চার মাসে ২২ মৃত্যুদণ্ড, সরানো হলো ১০০ মামলা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৭ বার
চার মাসে ২২ মৃত্যুদণ্ড, সরানো হলো ১০০ মামলা

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের উত্তর প্রদেশের মুজাফফরনগরের একটি ফাস্ট-ট্র্যাক আদালতকে ঘিরে বিচারিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। ওই আদালতের বিচারক রবি কুমার দিওয়াকর মাত্র চার মাসের মধ্যে ১০টি মামলায় ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর তাঁর আদালতে চলমান প্রায় ১০০টি হত্যা মামলা অন্য বিচারকের আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে। বুধবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।

মুজাফফরনগরের অতিরিক্ত জেলা ও সেশনস জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রবি কুমার দিওয়াকরের আদালতে এসব মামলা বিচারাধীন ছিল। পরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মামলাগুলো জেলা ও সেশনস জজ বীরেন্দ্র কুমার সিংয়ের আদালতে পাঠানো হয়। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক হত্যা মামলা অন্য আদালতে স্থানান্তরের ঘটনায় স্থানীয় আইনজীবী ও মামলার পক্ষগুলোর মধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দিওয়াকরের আদালতে বিচারাধীন মামলাগুলোর একটি বড় অংশ ছিল অত্যন্ত গুরুতর অপরাধসংক্রান্ত। এসব মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে। ফলে বিচারকের সাম্প্রতিক কয়েক মাসের রায় এবং পরবর্তী সময়ে মামলাগুলো অন্য আদালতে স্থানান্তরের বিষয়টি স্থানীয় বিচারাঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

এক সরকারি আইনজীবী জানিয়েছেন, স্থানান্তর করা মামলাগুলো মূলত এমন ধরনের অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। অর্থাৎ এগুলো সাধারণ অপরাধের মামলা নয়; বরং হত্যাসহ গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার অংশ।

স্থানীয় আইনজীবী মহলেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। মুজাফফরনগর জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রমোদ ত্যাগীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিচারক দিওয়াকরের আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের আশঙ্কা নিয়ে আইনজীবী ও মামলার পক্ষগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মামলাগুলো অন্য আদালতে স্থানান্তর করা হয়।

তবে মামলাগুলো স্থানান্তরের অর্থ এই নয় যে এসব মামলার আসামিরা কোনোভাবে দায়মুক্তি পেয়েছেন বা বিচারপ্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে। বরং বিচারিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্যই মামলাগুলো অন্য বিচারকের আদালতে পাঠানো হয়েছে। নতুন আদালতে এসব মামলার শুনানি ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া চলবে।

রবি কুমার দিওয়াকরের বিচারিক ক্যারিয়ারও বেশ দীর্ঘ। ৪৬ বছর বয়সী এই বিচারকের বাড়ি উত্তর প্রদেশের লক্ষ্ণৌয়ে। ২০০৯ সালে আজমগড়ে অতিরিক্ত সিভিল জজ হিসেবে বিচারিক জীবন শুরু করেন তিনি। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে বিচার বিভাগে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।

২০১৫ সালের মে মাসে তিনি সুলতানপুরে সিভিল জজ হিসেবে পদোন্নতি পান। এর প্রায় পাঁচ মাস পর তাঁকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিচারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষাও সম্পন্ন করেছেন তিনি। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার মধ্যে বাণিজ্যে স্নাতক এবং এলএলএম ডিগ্রি রয়েছে।

২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে তিনি মুজাফফরনগরের অতিরিক্ত জেলা ও সেশনস জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই দায়িত্বে থাকার সময়ই গুরুতর অপরাধের মামলায় তাঁর দেওয়া কয়েকটি কঠোর রায় স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

চার মাসে ১০টি মামলায় ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার তথ্যটি এই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। সাধারণত মৃত্যুদণ্ড একটি অত্যন্ত কঠোর শাস্তি এবং তা দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতকে অপরাধের প্রকৃতি, প্রমাণের শক্তি, আসামির ভূমিকা এবং মামলার সামগ্রিক পরিস্থিতি গভীরভাবে বিবেচনা করতে হয়। ফলে অল্প সময়ে একাধিক মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়ার ঘটনা বিচারিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

ভারতের বিচারব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত সংবেদনশীল। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আদালত সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে পারে, তবে মৃত্যুদণ্ডের রায় উচ্চতর আদালতে চূড়ান্ত অনুমোদনের আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। ফলে কোনো নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দিলেই তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়ে যায় না। উচ্চতর আদালতে বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ থাকে এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

মুজাফফরনগরের সাম্প্রতিক ঘটনাতেও তাই বিচারকের দেওয়া রায় এবং মামলাগুলো স্থানান্তর—এই দুটি বিষয়কে আলাদাভাবে দেখা প্রয়োজন। একদিকে রয়েছে বিচারকের চার মাসে দেওয়া ১০ মামলায় ২২টি মৃত্যুদণ্ডের রায়, অন্যদিকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাঁর আদালতে থাকা প্রায় ১০০টি হত্যা মামলা অন্য বিচারকের আদালতে পাঠানোর ঘটনা।

স্থানীয় আইনজীবীদের বক্তব্যে যে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে, সেটিও এই ঘটনাকে ঘিরে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলাগুলো স্থানান্তরের নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ফলে বিচারকের রায়ের হার এবং মামলাগুলো সরিয়ে নেওয়ার মধ্যে সরাসরি কোনো কারণগত সম্পর্ক রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আরও সরকারি তথ্য প্রয়োজন।

বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হত্যা মামলার মতো গুরুতর বিষয়ে আদালতের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট আসামি, ভুক্তভোগীর পরিবার এবং বৃহত্তর সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। একটি মামলায় দোষী ব্যক্তির শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্দোষ ব্যক্তির অধিকার রক্ষাও বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মুজাফফরনগরের প্রায় ১০০টি মামলা এখন নতুন আদালতে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রমে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, সেদিকেও নজর থাকবে। নতুন বিচারকের আদালতে মামলাগুলোর শুনানি কীভাবে এগোয় এবং ইতোমধ্যে সম্পন্ন হওয়া বিচারিক কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপ কী হবে, তা সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।

এই ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে চার মাসে ২২টি মৃত্যুদণ্ডের রায়। একই সময়ে বিচারকের আদালত থেকে প্রায় ১০০টি হত্যা মামলা সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তবে বিচারিক সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন করতে হলে প্রতিটি মামলার প্রমাণ, সাক্ষ্য, আইনি যুক্তি এবং রায়ের বিস্তারিত পর্যালোচনা প্রয়োজন। কেবল মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা দিয়ে কোনো বিচারকের সিদ্ধান্তের ন্যায়সংগততা কিংবা অন্যায্যতা নির্ধারণ করা যায় না।

মুজাফফরনগরের এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত ভারতের বিচারব্যবস্থায় গুরুতর অপরাধের মামলা পরিচালনা, মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার এবং বিচারিক প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। মামলাগুলো অন্য আদালতে স্থানান্তরের পর বিচারপ্রক্রিয়া কোন পথে এগোয় এবং সংশ্লিষ্ট আদালতগুলো এসব মামলায় কী সিদ্ধান্ত দেয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com