প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম, বিপুল খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সংকটে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংককে ঘুরে দাঁড় করাতে নতুন রোডম্যাপ দিয়েছে সরকার। ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ থেকে নগদ অর্থ আদায়, নতুন ঋণ বিতরণে কঠোর সতর্কতা এবং ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্প বা সিএমএসএমই খাতে ব্যাংকটির ঐতিহাসিক ভূমিকা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার একটি বিশেষ বৈঠকে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ব্যাংকটি সংকট কাটিয়ে উঠতে গিয়ে নতুন করে এমন ঋণ বিতরণ করতে পারবে না, যা ভবিষ্যতে আবারও খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দেয়।
বেসিক ব্যাংকের বর্তমান সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের অনিয়মের ইতিহাস রয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণে বড় ধরনের অনিয়ম ও নিয়মবহির্ভূত অর্থায়নের অভিযোগ ওঠে। ওই সময়ে বিতরণ করা ঋণের বড় অংশ পরবর্তী সময়ে খেলাপিতে পরিণত হয়। এর ফলে ব্যাংকের সম্পদের মান দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে মূলধন ঘাটতি তৈরি হয়। আমানতকারীদের আস্থা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়। পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকের স্বাভাবিক ঋণ কার্যক্রমও অনেকটা সংকুচিত হয়ে পড়ে।
বর্তমানে ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় সমস্যা উচ্চ খেলাপি ঋণ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত প্রায় ৫৬ শতাংশে পৌঁছেছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে এ হার অন্যতম বেশি। ফলে ব্যাংকটির জন্য শুধু নতুন ব্যবসা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; পুরোনো ঋণ থেকে প্রকৃত অর্থ ফেরত আনা এবং সম্পদের মান উন্নত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ তাই খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে হিসাবগত সমন্বয়ের পরিবর্তে সরাসরি নগদ অর্থ পুনরুদ্ধারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। শুধু ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন বা রাইট-অফের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখানোকে যথেষ্ট মনে করা হচ্ছে না। বরং প্রকৃত অর্থ আদায় করে ব্যাংকের নগদ প্রবাহ শক্তিশালী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বড় খেলাপি হিসাবগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পৃথকভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
ব্যাংকটির জন্য নতুন ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বড় ঋণের প্রস্তাব অনুমোদনের আগে ঋণগ্রহীতার প্রকৃত পরিশোধ সক্ষমতা, ব্যবসার নগদ প্রবাহ, একই গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যাংকের মোট ঋণ বা এক্সপোজার, প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানা এবং জামানতের বাস্তব বাজারমূল্য যাচাই করতে হবে। কোনো একটি ব্যক্তি, ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বা খাতে অতিরিক্ত ঋণ কেন্দ্রীভূত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে বলা হয়েছে।
বিশেষ করে সিএমএসএমই খাতে ঋণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে পরিমাণের চেয়ে গুণগত মানকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার সময় ব্যবসার প্রকৃত আয়, নগদ প্রবাহ এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে, ঋণ দেওয়ার পর সেটি যথাযথ খাতে ব্যবহার হচ্ছে কি না। সরকারের লক্ষ্য, বেসিক ব্যাংক যেন ভবিষ্যতে দ্রুত ঋণ বিতরণের প্রতিযোগিতায় না গিয়ে মানসম্মত ও উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নের মাধ্যমে টেকসই ব্যবসা গড়ে তোলে।
প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় বেসিক ব্যাংক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, শিল্পায়ন এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নের জন্য বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছিল। সরকারের নতুন পরিকল্পনায় ব্যাংকটিকে আবার সেই মূল পরিচয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র শিল্প, উৎপাদনশীল ব্যবসা এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে এমন উদ্যোগে অর্থায়ন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে ব্যাংকের ব্যবসা সম্প্রসারণ হবে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখবে বেসিক ব্যাংক।
তবে নতুন ব্যবসা বাড়ানোর আগে ব্যাংকের পুরোনো আর্থিক ক্ষত সারানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। আমানত বৃদ্ধির পাশাপাশি সেই আমানতকে লাভজনক ও নিরাপদ সম্পদে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরিচালন লোকসান কমানো, ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো এবং ব্যাংকের নিজস্ব আয় বৃদ্ধি করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অ-কোর সম্পদ বিক্রি করে মূলধন শক্তিশালী করার সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
মূলধন ঘাটতি বেসিক ব্যাংকের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা। এ কারণে ব্যাংকটিকে একটি বাস্তবসম্মত ক্যাপিটাল রেস্টোরেশন প্ল্যান তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় প্রভিশন ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, নিজস্ব আয় বাড়ানো এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর মাধ্যমে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হবে। সরকারের লক্ষ্য, দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকটিকে শুধু সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না রেখে নিজস্ব সক্ষমতায় ঘুরে দাঁড়ানোর অবস্থানে নিয়ে যাওয়া।
মানবসম্পদের দক্ষ ব্যবহারের বিষয়টিও সরকারের রোডম্যাপে গুরুত্ব পেয়েছে। যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের ক্রেডিট ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন ও পদোন্নতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী সিএমএসএমই এবং ঋণ আদায়কারী দল গড়ে তোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কারণ, ব্যাংকের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় দক্ষ জনবলকে সঠিক জায়গায় কাজে লাগানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করার ওপরও জোর দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। অতীতে যেসব দুর্বলতার কারণে অনিয়মিত ঋণ বিতরণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, ভবিষ্যতে যেন সেসব পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঋণ অনুমোদন থেকে শুরু করে বিতরণ এবং পরবর্তী পর্যায়ের তদারকি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
বেসিক ব্যাংকের ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনায় গ্রাহকদের আস্থা পুনর্গঠনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট ও অনিয়মের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে ব্যাংককে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও গ্রাহকবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নতির পাশাপাশি সুনাম পুনর্গঠন না হলে দীর্ঘমেয়াদে আমানত ও ব্যবসা সম্প্রসারণ কঠিন হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ পুনরুদ্ধার ও সংকটাপন্ন ব্যাংকের জন্য প্রযোজ্য বিভিন্ন সুবিধা যথাযথভাবে ব্যবহারের বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে এসব সুবিধাকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে না দেখে ব্যাংকের মৌলিক আর্থিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ সাময়িকভাবে হিসাবের চাপ কমানোর পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ আদায়, আয় বৃদ্ধি এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যাংকের ভিত্তি শক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বেসিক ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কামরুজ্জামান খান জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে ব্যাংকের আগামী দিনের কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে। তার বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, সরকারের দেওয়া নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি উন্নত করার চেষ্টা করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, বেসিক ব্যাংকের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে বিভিন্ন সময়ে সংস্কার ও পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল না আসার অন্যতম কারণ ছিল দুর্বল বাস্তবায়ন, ঋণ আদায়ে ধীরগতি এবং ব্যবস্থাপনার ঘাটতি। এবার যদি বড় খেলাপিদের কাছ থেকে প্রকৃত অর্থ উদ্ধার, নতুন খেলাপি প্রতিরোধ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা যায়, তাহলে ব্যাংকটির ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বেসিক ব্যাংকের জন্য আগামী ১২ থেকে ২৪ মাস তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে পুরোনো খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন ঘাটতি কমানো, পরিচালন লোকসান নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত ঋণ বৃদ্ধি এবং গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠনে কতটা অগ্রগতি হয়, তার ওপর ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে বেসিক ব্যাংকের পুনরুদ্ধার শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বাস্থ্যের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমানতকারীর আস্থা, সরকারি অর্থের সুরক্ষা এবং দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের ভবিষ্যৎও। ফলে নতুন রোডম্যাপ বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিই হতে পারে সংকট থেকে বেসিক ব্যাংকের টেকসই উত্তরণের প্রধান শর্ত।