পিংক বাসে অফিস সময়ে ভিড়, অন্য সময়ে ফাঁকা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ১০ বার
পিংক বাসে অফিস সময়ে ভিড়, অন্য সময়ে ফাঁকা

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে চালু হয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) পিংক বাস সার্ভিস। নারী চালক, সহকারী ও কন্ডাক্টর পরিচালিত এই বিশেষ বাসসেবা চালুর পর কর্মজীবী ও শিক্ষার্থী নারীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হলেও শুরুতেই সামনে এসেছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ—সেবা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় অফিস সময়ের বাইরে অনেক বাসেই যাত্রীসংখ্যা কম থাকছে। ফলে কোথাও কোথাও আসন ফাঁকা রেখেই চলতে হচ্ছে বাসগুলোকে।

বিআরটিসি ১৮ আগস্ট রাজধানীতে আনুষ্ঠানিকভাবে পিংক বাস সার্ভিস চালু করে। একই উদ্যোগের আওতায় চট্টগ্রাম ও বগুড়াতেও বাসসেবা চালুর কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ১০টি, চট্টগ্রামে দুটি এবং বগুড়ায় দুটি বাসসহ মোট ১৪টি বাস নির্ধারিত পথে চলাচল করছে। বাসগুলো নারী যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত এবং এগুলোর চালক ও কন্ডাক্টর হিসেবে নারীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে নারীদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবহন খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে পিংক বাস চলাচল শুরু হলেও অনেক নারী এখনো জানেন না, কোন রুটে কখন বাসটি পাওয়া যাবে। ফলে অফিসে যাতায়াতের ব্যস্ত সময়ে কিছু রুটে যাত্রীর চাপ দেখা গেলেও দিনের অন্য সময়ে চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। যাত্রীদের একটি অংশের অভিযোগ, বাসের রুট, স্টপেজ ও সময়সূচি সম্পর্কে সহজে জানার মতো পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় তারা চাইলেও নিয়মিত এই সেবা ব্যবহার করতে পারছেন না।

নতুন এই সেবার তৃতীয় দিনে রাজধানীর মতিঝিলে কথা হয় পিংক বাসের চালক সুপ্রিয়া কুন্ডের সঙ্গে। তিনি জানান, ডেমরা বাস ডিপো থেকে সকালে যাত্রী নিয়ে মতিঝিলে আসেন। অফিস ছুটির পর আবার মতিঝিল থেকে যাত্রী নিয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার কথা রয়েছে। তবে অফিস সময়ের বাইরে যাত্রী তুলনামূলক কম থাকায় অনেক সময় অল্পসংখ্যক যাত্রী নিয়েই বাস চালাতে হচ্ছে।

সুপ্রিয়ার মতে, সীমিতসংখ্যক বাস, রুটসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা এবং বাস চলাচলের সময় সম্পর্কে যাত্রীদের পর্যাপ্ত ধারণা না থাকার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে নতুন সেবা নিয়ে মানুষের আগ্রহ রয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীসংখ্যা বাড়বে বলে তিনি আশা করছেন।

বিভিন্ন বাসস্টপেজে অপেক্ষমাণ নারী যাত্রীদের সঙ্গেও কথা বলে একই ধরনের সমস্যার কথা জানা গেছে। তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, পিংক বাস কখন আসবে বা নির্দিষ্ট স্টপেজ থেকে কখন ছাড়বে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া কঠিন। ফলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরও অনেককে শেষ পর্যন্ত অন্য গণপরিবহনে উঠতে হচ্ছে।

তবে যারা পিংক বাসে উঠতে পারছেন, তাদের অভিজ্ঞতায় নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী মীম মনে করেন, সাধারণ গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে নারীদের নানা ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। দাঁড়িয়ে যাতায়াতের সময় অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ ও হয়রানির আশঙ্কাও থাকে। নারী চালক ও কন্ডাক্টর পরিচালিত বাসে এ ধরনের উদ্বেগ তুলনামূলকভাবে কম থাকবে বলে তিনি মনে করেন।

মিরপুর-১২ থেকে মতিঝিল রুটে দায়িত্ব পালন করা চালক খাদিজাতুল রিমাও নতুন এই সেবাকে নারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন। একজন নারী হয়ে আরেকজন নারীকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে আলাদা তৃপ্তি রয়েছে বলে জানান তিনি। তার প্রত্যাশা, বাসের সংখ্যা বাড়ানো হলে আরও বেশি নারী এই সেবা ব্যবহার করবেন।

নারায়ণগঞ্জ-মতিঝিল রুটে দায়িত্ব পালন করছেন জান্নাতুল ফেরদৌসী। বিআরটিসিতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর বড় বাস চালনার দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। রাজধানীর ব্যস্ত ও যানজটপূর্ণ সড়কে বড় বাস চালানোকে চ্যালেঞ্জিং মনে হলেও তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে সড়কের অবস্থা আরও উন্নত করা গেলে নারী চালকদের কাজ আরও সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।

পিংক বাসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। বাসগুলোতে পয়েন্ট অব সেল বা পস মেশিনের মাধ্যমে ভাড়া আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা বাস, ডিপো ও কাউন্টারের দৃশ্যমান স্থানে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েকটি বাসে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং প্রতিটি বাসে ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম বা ভিটিএস যুক্ত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব বাসে এসব সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

নারী কন্ডাক্টর তানিয়া আক্তার জানান, নারী যাত্রীদের সঙ্গে কাজ করতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। তার দায়িত্বের রুট গাজীপুরের শিববাড়ী থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত। আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা এবং নারী কর্মীদের সমন্বয়ে এই সেবা সফল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

পিংক বাসের মাধ্যমে শুধু নারীদের যাতায়াতের নিরাপত্তা নয়, পরিবহন খাতে নারীদের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগও তৈরি হচ্ছে। বিআরটিসির প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী চালকদের একটি অংশ দীর্ঘদিন প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। পরে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের বড় বাস চালানোর জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। পিংক বাসের মাধ্যমে সেই প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বাস্তব কর্মক্ষেত্রে কাজে লাগানোর সুযোগ পাচ্ছেন তারা। বর্তমানে ১৫ জন নারী চালক ও ২৪ জন নারী কন্ডাক্টর এই সেবার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে বিআরটিসি।

তবে পিংক বাসের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এর স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা। কারণ নারীদের জন্য পৃথক বাসসেবা চালুর ইতিহাস বাংলাদেশে নতুন নয়। বিআরটিসি ১৯৯৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম মহিলা বাস সার্ভিস চালু করেছিল। ২০০১ সালে সেটি ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় সম্প্রসারণ করা হয়। পরে ২০০৯ সালে আবার সেবাটি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কাঙ্ক্ষিতভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৫ সালেও নতুন করে নারী যাত্রীদের জন্য বিশেষ বাস চালু করা হয়েছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত যাত্রী না পাওয়া, সীমিত রুট এবং ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সমস্যার কারণে আগের উদ্যোগগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

এই অভিজ্ঞতার কারণে এবারও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও যাত্রী অধিকারকর্মীদের মধ্যে কিছুটা সংশয় রয়েছে। তাদের মতে, শুধু আলাদা বাস চালু করলেই নারীদের গণপরিবহন সমস্যা সমাধান হবে না। নারীদের প্রকৃত চাহিদা, কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান, যাতায়াতের সময় এবং সম্ভাব্য যাত্রীসংখ্যা বিশ্লেষণ করে রুট নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য সময়সূচি ও স্টপেজের তথ্য সহজে যাত্রীদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও পিংক বাসের রুট ও সময়সূচি সম্পর্কে যাত্রীদের তথ্যঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে।

বিআরটিসি জানিয়েছে, আগামী তিন মাসের মধ্যে পিংক বাসের সংখ্যা ৫০টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই সেবা চালু করা হয়েছে। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রুট, বাসের সংখ্যা ও পরিচালনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে।

রাজধানীর লাখো নারী প্রতিদিন কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নানা প্রয়োজনে গণপরিবহনের ওপর নির্ভর করেন। ভিড়, অনিরাপদ পরিবেশ, আসনসংকট ও হয়রানির আশঙ্কা তাদের যাত্রাকে অনেক সময় কঠিন করে তোলে। সেই বাস্তবতায় পিংক বাসের উপস্থিতি অনেক নারীর কাছে আশার বার্তা হয়ে এসেছে। কিন্তু সেই আশাকে টেকসই সেবায় পরিণত করতে হলে শুধু বাসের রং পরিবর্তন বা নারী কর্মী নিয়োগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য রুট, সময়নিষ্ঠ চলাচল, পর্যাপ্ত বাস, সহজ তথ্যপ্রাপ্তি এবং নিয়মিত যাত্রীচাহিদা পর্যালোচনা।

পিংক বাসের ভবিষ্যৎ সাফল্য তাই শুধু কতটি বাস রাস্তায় নামল, তার ওপর নির্ভর করবে না। বরং নারীরা কতটা নিয়মিত, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে এই সেবা ব্যবহার করতে পারছেন, সেটিই হবে এর প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি। অফিস সময়ের ব্যস্ততা পেরিয়ে দিনের অন্য সময়েও যদি বাসগুলো যাত্রী পেতে শুরু করে, আর নির্ধারিত রুট ও সময়সূচি সম্পর্কে নারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়, তাহলে দীর্ঘদিনের একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ এবার সত্যিকার অর্থেই গণপরিবহনে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত