নিউমার্কেট এলাকার হোটেলগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসা ও অন্যান্য কাজে কলকাতায় যান। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

সেলিমের মতে, কোনো দুর্ঘটনার পর শুধু দোষারোপ না করে ঘটনার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করতে হবে। ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, পুরসভা, দমকল বা পুলিশের কোনো পর্যায়ে দুর্নীতি থাকলে অর্থের বিনিময়ে বেআইনি স্থাপনা বা ব্যবসা চালানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে কি না। বিষয়টি খতিয়ে দেখে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

অন্যদিকে নিউমার্কেট এলাকার একটি হোটেলের ম্যানেজার দাবি করেছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ও সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং ভবিষ্যতেও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।

অগ্নিকাণ্ডে নিহত নয়জনের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকদের মরদেহ দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের নির্ধারিত আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে কলকাতা পুলিশ ও দমকল বিভাগ। হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, লাইসেন্স, ভবনের কাঠামো, জরুরি বহির্গমন এবং আগুনের সূত্রপাত—সব বিষয়ই তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে।

‘শিখা ইন’-এর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড শুধু নয়জনের প্রাণহানির ঘটনা নয়; এটি নিউমার্কেট এলাকার আবাসিক হোটেলগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পুরোনো ভবনে পরিচালিত এসব হোটেলে অগ্নিনিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, এখন সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত