প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও ওষুধের মূল্য নির্ধারণসংক্রান্ত নীতিমালা বাতিলের সিদ্ধান্তকে জনস্বার্থবিরোধী বলে মন্তব্য করেছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলটির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেছেন, ওষুধ মানুষের জীবন রক্ষার উপকরণ; এটিকে কেবল ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। তাঁর অভিযোগ, নীতিমালা বাতিলের মাধ্যমে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের স্বার্থ উপেক্ষা করে ওষুধ ব্যবসায়ীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিজয়নগরে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে দলটির পক্ষ থেকে ওষুধ খাতের সংস্কার, মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের কাছে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ সহজলভ্য করার বিষয়ে একাধিক দাবি তুলে ধরা হয়।
ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, একটি পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যয়ের পাশাপাশি ওষুধের খরচও তাদের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে নিয়মিত ওষুধ কেনা অনেক সময় সংসারের অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় চলে আসে। এমন বাস্তবতায় জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলে মনে করে এবি পার্টি।
তিনি বলেন, দেশের ওষুধশিল্প বর্তমানে বড় একটি অর্থনৈতিক খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশে বিপুল পরিমাণ ওষুধ উৎপাদিত হলেও সাধারণ মানুষকে উচ্চমূল্যে ওষুধ কিনতে হচ্ছে—এটি গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর দাবি, দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা ও বাজারের আকার বিবেচনায় নিয়ে এমন নীতি প্রয়োজন, যাতে একদিকে শিল্পের বিকাশ অব্যাহত থাকে, অন্যদিকে রোগীদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ না পড়ে।
সংবাদ সম্মেলনে ১৯৯৪ সালের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি পরিপত্রের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। দলটির বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময় ১১৭টি ওষুধকে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ প্রণয়ন করে তালিকাটি ২৯৭টি ওষুধে সম্প্রসারণ করা হয়। কিন্তু বর্তমান সরকার গত ৩ আগস্ট ওই নীতিমালা বাতিল করে আগের কাঠামোয় ফিরে গেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়।
এবি পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা কেবল প্রশাসনিক একটি তালিকা নয়; এর সঙ্গে মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ এবং ওষুধের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। কোন ওষুধগুলো সাধারণ মানুষের জন্য অপরিহার্য, সেগুলোর সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে কার্যকর নীতি না থাকলে বাজারে মূল্যবৈষম্য আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
ব্যারিস্টার ফুয়াদ একই সঙ্গে ওষুধ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চিকিৎসকদের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তাঁর অভিযোগ, চিকিৎসকদের প্রভাবিত করার জন্য বিভিন্ন কোম্পানির উপহার ও প্রণোদনা দেওয়ার যে সংস্কৃতি রয়েছে, তা বন্ধ করা প্রয়োজন। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন যেন রোগীর প্রয়োজন ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, বাণিজ্যিক প্রভাবের কারণে নয়—এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে এবি পার্টির বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। দলটি মনে করে, একই জেনেরিকের ওষুধের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্র্যান্ড বৈচিত্র্য এবং অযৌক্তিক মূল্যবৈষম্য থাকলে রোগীরা বিভ্রান্ত ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাই বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার।
এবি পার্টি আরও বলেছে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ শুধু সরকারি হাসপাতাল বা সরকারি ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ যাতে বেসরকারি পর্যায়েও প্রয়োজনীয় ওষুধ সহজে পান, সে বিষয়েও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে শহরের বাইরে ও প্রান্তিক এলাকার রোগীদের জন্য ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।
দেশের ওষুধশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে আলোচনা হয়। দলটির মতে, বাংলাদেশে ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে এবং এই খাত ভবিষ্যতে আরও বড় বৈদেশিক বাজারে প্রবেশ করতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা মোকাবিলার জন্য শুধু উৎপাদন সক্ষমতা যথেষ্ট নয়; গবেষণা, নতুন ওষুধ উদ্ভাবন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তাও প্রয়োজন।
এবি পার্টি বিশেষ করে এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পরবর্তী সময়ের জন্য ওষুধশিল্পকে প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতায় দেশীয় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে, সে জন্য দীর্ঘমেয়াদি সরকারি নীতি প্রয়োজন বলে দলটি মনে করে। একই সঙ্গে বিদেশি বাজারে বাংলাদেশের ওষুধের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যারিস্টার ফুয়াদ ওষুধশিল্পের মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের প্রতি জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ব্যবসায়িক স্বার্থ থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু ওষুধের মতো জীবন রক্ষাকারী পণ্যের ক্ষেত্রে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের স্বার্থকে মুখোমুখি অবস্থানে না নেওয়ার জন্যও তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।
ওষুধের বাজারে মূল্য নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। একদিকে উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের দাম, আমদানি ব্যয়, গবেষণা ও বিপণন খরচসহ বিভিন্ন বিষয় ওষুধের দামের সঙ্গে যুক্ত; অন্যদিকে রোগীর ক্রয়ক্ষমতা ও চিকিৎসার ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। ফলে ওষুধের মূল্য নির্ধারণে সরকারের নীতিগত ভূমিকা কতটা হওয়া উচিত, তা নিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা হয়েছে। এবি পার্টির সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণের সময় ওষুধের ব্যয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়—এমন রোগীদের জন্য মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি পারিবারিক ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সহজলভ্যতা ও সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত করার প্রশ্নটি শুধু স্বাস্থ্যনীতি নয়, সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির নেতারা সরকারের কাছে বাতিল হওয়া ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ পুনর্বহালের দাবি জানান। একই সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার কার্যকর ব্যবস্থা, একই জেনেরিকের ওষুধে অযৌক্তিক ব্র্যান্ড বৈচিত্র্য ও মূল্যবৈষম্য কমানো এবং চিকিৎসকদের প্রভাবিত করতে উপহার বা অনৈতিক প্রণোদনা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়।
এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, দেশীয় ওষুধশিল্পের সক্ষমতা ও উদ্ভাবন সম্পর্কে জনগণকে তথ্য জানাতে গণমাধ্যমের সুযোগ বাড়ানো এবং এলডিসি-পরবর্তী সময়ে ওষুধশিল্পের সুরক্ষা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়নের দাবিও জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওষুধ খাতকে আরও জনবান্ধব ও স্বচ্ছ করার দাবি নিয়ে তারা তাদের অবস্থান অব্যাহত রাখবে।
ওষুধের মূল্য ও নীতিমালা নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত এখন জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোচনায় নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। একদিকে দেশীয় ওষুধশিল্পের বিকাশ ধরে রাখা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা—দুই দিকের ভারসাম্য রক্ষা করাই এ ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তে রোগীর স্বার্থ কতটা গুরুত্ব পায়, তার ওপরই ভবিষ্যতে এই বিতর্কের গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করবে।