প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গুগলের ওয়েব ও অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ফায়ারবেস ব্যবহার করে অনলাইন প্রতারণা, ম্যালওয়্যার ছড়ানো এবং মানুষের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত। দেশটির সাইবার অপরাধ দমনকারী সংস্থা ইন্ডিয়ান সাইবার ক্রাইম কো-অর্ডিনেশন সেন্টার বা আই৪সি গুগলকে ফায়ারবেসে থাকা সন্দেহজনক একাধিক অ্যাকাউন্ট, ওয়েবসাইট ও ডেটাবেস বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতারকরা বৈধ ডিজিটাল সেবার আড়ালে কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, এই ঘটনা তারই একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি আগস্ট মাসেই গুগলের কাছে অন্তত তিনটি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এসব নোটিশে ফায়ারবেসে হোস্ট করা অন্তত ৫৭টি ওয়েবসাইট ও ডেটাবেস সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এসব ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যবহার করে ম্যালওয়্যার ছড়ানো, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং আর্থিক প্রতারণা চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্তকারীদের নজরে এসেছে, প্রতারকরা আগের মতো শুধু সাধারণ বা অল্প খরচের ওয়েব টুলের ওপর নির্ভর করছে না; বরং পরিচিত ও বৈধ ক্লাউডভিত্তিক সেবা ব্যবহার করে নিজেদের কার্যক্রমকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে।
ফায়ারবেস মূলত ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ তৈরি, ডেটা সংরক্ষণ, ব্যবহারকারীর তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন অনলাইন সেবা পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত একটি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম। বৈধ ডেভেলপারদের জন্য এসব সুবিধা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একই অবকাঠামো অপব্যবহার করলে সাইবার অপরাধীরাও সুবিধা নিতে পারে। প্রতারকরা এ ধরনের বৈধ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের তৈরি ওয়েবসাইট বা অ্যাপকে সাধারণ ব্যবহারকারীর কাছে তুলনামূলকভাবে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে সক্ষম হচ্ছে।
আই৪সির একটি নোটিশে বলা হয়েছে, প্রতারকরা বৈধ ব্যাংকিং সেবার আদলে অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ তৈরি করছিল। বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে নতুন কার্ড, পুরস্কার, বিশেষ সুবিধা কিংবা ক্রেডিট সীমা বাড়ানোর মতো আকর্ষণীয় অফার দেখানো হতো। এসব প্রলোভনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের নির্দিষ্ট অ্যাপ ডাউনলোড ও ইনস্টল করতে উৎসাহিত করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে একটি সাধারণ অফার বা সুবিধা পাওয়ার আশায় ব্যবহারকারী নিজের অজান্তেই ক্ষতিকর সফটওয়্যার ফোনে ইনস্টল করে ফেলতে পারেন।
কর্তৃপক্ষের নির্দেশ দেওয়া ৫৭টি ওয়েবসাইট ও ডেটাবেসের মধ্যে অন্তত সাতটি ছিল ফিশিং পেজ। এসব পেজ দেখতে ভারতের কয়েকটি পরিচিত ব্যাংকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের মতো করে তৈরি করা হয়েছিল। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, আইসিআইসিআই ব্যাংক ও অ্যাক্সিস ব্যাংকের নাম ও পরিচিতি ব্যবহার করে গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। কোনো ব্যবহারকারী এসব নকল ওয়েবসাইটে ঢুকে ব্যাংকিং বা কার্ডসংক্রান্ত তথ্য দিলে তা সরাসরি প্রতারকদের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
শুধু ওয়েবসাইট তৈরি করেই থেমে থাকেনি প্রতারকরা। তদন্তে এমন কিছু সাইটের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলো মূলত ভুক্তভোগীদের ফোন থেকে সংগ্রহ করা তথ্য সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল। ক্রেডিট কার্ড নম্বর, বিভিন্ন পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য এবং ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড বা ওটিপির মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও এসব অবৈধ ব্যবস্থার মাধ্যমে সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়েছে। আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ওটিপি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় এ ধরনের তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হলে ব্যবহারকারীর আর্থিক নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
প্রতারকরা শুধু ব্যাংকিং সেবার নাম ব্যবহার করেই মানুষকে টার্গেট করেনি। সরকারি প্রকল্পের নামও তাদের প্রতারণার কৌশলের অংশ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধি বা পিএম-কিষান প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের লক্ষ্য করে কিছু ওয়েবসাইটে অর্থ পাওয়ার সুযোগ বা সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এরপর ব্যবহারকারীদের একটি অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলা হতো। সরকারি প্রকল্পের নাম থাকায় অনেক মানুষ এসব বার্তাকে সত্য বলে মনে করতে পারেন এবং সতর্কতা ছাড়াই নির্দেশনা অনুসরণ করার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ক্ষতিকর অ্যাপটি ফোনে ইনস্টল করার পর ব্যবহারকারীর বিভিন্ন তথ্য প্রতারকদের নিয়ন্ত্রিত ফায়ারবেস ডেটাবেসে পাঠানোর ব্যবস্থা ছিল বলে তদন্তে জানা গেছে। এর ফলে শুধু নির্দিষ্ট একটি তথ্য নয়, ফোনে থাকা অন্যান্য অ্যাপ, ব্যক্তিগত ডেটা এবং সংবেদনশীল তথ্যেও অননুমোদিত প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে। সাইবার নিরাপত্তা গবেষকদের কাছে এ ধরনের ম্যালওয়্যারকে ‘অ্যান্ড্রয়েড গড মোড’ নামে উল্লেখ করা হয়। নামটি থেকেই বোঝা যায়, এ ধরনের ক্ষতিকর সফটওয়্যার আক্রান্ত ডিভাইসের ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ফায়ারবেসের মতো বৈধ প্রযুক্তি অবকাঠামো কীভাবে সাইবার অপরাধের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। কোনো প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম নিজে প্রতারণার মাধ্যম না হলেও তার সুবিধা অপব্যবহার করে অপরাধীরা মানুষের কাছে পৌঁছানোর নতুন পথ তৈরি করতে পারে। এ কারণে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্ত করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে তথ্য বিনিময় এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
গুগল জানিয়েছে, ফিশিং, ম্যালওয়্যার ও আর্থিক প্রতারণার জন্য তাদের সেবা ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযোগ পর্যালোচনা করা হয় এবং নীতিমালা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ফলে ফায়ারবেস ব্যবহার করে সংঘটিত প্রতারণার ঘটনায় প্ল্যাটফর্মটির বৈধ ব্যবহারকারীদের কার্যক্রম এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারতে অনলাইন প্রতারণার সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে কথিত সাইবার প্রতারণার কারণে প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির ঘটনা সামনে এসেছে। একই সময়ে দেশটিতে ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণও দ্রুত বেড়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে ভারতের রিয়েল-টাইম পেমেন্ট ব্যবস্থায় প্রায় ২৪২ বিলিয়ন ডিজিটাল লেনদেন হয়েছে। ডিজিটাল লেনদেন যত বাড়ছে, ততই প্রতারকদের জন্য বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ওপর নির্ভর করলেই অনলাইন প্রতারণা ঠেকানো সম্ভব নয়। ব্যবহারকারীদেরও অচেনা লিংক, আকর্ষণীয় আর্থিক অফার, সরকারি সুবিধার নামে অজানা অ্যাপ এবং ব্যাংকিং তথ্য চাওয়ার মতো বিষয়গুলোতে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ব্যাংক বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা হয়েছে বলেই একটি ওয়েবসাইট বা অ্যাপ বৈধ—এমন ধারণা বিপজ্জনক হতে পারে।
ফায়ারবেসকে কেন্দ্র করে ভারতের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ তাই শুধু কয়েকটি ওয়েবসাইট বা অ্যাকাউন্ট বন্ধের ঘটনা নয়; বরং দ্রুত পরিবর্তনশীল সাইবার প্রতারণার ধরন সম্পর্কে একটি বড় সতর্কবার্তাও। প্রযুক্তির সুবিধা যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করছে, তেমনি একই সুবিধাকে অপরাধীরা ব্যবহার করছে মানুষের আস্থা, অর্থ ও ব্যক্তিগত তথ্যের বিরুদ্ধে। ফলে ভবিষ্যতে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, সরকার, ব্যাংক এবং ব্যবহারকারী—সব পক্ষের সমন্বিত সচেতনতা ও দ্রুত পদক্ষেপ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।