যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপেক্ষা করছে আরেক পরাজয়: আরাগচি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপেক্ষা করছে আরেক পরাজয়: আরাগচি

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত নতুন অর্থনৈতিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে না। বরং এ ধরনের পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের জন্য আরও একটি পরাজয় ডেকে আনতে পারে এবং ইরানের জনগণের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব আরও গভীর করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি ট্রাম্পের ঘোষিত অর্থনৈতিক চাপের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি মার্কিন উদ্যোগকে তথাকথিত ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে মানুষের দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং সেই ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে।

আরাগচির বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, তেহরান ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন অর্থনৈতিক চাপকে শুধু ইরানের বিরুদ্ধে একটি নিষেধাজ্ঞামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে না। বরং এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বিভিন্ন দেশের ওপর নিজের প্রভাব আরও বিস্তৃত করতে চাইছে বলেও অভিযোগ করছে ইরান।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ব্যর্থ নীতির ওপর জোর দেওয়া হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও পরাজয় বয়ে আনবে। একই সঙ্গে এমন পদক্ষেপ ইরানিদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিরূপ মনোভাব আরও বাড়িয়ে তুলবে। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে ইরানকে দুর্বল করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে।

আরাগচি আরও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কথিত ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ শুধু ইরানের অর্থনীতিকে লক্ষ্যবস্তু করছে না; এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং বিভিন্ন দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও পড়ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখার কারণে তৃতীয় কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ প্রয়োগ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আরাগচির এই বক্তব্য এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক অভিযান ঘোষণার এক দিন পর। ট্রাম্প বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান। তিনি ইরানকে নজিরবিহীন মাত্রার অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়ার হুঁশিয়ারি দেন।

ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানকে দেওয়া চুক্তির সুযোগ তেহরান কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর ঘোষণায় ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ককে লক্ষ্য করার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, তেহরানকে সহায়তা দেওয়া আর্থিক ও বাণিজ্যিক চ্যানেলগুলো বন্ধ করার জন্য ওয়াশিংটন উদ্যোগ নেবে। একই সঙ্গে কোনো দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থা যদি ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকেও ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। ফলে নতুন এই উদ্যোগ শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক সংঘাত অবশ্য নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে আছে নিষেধাজ্ঞা, পাল্টা নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক চাপ। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর একাধিক দফায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

ইরানের দৃষ্টিতে এসব নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করলেও ইরানকে তার পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি। বরং তেহরান বারবার দাবি করে আসছে, কঠোর অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও তারা নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো সচল রাখার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, অর্থনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ইরানের ওপর এমন পরিস্থিতি তৈরি করবে, যাতে দেশটি আলোচনার টেবিলে আরও বাস্তবসম্মত অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের কাছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের বিরুদ্ধে চাপ তৈরির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

তবে তেহরানের সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যাচ্ছে, নতুন চাপের মুখেও ইরান দ্রুত নতি স্বীকার করার কোনো বার্তা দিতে চাইছে না। বরং আরাগচির বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনার পাশাপাশি ইরানের জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনার কথাই তুলে ধরা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, এমন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব শুধু সরকারি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যাংকিং লেনদেন, আমদানি-রপ্তানি, জ্বালানি সরবরাহ, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক যোগাযোগের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা অন্যান্য দেশ ও প্রতিষ্ঠানও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ঘোষণায় তৃতীয় দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সম্ভাব্য ব্যবস্থার আওতায় আনার যে সতর্কতা রয়েছে, তা আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে অনেক প্রতিষ্ঠানকে এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এবং নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য করতে হতে পারে।

এর ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের স্থিতিশীলতার ওপর কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়লে তার প্রতিক্রিয়া বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এদিকে কূটনৈতিক দিক থেকেও পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি ইরানও পাল্টা পদক্ষেপ নেয়, তাহলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র হতে পারে। বিপরীতে অর্থনৈতিক চাপ যদি আলোচনার নতুন পথ তৈরি করে, তাহলে দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

আরাগচির বক্তব্যে অবশ্য আপাতত কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন দেখা গেছে। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক অভিযান ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা অনুযায়ী ইরানকে দুর্বল করার পরিবর্তে উল্টো ইরানের জনগণের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত অর্থনৈতিক অভিযান বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র যদি মিত্র দেশগুলোর সহযোগিতা নিয়ে ইরানকে আরও ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে, তাহলে এর প্রভাব দুই দেশের সম্পর্কের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতেও পড়তে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। একদিকে ওয়াশিংটন চাপ বাড়িয়ে তেহরানকে নীতিগতভাবে পরিবর্তনে বাধ্য করতে চাইছে, অন্যদিকে ইরান সেই চাপকে প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার বার্তা দিচ্ছে। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান শেষ পর্যন্ত সংঘাত বাড়াবে, নাকি নতুন কোনো কূটনৈতিক সমঝোতার পথ তৈরি করবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের অন্যতম বড় প্রশ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত