মহড়ার শেষ দিনে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৯ বার
মহড়ার শেষ দিনে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া শেষ হওয়ার ঠিক আগে একযোগে ১০টিরও বেশি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে উত্তর কোরিয়া। বৃহস্পতিবার পিয়ংইয়ংয়ের এ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকে ঘিরে কোরীয় উপদ্বীপে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ঘটনাটিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে উত্তর কোরিয়াকে এ ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার পিয়ংইয়ং অঞ্চল থেকে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র কোরীয় উপদ্বীপের পূর্ব সাগরের দিকে ছোড়া হয়। উৎক্ষেপণের খবর পাওয়ার পর দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপ মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনীকে পূর্ণ প্রস্তুতি বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সাগরে গিয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে এগুলোকে স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন গিউ-বেক আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছেন, উৎক্ষেপণ করা অস্ত্রগুলো উত্তর কোরিয়ার ৬০০ মিলিমিটারের মালটিপল রকেট লঞ্চার ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। সিউলের সামরিক কর্তৃপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর গতিপথ ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করছে।

উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে এই ৬০০ মিলিমিটারের অস্ত্রব্যবস্থাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা হিসেবে তুলে ধরেছে। দেশটির দাবি, এ ধরনের অস্ত্র কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম। ফলে বৃহস্পতিবারের একযোগে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শুধু সামরিক মহড়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

এই উৎক্ষেপণের সময়টিও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া চলছিল কয়েক দিন ধরে। শুক্রবার মহড়াটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে উত্তর কোরিয়া বরাবরই এ ধরনের মহড়াকে নিজেদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচনা করে এবং এর তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। মহড়া শুরুর পর থেকেই পিয়ংইয়ংয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল।

এরই ধারাবাহিকতায় উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং বুধবার যৌথ সামরিক মহড়ার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটন ও সিউল তাদের সামরিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে শত্রুতাপূর্ণ নীতি অব্যাহত রেখেছে। তাঁর বক্তব্যের এক দিন পরই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ঘটনা ঘটে।

সিউলের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ কোরিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক ইয়াং মু-জিন মনে করেন, কিম ইয়ো জংয়ের হুঁশিয়ারি যে নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের মাধ্যমে পিয়ংইয়ং সেটিই দেখাতে চেয়েছে। তাঁর মতে, এ ধরনের উৎক্ষেপণের পেছনে একাধিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা নিয়ে অসন্তোষ এবং নিজেদের নিরাপত্তা বিষয়ে বাইরের দেশগুলোর মন্তব্যের জবাব দেওয়া অন্যতম।

অধ্যাপক ইয়াংয়ের মতে, উত্তর কোরিয়া এই পরীক্ষার মাধ্যমে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাইছে—দেশটির নিরাপত্তা ও সামরিক নীতি কী হবে, সে সিদ্ধান্ত পিয়ংইয়ং নিজেই নেবে। একই সঙ্গে নতুন বা উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করাও এ উৎক্ষেপণের একটি উদ্দেশ্য হতে পারে।

এদিকে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন গিউ-বেক জানিয়েছেন, উত্তর কোরিয়ার কাছে আনুমানিক ৮০ থেকে ১২০টি পারমাণবিক বোমা বা অস্ত্র থাকতে পারে। এমন সময় এ তথ্য সামনে এসেছে, যখন ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে ভবিষ্যৎ যোগাযোগ এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে নানা জল্পনা চলছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়ায় আমেরিকার অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে আবারও কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের আগ্রহের কথাও জানিয়েছেন তিনি। এসব পরিবর্তনের পর চলমান সামরিক মহড়াটি সংক্ষিপ্ত করে শুক্রবার শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ট্রাম্প গত সোমবার দাবি করেন, মহড়া কমানোর সিদ্ধান্তের পর তিনি কিম জং উনের কাছ থেকে একটি বার্তা পেয়েছেন। তাঁর এ বক্তব্য ঘিরে ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে সম্ভাব্য নতুন যোগাযোগের আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এর এক দিন পরই কিম ইয়ো জং জানান, দুই দেশের শীর্ষ নেতার মধ্যে সাম্প্রতিক কোনো যোগাযোগের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, উত্তর কোরিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতাপূর্ণ নীতিতে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি।

এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কূটনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সামরিক মহড়া কমানোর মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে নিজেদের সামরিক অবস্থান স্পষ্ট করছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যৎ আলোচনা কতটা এগোবে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

কোরীয় উপদ্বীপের পরিস্থিতিতে চীনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চলতি সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়া সফর করেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। সফরের সময় তিনি সিউলকে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোনো পক্ষ না নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

চীনের পক্ষ থেকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। বেইজিং মনে করে, সামরিক চাপের পরিবর্তে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে কোরীয় উপদ্বীপে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা উচিত।

উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পর এখন নজর রয়েছে পিয়ংইয়ংয়ের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। সাধারণত এ ধরনের স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এবারও একই ধরনের কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।

তবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সাগরে গিয়ে পড়ায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তারপরও একযোগে ১০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘটনা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে যখন নতুন করে আলোচনা চলছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি সামনে এসেছে, তখন এই উৎক্ষেপণ পরিস্থিতির জটিলতা আরও বাড়িয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, তারা উত্তর কোরিয়ার সামরিক গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং যেকোনো ধরনের অতিরিক্ত উসকানির জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। অন্যদিকে পিয়ংইয়ংয়ের বক্তব্য ও সামরিক তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, নিজেদের নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতার প্রশ্নে তারা আপস করতে প্রস্তুত নয়। ফলে যৌথ সামরিক মহড়ার সমাপ্তির পরও কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা দ্রুত কমে যাবে—এমন নিশ্চয়তা এখনই মিলছে না।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কেবল একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নয়; বরং ওয়াশিংটন, সিউল ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে সামরিক চাপ, কূটনৈতিক বার্তা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের জটিল সমীকরণের প্রতিফলন। আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় কি না এবং পিয়ংইয়ং আরও কোনো ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায় কি না, তার ওপর কোরীয় উপদ্বীপের পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত