ডিম্বাশয়ের সিস্ট: অবহেলায় বাড়তে পারে জটিলতা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪২ বার
ডিম্বাশয়ের সিস্ট: অবহেলায় বাড়তে পারে জটিলতা

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যাগুলোর মধ্যে ডিম্বাশয়ের সিস্ট একটি পরিচিত বিষয়। আলট্রাসনোগ্রাম করতে গিয়ে অনেক নারী প্রথমবার জানতে পারেন যে তাঁদের ডিম্বাশয়ে সিস্ট রয়েছে। এই তথ্য শুনেই অনেকের মধ্যে ক্যানসার বা বন্ধ্যত্ব নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ডিম্বাশয়ে সিস্ট পাওয়া গেলেই সেটিকে গুরুতর রোগ বা ক্যানসার হিসেবে ধরে নেওয়ার কারণ নেই। বরং সিস্টের ধরন, আকার, গঠন, উপসর্গ এবং সময়ের সঙ্গে এর পরিবর্তন কেমন হচ্ছে—এসব বিষয় বিবেচনা করেই ঝুঁকি নির্ধারণ করা হয়।

ডিম্বাশয়ের সিস্ট মূলত তরল, রক্ত বা অন্য ধরনের উপাদানে তৈরি থলির মতো একটি গঠন। প্রজননক্ষম বয়সে মাসিক চক্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেও কিছু সিস্ট তৈরি হতে পারে। এ ধরনের অনেক সিস্ট সাময়িক এবং চিকিৎসা ছাড়াই কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যে ছোট হয়ে যায়। তবে সব সিস্ট একই ধরনের নয়। কিছু সিস্ট দীর্ঘদিন থাকতে পারে, আকারে বড় হতে পারে কিংবা ব্যথা ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণ হতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে জটিলতার আশঙ্কাও তৈরি হয়।

ডিম্বাশয়ের সিস্ট হওয়ার অন্যতম কারণ হলো মাসিক চক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোনগত পরিবর্তন। ডিম্বাণু পরিপক্ব হওয়া এবং ডিম্বস্ফোটনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কখনো কখনো ফাংশনাল সিস্ট তৈরি হতে পারে। এসব সিস্ট সাধারণত ক্ষতিকর নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে নিজে থেকেই সেরে যায়। গর্ভাবস্থার শুরুর দিকেও কর্পাস লিউটিয়াম সিস্ট দেখা যেতে পারে। আবার এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণে ডিম্বাশয়ে এন্ডোমেট্রিওমা বা কথিত ‘চকলেট সিস্ট’ তৈরি হতে পারে।

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা পিসিওএস নিয়েও অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। পিসিওএসে ডিম্বাশয়ে অনেক ছোট ফোলিকল দেখা যেতে পারে, কিন্তু এগুলোকে সাধারণ ডিম্বাশয়ের সিস্টের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। পিসিওএস একটি হরমোন ও বিপাকীয় সমস্যার সমন্বিত অবস্থা, যার সঙ্গে অনিয়মিত মাসিক, অতিরিক্ত অ্যান্ড্রোজেনের লক্ষণ এবং অন্যান্য শারীরিক পরিবর্তন জড়িত থাকতে পারে। ফলে শুধু আলট্রাসনোগ্রামে ছোট ছোট ফোলিকল দেখা গেলেই কারও পিসিওএস হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তও দেওয়া উচিত নয়।

ডিম্বাশয়ের সিস্টের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উপসর্গের ধরন। অনেক নারীর কোনো উপসর্গ থাকে না এবং অন্য কোনো কারণে করা পরীক্ষায় সিস্ট ধরা পড়ে। আবার সিস্ট বড় হলে তলপেটে ব্যথা, পেট ভারী লাগা, পেট ফাঁপা, পেলভিসে চাপ অনুভব, মাসিকের সময় বেশি ব্যথা কিংবা মাসিকের ধরনে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কারও কারও ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ, কোষ্ঠকাঠিন্য, নড়াচড়ায় অস্বস্তি অথবা যৌনমিলনের সময় ব্যথাও হতে পারে। তবে এসব উপসর্গের অন্য কারণও থাকতে পারে। তাই কেবল উপসর্গের ভিত্তিতে সিস্টের ধরন নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

কিছু পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ প্রচণ্ড তলপেটের ব্যথা, ব্যথার সঙ্গে বমি, মাথা ঘোরা বা দুর্বল হয়ে পড়া, জ্বরের সঙ্গে তীব্র পেটব্যথা কিংবা অস্বাভাবিক রক্তপাত হলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। ডিম্বাশয়ের সিস্টের জটিলতার মধ্যে সিস্ট ফেটে যাওয়া বা ডিম্বাশয় পেঁচিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি থাকতে পারে। বিশেষ করে হঠাৎ তীব্র ব্যথা শুরু হলে বিষয়টি সাধারণ পেটব্যথা ভেবে ঘরে বসে থাকা নিরাপদ নয়।

সিস্ট শনাক্ত করার ক্ষেত্রে রোগীর বয়স, মাসিকের ইতিহাস, উপসর্গ এবং শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি আলট্রাসনোগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আলট্রাসনোগ্রামে সিস্টটি তরলপূর্ণ কি না, দেয়াল কেমন, ভেতরে কোনো শক্ত অংশ আছে কি না এবং এর আকার কত—এসব তথ্য পাওয়া যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক পুনরায় আলট্রাসনোগ্রাম, রক্ত পরীক্ষা বা অন্য পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন। বিশেষ করে মেনোপজের পর ডিম্বাশয়ে কোনো সিস্ট শনাক্ত হলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

চিকিৎসার প্রয়োজন হবে কি না, তা নির্ভর করে সিস্টের ধরন ও আকারের পাশাপাশি নারীর বয়স, উপসর্গ এবং পরীক্ষার ফলাফলের ওপর। ছোট ও সাধারণ ধরনের সিস্টের ক্ষেত্রে অনেক সময় তাৎক্ষণিক কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসক নির্দিষ্ট সময় পর আবার পরীক্ষা করে সিস্টটি ছোট হয়েছে কি না বা পরিবর্তিত হয়েছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। অন্যদিকে বড়, দীর্ঘস্থায়ী, উপসর্গ সৃষ্টি করা, জটিলতার ঝুঁকিযুক্ত অথবা পরীক্ষায় সন্দেহজনক বৈশিষ্ট্যযুক্ত সিস্টের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি বিবেচনা করা হয়।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—ডিম্বাশয়ের সিস্ট মানেই ক্যানসার নয় এবং সিস্ট ধরা পড়লেই অস্ত্রোপচার করতে হবে, এমন ধারণাও সঠিক নয়। একইভাবে সিস্ট আছে বলে নিজের সিদ্ধান্তে হরমোনের ওষুধ বা অন্য কোনো চিকিৎসা শুরু করাও উচিত নয়। চিকিৎসা নির্ধারণের আগে সিস্টের প্রকৃতি এবং রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা বোঝা প্রয়োজন।

ডিম্বাশয়ের সিস্টের চিকিৎসায় বিভিন্ন বিকল্প চিকিৎসা বা হোমিওপ্যাথিক ওষুধের নাম প্রচলিতভাবে উল্লেখ করা হলেও এসব পদ্ধতিকে ডিম্বাশয়ের সিস্ট দূর করার প্রমাণিত চিকিৎসা হিসেবে গ্রহণ করার আগে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষ করে বড় বা সন্দেহজনক সিস্ট, তীব্র ব্যথা কিংবা জরুরি জটিলতার ক্ষেত্রে প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা গ্রহণে দেরি করা উচিত নয়। কোনো ওষুধ গ্রহণের আগে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

ডিম্বাশয়ের সিস্ট নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা অনেক সময় রোগটি নয়, বরং ভুল ধারণা ও অবহেলা। কেউ সিস্টের নাম শুনে অযথা আতঙ্কিত হন, আবার কেউ কোনো উপসর্গ থাকলেও দীর্ঘদিন চিকিৎসকের কাছে যান না। দুটি অবস্থাই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সচেতনতার অর্থ আতঙ্কিত হওয়া নয়; বরং সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য জানা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

নারীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, অস্বাভাবিক মাসিকের পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী পেলভিক ব্যথা বা অস্বস্তিকে অবহেলা না করা গুরুত্বপূর্ণ। আলট্রাসনোগ্রামে সিস্ট ধরা পড়লে প্রথমেই এর ধরন ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ জানা উচিত। অনেক ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট হতে পারে, আবার কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, ডিম্বাশয়ের সিস্ট একটি পরিচিত সমস্যা হলেও এর প্রতিটি ধরন ও প্রতিটি রোগীর পরিস্থিতি এক নয়। তাই শুধু ‘সিস্ট হয়েছে’—এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ভয় পাওয়া বা চিকিৎসা শুরু করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। সিস্টের আকার, গঠন, উপসর্গ এবং সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন—এসব মূল্যায়নের মাধ্যমেই সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব। সচেতনতা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে এবং সম্ভাব্য জটিলতা এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com