প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার আগে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার বাদ জুমা রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের চন্দ্রিমা উদ্যানে অবস্থিত জিয়া উদ্যানে গিয়ে তিনি দুই নেতার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে তাঁদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর শপথের আগে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে মির্জা ফখরুলের এই শ্রদ্ধা নিবেদন বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস ও তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে আবেগঘনভাবে যুক্ত একটি মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। দলটির নেতাকর্মীদের কাছেও জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ফলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাত্রা শুরুর আগে তাঁদের স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানানোর ঘটনাটি রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানিয়েছেন, বঙ্গভবনে শপথ নেওয়ার আগে জুমার নামাজ শেষে মির্জা ফখরুল জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে যান। সেখানে তিনি পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন, সুরা ফাতেহা পাঠ করেন এবং তাঁদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাতে অংশ নেন।
মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ২৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল অবসরপ্রাপ্ত অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। মোট ৩৪৩ জন সংসদ সদস্য ভোট দিয়েছেন। নির্বাচন শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন মির্জা ফখরুলকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিজয়ী ঘোষণা করেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও ব্যতিক্রমী। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি সংসদীয় ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন হলেও পরবর্তী কয়েকটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় রাষ্ট্রপতিরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এবারের নির্বাচনে দুই প্রার্থী থাকায় সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে ফল নির্ধারিত হয়েছে। মির্জা ফখরুলের ২৫৫ ভোটের বিপরীতে অলি আহমদ ৮৮ ভোট পাওয়ায় নির্বাচনের ফল স্পষ্ট ব্যবধানে নির্ধারিত হয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে মির্জা ফখরুল বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার পর তিনি দলীয় পদ থেকে সরে দাঁড়ান। একই সঙ্গে তিনি সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে থাকা এই রাজনীতিক এবার রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে নতুন দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।
বঙ্গভবনে শপথ নেওয়ার আগে তাঁর জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে যাওয়ার বিষয়টি তাই রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। জিয়াউর রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং দলটির রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান প্রতীক। অন্যদিকে খালেদা জিয়া দলটির দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন এবং বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। মির্জা ফখরুল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি সময় বিএনপির এই দুই শীর্ষ নেতার নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
চন্দ্রিমা উদ্যানে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় মির্জা ফখরুল তাঁদের রাজনৈতিক অবদান স্মরণ করেন এবং দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন। শপথের কয়েক ঘণ্টা আগে এই আনুষ্ঠানিকতা তাঁর রাজনৈতিক অতীত থেকে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বে প্রবেশের মধ্যকার একটি প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত থাকার কথা থাকলেও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ের আগেই রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হয়। এরপর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজন দেখা দেয়।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে মির্জা ফখরুল দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনের প্রজ্ঞাপনেও তাঁকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে জারি করা ওই প্রজ্ঞাপনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ঘোষণার ভিত্তিতে তাঁর নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে তাঁর শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে। নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেবেন। শপথ অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে তাঁর আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব শুরু হবে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের সামনে এখন নতুন ধরনের দায়িত্ব ও প্রত্যাশা রয়েছে। দীর্ঘদিনের দলীয় রাজনীতি থেকে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক পদে আসার ফলে তাঁকে দলীয় রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের ভূমিকা নিতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়েছে। সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর হাতে নির্বাহী ক্ষমতার বড় অংশ থাকলেও রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিকতা ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত।
তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনে কীভাবে প্রভাব ফেলবে, সেটিও এখন আলোচনার বিষয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে বিএনপির জন্য মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসেও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। দলের মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘদিন মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা একজন নেতা এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসতে যাচ্ছেন। এতে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধরন যেমন বদলাবে, তেমনি বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোতেও নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার যাত্রার একটি আবেগঘন অধ্যায় শেষ হয়েছে। এখন তাঁর সামনে অপেক্ষা করছে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের নতুন অধ্যায়। দলীয় রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা পেছনে রেখে সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকদের প্রতি দায়িত্বকে সামনে রেখে তাঁকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে হবে।
শপথের আগে দুই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতার সমাধিতে তাঁর শ্রদ্ধা নিবেদন তাই একদিকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্মৃতির প্রকাশ, অন্যদিকে নতুন সাংবিধানিক দায়িত্ব গ্রহণের আগে একটি প্রতীকী পদক্ষেপ। চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে বঙ্গভবনের পথে এই যাত্রা বাংলাদেশের রাজনীতির একজন অভিজ্ঞ নেতার জন্য যেমন নতুন অধ্যায়ের সূচনা, তেমনি দেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জন্যও একটি নতুন পর্বের শুরু।