বিদ্যুৎহীনতায় ক্ষোভ, ঈশ্বরগঞ্জে পিডিবি অফিসে হামলা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৫ বার
বিদ্যুৎহীনতায় ক্ষোভ, ঈশ্বরগঞ্জে পিডিবি অফিসে হামলা

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান না হওয়ায় বৃহস্পতিবার সকালে তারা পৌর শহরের বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কার্যালয়ে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ সময় পিডিবির এক উপসহকারী প্রকৌশলীকে মারধর করার অভিযোগও উঠেছে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার ২০ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে ঈশ্বরগঞ্জ পৌর শহরের পিডিবি কার্যালয়ে। পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে কয়েক হাজার মানুষ টানা দুর্ভোগের মধ্যে ছিলেন। বিদ্যুৎ না থাকায় শুধু দৈনন্দিন জীবনযাত্রাই ব্যাহত হয়নি, গরমের মধ্যে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ভোগান্তিও বেড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারে তৈরি হয় নানা সমস্যা।

স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৩ আগস্ট রাতে ঈশ্বরগঞ্জ পৌর এলাকার শিমরাইল গ্রামের একটি ট্রান্সফরমার নষ্ট হয়ে যায়। এরপর থেকেই ওই এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যোগাযোগ করেও দ্রুত সমাধান না পাওয়ায় বৃহস্পতিবার সকালে একদল বাসিন্দা পিডিবি কার্যালয়ে গিয়ে অবস্থান নেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, এ সময় শিমরাইল গ্রামের প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ বাসিন্দা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। শুরুতে তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করার দাবি জানান এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষুব্ধদের একটি অংশ পিডিবি কার্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর চালায়। কার্যালয়ের কাচ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও ড্রয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলার একপর্যায়ে উপসহকারী প্রকৌশলী রেজাউল করিমকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।

ঘটনার পর ঈশ্বরগঞ্জ থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে বিদ্যুৎ সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করার আশ্বাস দেওয়া হলে বিক্ষুব্ধ বাসিন্দারা কার্যালয় থেকে চলে যান। ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রবিউল আজম জানিয়েছেন, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়ার পর নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনের বিষয়ে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেছেন, নতুন ট্রান্সফরমার দেওয়ার কথা বলে পিডিবির আবাসিক প্রকৌশলীকে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। তবে এই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হয়নি এবং পিডিবির পক্ষ থেকে তা অস্বীকার করা হয়েছে।

পিডিবির উপসহকারী প্রকৌশলী রেজাউল করিম, যিনি হামলায় আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে, ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তার ভাষ্য, ট্রান্সফরমারের জন্য এ ধরনের টাকা নেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। তবে বিদ্যুৎ লাইনের সংযোগ ও মেরামতের কাজে লাইনম্যানদের বিভিন্ন জায়গায় কিছু খরচাপাতি দেওয়া হয় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের আরেকটি দিক হলো, শিমরাইল গ্রামের বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যাটি নতুন নয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক মাস আগেও ওই এলাকার ট্রান্সফরমার নষ্ট হয়েছিল। তখন নতুন ট্রান্সফরমারের পরিবর্তে একটি পুরোনো ট্রান্সফরমার বসানো হয়। কিছুদিন চলার পর সেটিও বিকল হয়ে যায়। ফলে একই এলাকায় বারবার ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়ায় স্থায়ী সমাধান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরোনো বা দুর্বল ট্রান্সফরমার দিয়ে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। এতে একদিকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে মেরামত বা নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনের জন্য তাদের আবার সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকায় ক্ষোভ ধীরে ধীরে তীব্র হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

তবে পিডিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি অবহেলা করে ফেলে রাখা হয়নি। ঈশ্বরগঞ্জ পিডিবির আবাসিক প্রকৌশলী হামজা ইমাম জানিয়েছেন, শিমরাইল গ্রামের ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। কিন্তু ট্রান্সফরমারের সংকট থাকায় নতুন ট্রান্সফরমার পেতে দেরি হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে চাইলেও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

একটি এলাকার কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ না থাকা স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় কী ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে, ঈশ্বরগঞ্জের এই ঘটনাটি তারই একটি উদাহরণ। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে পানির পাম্প, ফ্রিজ, বৈদ্যুতিক পাখা, চিকিৎসা সরঞ্জামসহ নানা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও অনলাইনভিত্তিক কাজ ব্যাহত হয়। গরমের মধ্যে শিশু ও বয়স্কদের ভোগান্তিও বাড়তে পারে।

তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে মানুষের ক্ষোভ থাকলেও সরকারি কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর বা কোনো কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করার ঘটনা সমস্যার সমাধান নয়। এতে একদিকে সরকারি সম্পদের ক্ষতি হয়, অন্যদিকে সেবাদানকারী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। কোনো অনিয়ম বা গাফিলতির অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জানিয়ে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থার দাবি জানানোই কার্যকর পথ।

এ ঘটনায় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পর আপাতত উত্তেজনা কমেছে। এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের মূল প্রত্যাশা দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের সমস্যা যাতে বারবার না হয়, তার স্থায়ী সমাধান। অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের জন্যও জরুরি হয়ে উঠেছে নষ্ট ট্রান্সফরমারের পরিবর্তে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা থাকলে তা চিহ্নিত করা।

দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে কেন্দ্র করে ঈশ্বরগঞ্জে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু একটি ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরোনো ট্রান্সফরমার, সরঞ্জাম সংকট এবং দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে তাদের দুর্ভোগ দীর্ঘ হয়েছে। অন্যদিকে পিডিবির বক্তব্য, প্রয়োজনীয় ট্রান্সফরমারের সংকটের কারণেই নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপনে বিলম্ব হয়েছে। ফলে অভিযোগ ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা নিরসনে স্বচ্ছ তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

এখন সবার নজর দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার দিকে। একই সঙ্গে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে যাতে নাগরিকদের ক্ষোভ সহিংসতায় রূপ না নেয় এবং কোনো কর্মকর্তা বা সরকারি সম্পদ ক্ষতির শিকার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। শিমরাইলের বাসিন্দাদের দীর্ঘ বিদ্যুৎ সংকটের অবসান এবং ভবিষ্যতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাই এই ঘটনার সবচেয়ে প্রত্যাশিত পরিণতি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত