প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট না দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি এই নির্বাচনকে অর্থহীন ও প্রহসন হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত থাকলে সেটিকে প্রকৃত নির্বাচন বলা যায় না। তাঁর মতে, এমন একটি প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার মধ্যে গণতান্ত্রিকভাবে অর্থবহ কোনো যুক্তি তিনি খুঁজে পাননি।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর গ্রামে নিজের বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট না দেওয়ার কারণ তুলে ধরেন রুমিন ফারহানা। এ সময় তিনি তাঁর অবস্থানের পেছনে কয়েকটি যুক্তির কথা জানান এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করেন।
রুমিন ফারহানার বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে তাঁর প্রথম আপত্তি হলো নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা না থাকা। তিনি মনে করেন, একটি নির্বাচনকে প্রকৃত অর্থে নির্বাচন হতে হলে সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অনিশ্চয়তা এবং জনগণের পছন্দের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল বলে তিনি মনে করেছেন। এ কারণে ভোট দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তিনি অনুভব করেননি।
তিনি বলেন, তাঁর কাছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অর্থহীন মনে হয়েছে। কারণ ভোটের ফলাফল আগে থেকেই জানা থাকলে সেটিকে নির্বাচন না বলে এক ধরনের মনোনয়ন বলা যেতে পারে। তাঁর বক্তব্যে মূলত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্বের বিষয়টি উঠে এসেছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট না দেওয়ার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে তিনি সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। রুমিন ফারহানার মতে, একটি বড় গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। সেই প্রত্যাশার সঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যেত, সে প্রশ্নও তিনি তুলেছেন।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বপ্ন ও আত্মত্যাগের বিষয়টি সামনে রেখে সবাই মিলে একজন অরাজনৈতিক এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নির্বাচিত করা সম্ভব ছিল কি না। তাঁর বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় রাজনীতির বাইরে একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
রুমিন ফারহানার মতে, রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে এমন একজন ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত, যিনি রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে থেকে দেশের সব নাগরিকের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারেন। তিনি মনে করেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এ ধরনের একটি সুযোগ তৈরি হতে পারত। তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেই প্রত্যাশা পূরণ করেনি।
তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট না দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়টি সামনে এনেছেন রুমিন ফারহানা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভোটের আগে সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়া তাঁর কাছে প্রহসন ছাড়া অন্য কিছু মনে হয়নি।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। সংসদ সদস্যদের দলীয় অবস্থানের সঙ্গে ভোটদানের সম্পর্ক এবং সংসদে তাদের স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্ক হয়েছে। রুমিন ফারহানাও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই বিষয়টিকে তাঁর সিদ্ধান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়া তাঁর কাছে যৌক্তিক মনে হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্যের ভোটের স্বাধীনতা ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাস্তব প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রশ্ন যখন সামনে থাকে, তখন শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট দেওয়াকে তিনি অর্থবহ গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ হিসেবে বিবেচনা করেন না।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে রুমিন ফারহানা বলেন, যেসব নির্বাচনের ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে, সেখানে ভোট দেওয়ার কোনো গণতান্ত্রিক যৌক্তিকতা তিনি দেখেন না। তাঁর এই বক্তব্য মূলত নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণের আগে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশ ও ভোটের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে তাঁর বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রপতি পদ, নির্বাচনব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা এবং না করা নিয়ে রাজনৈতিক দল ও সংসদ সদস্যদের অবস্থানও এক নয়। এর মধ্যেই নিজের ভোট না দেওয়ার কারণ প্রকাশ করে রুমিন ফারহানা নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর আপত্তির জায়গাগুলো সামনে আনলেন।
রুমিন ফারহানার বক্তব্যে গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মনে করেন, বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও পদগুলোতে নতুন ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। সেই সুযোগে একজন অরাজনৈতিক ও সর্বজনগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মাধ্যমে বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
তাঁর মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা হওয়া উচিত নয়। বরং এই প্রক্রিয়ায় ভোটারদের প্রকৃত পছন্দ, প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নির্বাচনের ফলাফলের ওপর ভোটের বাস্তব প্রভাব থাকা প্রয়োজন। এসব শর্ত পূরণ না হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের রাজনৈতিক অর্থ কমে যায় বলেই তিনি মনে করেন।
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি নির্বাচনের ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত থাকার অভিযোগের কথাও বলেন। তবে এই বক্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবে এসেছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে তাঁর এই মূল্যায়নের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা অন্য রাজনৈতিক পক্ষের বক্তব্য এখানে পাওয়া যায়নি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার বক্তব্যে শেষ পর্যন্ত তিনটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে—নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে তাঁর পূর্বানুমান, গণঅভ্যুত্থানের পর একটি অরাজনৈতিক ও সর্বজনগ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের প্রত্যাশা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে তাঁর আপত্তি। এসব কারণের ভিত্তিতেই তিনি ভোটদানের প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন বলে জানান।
তাঁর এই অবস্থান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে চলমান রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা, সংসদ সদস্যদের ভোটের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রপতি পদে একজন সর্বজনগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে। এখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত এবং সাংবিধানিক সংস্কারের আলোচনায় এসব প্রশ্ন কতটা গুরুত্ব পায়, সেটিই দেখার বিষয়।