প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের ভাবমূর্তি ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে। বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, মানবিক সংকট এবং ইসরাইলি সামরিক অভিযানের আন্তর্জাতিক সমালোচনার মধ্যে দেশটির সরকার পশ্চিমা জনমত ধরে রাখতে নতুন ধরনের রাজনৈতিক ও প্রচারণামূলক কৌশল ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আল জাজিরার একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, ইসরাইল পশ্চিমা দেশগুলোতে ইসলামবিদ্বেষ ও মুসলিমবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্যকে উৎসাহিত করে নিজেদের অবস্থানকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে।
নিবন্ধটির মূল বক্তব্য হলো, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার পশ্চিমা বিশ্বের কট্টর ডানপন্থি রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে নিজেদেরকে ‘কট্টরপন্থি ইসলাম’-এর বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের একটি নিরাপত্তাবলয় হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে। এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে গাজায় চলমান সংঘাত নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনাকে অন্য একটি নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী আলোচনার মধ্যে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে নিবন্ধটিতে মত দেওয়া হয়েছে।
ইসলামবিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিয়া পশ্চিমা রাজনীতিতে নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নের সঙ্গে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার প্রবণতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মুসলিম ও অভিবাসনবিরোধী বক্তব্যের পাশাপাশি মসজিদ ও ইসলামিক প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। চলতি বছর যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডেও মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ডের খবর সামনে এসেছে।
এই রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পরের যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের তুলনা টানা হয়েছে নিবন্ধটিতে। ওই হামলার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ একটি মসজিদ পরিদর্শন করে ইসলামকে শান্তির ধর্ম হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। সে সময় মার্কিন প্রশাসন জোর দিয়ে বলেছিল, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায় কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা জনগোষ্ঠীর ওপর চাপানো উচিত নয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে মার্কিন রাজনীতির একটি অংশে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নিরাপত্তা ও অভিবাসন বিতর্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার প্রবণতা অনেক বেশি দৃশ্যমান বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
ইসরাইল এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশকে নিজেদের কূটনৈতিক ও জনসংযোগ কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করছে বলে আল জাজিরার নিবন্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপের কট্টর ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের বিষয়টি সেখানে গুরুত্ব পেয়েছে। আগে যেসব রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্য বা অতীতের বিতর্কিত অবস্থানের কারণে ইসরাইলের সঙ্গে দূরত্ব ছিল, তাদের কিছু অংশের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইলি রাজনীতিকদের যোগাযোগ বেড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এই সম্পর্ককে দুই পক্ষের জন্য পারস্পরিক রাজনৈতিক সুবিধার জায়গা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ইউরোপের কট্টর ডানপন্থি দলগুলো ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে নিজেদেরকে ইহুদিবিদ্বেষবিরোধী এবং নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পারে। অন্যদিকে ইসরাইল এসব রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে ইউরোপের অভিবাসন, ইসলাম এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে বিদ্যমান উদ্বেগকে নিজেদের নিরাপত্তা-ভিত্তিক বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ পেতে পারে।
গাজা যুদ্ধের পর এই সম্পর্কের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে বিশ্লেষণটিতে বলা হয়েছে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনা যত বাড়ছে, ততই দেশটির সরকার হামাসের সঙ্গে লড়াইকে বৃহত্তর ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এর ফলে গাজার রাজনৈতিক ও মানবিক বাস্তবতার বদলে নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ এবং ইসলামি উগ্রপন্থার বিষয়গুলো আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসছে বলে সমালোচকেরা মনে করেন।
আল জাজিরার আগের এক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছিল, গাজা যুদ্ধের পর ইসলামবিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। সেখানে গবেষক জন এসপোসিতো মত দেন, মুসলিম ও আরব জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা হলে তা ইসলামবিদ্বেষকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে হামাস ও আইএসের মতো সম্পূর্ণ ভিন্ন সংগঠনকে একই ধরনের কাঠামোয় দেখানোর প্রবণতা জনমনে মুসলিমদের সম্পর্কে অতিরঞ্জিত নিরাপত্তা-ভীতি তৈরি করতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ইসরাইলের ‘হাসবারা’ বা আন্তর্জাতিক জনমত প্রভাবিত করার প্রচারণা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। ইসরাইলি সরকার ও তার সমর্থকেরা সাধারণত দেশের নিরাপত্তা, অস্তিত্বের অধিকার এবং ইহুদিদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের বিষয়কে সামনে রেখে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে থাকে। সমালোচকদের অভিযোগ, এই প্রচারণার কিছু অংশে ইসরাইলের সমালোচনা এবং ইহুদিবিদ্বেষকে এক করে দেখানোর প্রবণতা দেখা যায়। এতে গাজা যুদ্ধ, ফিলিস্তিনি অধিকার এবং ইসরাইলি সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বৈধ রাজনৈতিক বিতর্কও কখনো কখনো অন্যভাবে উপস্থাপিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
সাম্প্রতিক সময়ে নেতানিয়াহুর নিজস্ব বক্তব্যও এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। আগস্টে ব্রিটেনকে ব্যঙ্গ করে তিনি দেশটিকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং ব্রিটেনে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়কে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করেন। বক্তব্যটি ব্রিটিশ রাজনীতিতে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। যুক্তরাজ্য সরকার ওই মন্তব্যকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করে। সমালোচকেরা এটিকে মুসলিমদের নিয়ে প্রচলিত কট্টর ডানপন্থি ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্যের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন।
এ ধরনের বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রভাব শুধু ইসরাইল ও ফিলিস্তিন প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কোনো দেশের মুসলিম নাগরিকদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে যদি জাতীয় নিরাপত্তার সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে তা সমাজে অবিশ্বাস ও বিভাজন বাড়াতে পারে। বিশেষ করে অভিবাসন ও ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে আগে থেকেই উত্তেজনা থাকা দেশগুলোতে এমন বক্তব্য রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও গভীর করতে পারে।
তবে ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে পশ্চিমা সমাজে প্রতিরোধও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মুসলিম নাগরিকেরা স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমানভাবে অংশ নিচ্ছেন। বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে মুসলিম জনপ্রতিনিধিদের নির্বাচনী সাফল্য দেখিয়েছে যে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে একমাত্রিক রাজনৈতিক বয়ান সবসময় জনগণের সমর্থন পায় না। একই সঙ্গে ইহুদিবিদ্বেষ, ইসলামবিদ্বেষ এবং সব ধরনের ধর্মীয় বিদ্বেষের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠনও কাজ করছে।
ইসরাইলের সঙ্গে ইউরোপের কট্টর ডানপন্থি শক্তির ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি তাই আরও বিস্তৃত একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে কট্টর ডানপন্থি দলগুলো অভিবাসন ও মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের মাধ্যমে নিজেদের ভোটব্যাংক শক্তিশালী করতে চাইছে। অন্যদিকে ইসরাইল এসব শক্তির সমর্থনকে নিজেদের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য কাজে লাগাতে চাইছে বলে বিশ্লেষকদের একাংশের মত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইলের কয়েকজন রাজনীতিক ইউরোপের ডানপন্থি ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির বিষয়ে প্রকাশ্যেই আগ্রহ দেখিয়েছেন।
কিন্তু এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে ইসরাইলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। গাজায় বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ, যুদ্ধের মানবিক মূল্য এবং ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্ক কেবল ইসলামবিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিয়ে আড়াল করা সম্ভব নয়। বরং মুসলিম জনগোষ্ঠীকে একটি নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করলে ইসরাইলের বিরুদ্ধে সমালোচনা আরও তীব্র হতে পারে এবং পশ্চিমা সমাজের অভ্যন্তরেও বিভাজন বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে ইসলামবিদ্বেষ এবং ইহুদিবিদ্বেষ—দুই ধরনের বিদ্বেষকেই আলাদা ও স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করা জরুরি। কোনো রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করা যেমন স্বাভাবিক রাজনৈতিক অধিকার, তেমনি সেই সমালোচনার কারণে কোনো ধর্মীয় বা জাতিগত জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোও গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে ইসরাইলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ এবং ইহুদি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ—এ দুটি বিষয়কেও এক করে দেখা উচিত নয়।
শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা সমাজে ইসরাইলের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে শুধু রাজনৈতিক মিত্রতার ওপর নয়, বরং গাজা ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে দেশটির নীতি কীভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে তার ওপরও। ভয় ও বিভাজনের রাজনীতি হয়তো স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক সমর্থন সংগঠিত করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা সামাজিক সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করে। ফলে ইসরাইলের জন্য আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের টেকসই পথ হতে পারে স্বচ্ছ কূটনীতি, মানবাধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ফিলিস্তিন সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের দিকে অগ্রসর হওয়া। আর পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হলো বিদেশি প্রচারণা ও রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি নিজেদের বহুত্ববাদ, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক সহাবস্থানের মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ন রাখা।