প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংসি ঝুয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে টাইফুন মায়সাকের প্রভাবে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৫৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় আরও ১০ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। শুক্রবার স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাতে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, জুলাইয়ের শুরুতে আঘাত হানা টাইফুনটির কারণে সৃষ্ট অস্বাভাবিক ও দীর্ঘস্থায়ী ভারী বৃষ্টিপাত থেকে এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়।
বন্যার প্রায় ছয় সপ্তাহ পর নতুন করে প্রাণহানির সংখ্যা প্রকাশ করায় ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর আগে জুলাইয়ে দুর্যোগের সময় গুয়াংসি অঞ্চলে ৩৯ জনের মৃত্যুর খবর প্রকাশ করা হয়েছিল। পরে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ এবং যাচাই শেষে মৃতের সংখ্যা এক লাফে ১৫৯ জনে পৌঁছানোর তথ্য সামনে আসে। তবে আগের হিসাবের তুলনায় এত বড় পরিবর্তনের নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, ২১ আগস্ট শুক্রবার রাত ১২টা পর্যন্ত নাননিং ও গুইগাং শহরের ১৬টি কাউন্টি, শহর ও জেলার ১৬ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দুই শহরেই এখন জরুরি উদ্ধারপর্ব পেরিয়ে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
টাইফুন মায়সাকের প্রভাবে জুলাইয়ের প্রথম দিকে গুয়াংসিতে ইতিহাসে বিরল মাত্রার বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী ভারী বৃষ্টিপাত হয়। টানা বৃষ্টিতে নদী ও জলাধারের পানি দ্রুত বেড়ে যায়। কয়েকটি এলাকায় বাঁধ ও জলাধারসংক্রান্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। কোথাও কোথাও জলাধারের পানি উপচে পড়া এবং বাঁধের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে হঠাৎ বন্যার সৃষ্টি হয়। এতে বসতবাড়ি, সড়ক, কৃষিজমি ও স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক চাপ পড়ে।
দুর্যোগের প্রাথমিক পর্যায়েই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছিল। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে গুয়াংসি অঞ্চলে লাখো মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। উদ্ধারকারী দল, সামরিক বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও বিভিন্ন জরুরি সেবার কর্মীরা প্লাবিত এলাকায় কাজ করেন। অনেক জায়গায় পানির প্রবল স্রোত এবং যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার তৎপরতা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
নাননিং ও গুইগাং ছিল দুর্যোগের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে। নাননিং শহরের বেশ কয়েকটি এলাকায় জলাধার ও বাঁধসংক্রান্ত পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। জুলাইয়ের শুরুতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, শহরটির বিভিন্ন অংশে বন্যার পানি দ্রুত বাড়ছিল এবং হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে।
বিশেষ করে নাননিংয়ের হেংঝোউ এলাকায় একটি জলাধারের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঘটনা বড় বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে। তীব্র স্রোতে নিচের দিকে থাকা এলাকায় পানি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ওই এলাকার একটি সাপের খামারও বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শত শত সাপ পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য নতুন ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছিল। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পরও উদ্ধার ও পুনর্গঠনকাজের পাশাপাশি এসব ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হয়েছে স্থানীয় প্রশাসনকে।
গুয়াংসির দুর্যোগের ভয়াবহতা শুধু প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিপুলসংখ্যক মানুষকে সাময়িকভাবে ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়েছে। অনেক পরিবারের বসতবাড়ি, জীবিকা ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা ও স্থানীয় অবকাঠামোর ওপরও ব্যাপক প্রভাব পড়ে। পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে কাদা, ধ্বংসাবশেষ ও দূষিত পানি সরিয়ে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়।
দুর্যোগের কয়েক সপ্তাহ পর এখন পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পুনর্গঠনের দিকে এগোচ্ছে। নাননিং ও গুইগাংয়ে অনুষ্ঠিত পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনবিষয়ক বৈঠকে ক্ষয়ক্ষতির নতুন হিসাব পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব বৈঠক থেকেই ১৫৯ জন নিহত এবং ১০ জন নিখোঁজ থাকার নতুন তথ্য সামনে এসেছে। দুই শহর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন তাদের মূল লক্ষ্য ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসন, অবকাঠামো মেরামত এবং দুর্যোগের পর স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা।
এই বন্যা চীনের দক্ষিণাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান চরম আবহাওয়ার ঝুঁকির কথাও নতুন করে সামনে এনেছে। জুলাইয়ের শুরুতে গুয়াংসিতে অনেক এলাকায় অস্বাভাবিক মাত্রার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। কিছু এলাকায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিপুল পরিমাণ বৃষ্টি হয়, যার ফলে নদী ও জলাধারের পানি দ্রুত বেড়ে যায়। অতিবৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ি এলাকার ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা এবং বাঁধের ওপর অতিরিক্ত চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
চীনের মতো বিশাল ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এমন দুর্যোগের মানবিক প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক। একটি পরিবারের কাছে বন্যা শুধু কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের পানিবন্দিত্ব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ঘর হারানো, জীবিকার ক্ষতি, প্রিয়জনকে হারানোর শোক এবং দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা। দুর্যোগের পানি নেমে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনে স্বাভাবিকতা ফিরতে অনেক সময় প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে যারা পরিবার বা আয়ের প্রধান সদস্যকে হারিয়েছেন, তাদের জন্য পুনর্গঠনপর্ব আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক ঘটনায় নিখোঁজ ১০ জনের সন্ধানও এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক বিষয়। নিখোঁজদের পরিবারের জন্য উদ্ধার ও অনুসন্ধান কার্যক্রমের প্রতিটি দিন অনিশ্চয়তার। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রাণহানির চূড়ান্ত হিসাব নির্ধারণের পাশাপাশি নিখোঁজদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় চীনের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও উদ্ধারকারী বাহিনী ব্যাপকভাবে কাজ করেছে। জরুরি উদ্ধার থেকে শুরু করে খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা এবং পরবর্তী পুনর্গঠন—সব ক্ষেত্রেই বড় পরিসরে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জুলাইয়ের প্রথম দিকে হাজার হাজার উদ্ধারকর্মী ও বিপুলসংখ্যক নৌযান উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছিল।
তবে ১৫৯ জনের মৃত্যুর নতুন হিসাব এই দুর্যোগের গভীরতা সম্পর্কে আগের ধারণাকে আরও বদলে দিয়েছে। এক মাসের বেশি সময় পর প্রাণহানির সংখ্যা এতটা বেড়ে যাওয়ায় দুর্যোগ-পরবর্তী তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব তৈরির গুরুত্বও সামনে এসেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন চরম আবহাওয়ার ঘটনা মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, বাঁধ ও জলাধারের নিরাপত্তা এবং দ্রুত মানুষ সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।
এখন গুয়াংসির ক্ষতিগ্রস্ত নাননিং ও গুইগাং ধীরে ধীরে পুনর্গঠনের পথে এগোচ্ছে। ভেঙে পড়া অবকাঠামো মেরামত, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘরবাড়ি ও জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ—এসব কাজ সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। ভয়াবহ বন্যায় ১৫৯ প্রাণহানি ও ১০ জনের নিখোঁজ থাকার ঘটনা শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিসংখ্যান নয়; এটি বহু পরিবারের জীবনে নেমে আসা এক গভীর মানবিক বিপর্যয়ের স্মারক হয়ে থাকবে।