কিমের হাতে ৫৭ পরমাণু বোমা, দাবি করেছেন ট্রাম্প

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৮ বার
কিমের হাতে ৫৭ পরমাণু বোমা, দাবি করেছেন ট্রাম্প

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের হাতে ৫৭টি ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ পরমাণু অস্ত্র রয়েছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে চলতি বছরের শেষ নাগাদ কিমের সঙ্গে আবারও বৈঠকে বসার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সাম্প্রতিক হিসাবের বড় ধরনের পার্থক্য দেখা দিয়েছে। ফলে উত্তর কোরিয়ার প্রকৃত পরমাণু অস্ত্রভান্ডারের আকার নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

গত বুধবার হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, কিমের কাছে ৫৭টি অত্যন্ত শক্তিশালী পরমাণু অস্ত্র রয়েছে। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার এই সক্ষমতা আগের মার্কিন প্রশাসনের সময়ে তৈরি হয়েছে এবং তিনি প্রেসিডেন্ট থাকলে এমন পরিস্থিতি হতে দিতেন না। একই আলোচনায় উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

ট্রাম্পের বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো ৫৭ সংখ্যাটি। এর আগে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে বিভিন্ন দেশ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অনুমান প্রকাশ পেলেও মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে এত নির্দিষ্ট একটি সংখ্যা প্রকাশ্যে বলা হয়নি। ফলে ট্রাম্প যে তথ্যের ভিত্তিতে এই সংখ্যা উল্লেখ করেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার মতো অত্যন্ত গোপনীয় একটি দেশের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্যও কঠিন বলে মনে করা হয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার সাম্প্রতিক হিসাব অবশ্য ট্রাম্পের দেওয়া সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন গিউ-ব্যাক জানিয়েছেন, বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, উত্তর কোরিয়ার কাছে ৮০ থেকে ১২০টি পরমাণু ওয়ারহেড থাকতে পারে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী এই সংখ্যার নির্ভুলতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ ৫৭, ৮০ বা ১২০—কোন সংখ্যাটি বাস্তবের সবচেয়ে কাছাকাছি, তা নিশ্চিতভাবে বলা এখনও সম্ভব নয়।

উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে নিজেদের নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। দেশটি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সত্ত্বেও পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। গত কয়েক বছরে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও দেখা গেছে। ফলে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা ভারসাম্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নীতি এবং দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের নিরাপত্তা পরিকল্পনার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

এদিকে ট্রাম্পের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কিম জং উনের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন বৈঠক। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তিনি চলতি বছরের শেষের দিকে কিমের সঙ্গে দেখা করতে চান। এমন বৈঠক হলে এটি হবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে দুই নেতার প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ। এর আগে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে কিমের সঙ্গে একাধিক ঐতিহাসিক বৈঠক হয়েছিল। তবে সেই আলোচনাগুলো উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে স্থায়ী কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি।

ট্রাম্প এবারও কিমের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের বাস্তবতা মেনে নিয়েই কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার একটি সম্ভাবনা তিনি দেখছেন। তবে ওয়াশিংটনের নীতিগত অবস্থান এবং পিয়ংইয়ংয়ের প্রত্যাশার মধ্যে বড় ব্যবধান এখনো রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে উত্তর কোরিয়ার সম্পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণকে আলোচনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া নিজেদের পারমাণবিক শক্তিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তুলে ধরছে।

ট্রাম্পের নতুন উদ্যোগের সময় দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়াও আলোচনায় এসেছে। উত্তর কোরিয়াকে বার্তা দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প এই পদক্ষেপের পেছনে কিমের সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক এবং উত্তর কোরিয়ার প্রতি মহড়াগুলোকে ‘শত্রুতাপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। কিন্তু পিয়ংইয়ং এই পরিবর্তনকে যথেষ্ট মনে করেনি। কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং বলেছেন, মহড়ার আকার বা সময় কমানো হলেও উত্তর কোরিয়ার দৃষ্টিতে এর মৌলিক চরিত্র বদলায়নি।

এর মধ্যেই কিম ইয়ো জং ট্রাম্পের সঙ্গে কিম জং উনের যোগাযোগ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যেরও বিরোধিতা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের দুই নেতার মধ্যে সাম্প্রতিক কোনো যোগাযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত নন। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ট্রাম্প ও তাঁর ভাইয়ের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো হলেও সেই সম্পর্ক উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় নীতিকে নির্ধারণ করবে না। অর্থাৎ ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের জায়গা থাকলেও কূটনৈতিক সমঝোতার ক্ষেত্রে পিয়ংইয়ং কঠোর অবস্থান বজায় রাখছে।

উত্তর কোরিয়ার এই অবস্থানের মধ্যেই বৃহস্পতিবার দেশটি সমুদ্রে প্রায় ১০টি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক মহড়া সীমিত করার সিদ্ধান্তের পর এমন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ পিয়ংইয়ংয়ের অবস্থান যে এখনও কঠোর, তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি কূটনৈতিক দর-কষাকষিতে উত্তর কোরিয়া তার সামরিক সক্ষমতাকে কীভাবে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, ট্রাম্পের নতুন করে কিমের সঙ্গে বৈঠকের আগ্রহ এবং উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে সতর্ক প্রতিক্রিয়া—দুই পক্ষের অবস্থানের পার্থক্যই স্পষ্ট করছে। পিয়ংইয়ং এখন আগের তুলনায় বেশি পারমাণবিক সক্ষমতা, রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক এবং চীনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক যোগাযোগের ওপর নির্ভর করতে পারছে। ফলে ২০১৮-১৯ সালের মতো আলোচনায় বসার ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার দর-কষাকষির ক্ষমতাও আগের চেয়ে বেড়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প-কিম সম্ভাব্য বৈঠক হলে তার মূল আলোচ্য কী হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। পরমাণু অস্ত্র কমানো, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ, নিষেধাজ্ঞা শিথিল, যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক মহড়া এবং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির মতো বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে। তবে দুই পক্ষের অবস্থান যতক্ষণ পর্যন্ত কাছাকাছি না আসছে, ততক্ষণ শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে বড় কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।

ট্রাম্পের ৫৭টি পরমাণু বোমার দাবি তাই শুধু একটি সংখ্যা প্রকাশের ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক সক্ষমতা, ওয়াশিংটনের নতুন কূটনৈতিক কৌশল এবং পূর্ব এশিয়ায় সম্ভাব্য নতুন শক্তির ভারসাম্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উত্তর কোরিয়ার প্রকৃত অস্ত্রভান্ডার নিয়ে আন্তর্জাতিক হিসাব এখনও এক নয়। ফলে ট্রাম্পের দেওয়া ৫৭ সংখ্যাটিকে নিশ্চিত বাস্তবতা হিসেবে দেখার আগে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে বছরের শেষ নাগাদ ট্রাম্প ও কিম সত্যিই মুখোমুখি বৈঠকে বসেন কি না, সেটিও এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত