মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ল মার্কিন রণতরি আব্রাহাম লিংকন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার
মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ল মার্কিন রণতরি আব্রাহাম লিংকন

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের পথে যাত্রা করেছে। প্রায় পাঁচ হাজার নাবিক ও ক্রু সদস্য নিয়ে রণতরিটি বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগোর উদ্দেশে রওনা হয়। প্রায় নয় মাস ধরে চলা দীর্ঘ সামরিক মোতায়েন শেষে তাদের দেশে ফেরার এই যাত্রা শুরু হলো।

আব্রাহাম লিংকনের মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত রাখতে জাপানে মোতায়েন থাকা বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন ওই অঞ্চলে পৌঁছেছে। ফলে একটি রণতরির দীর্ঘ দায়িত্ব শেষে প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি রণতরির আগমন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান অব্যাহত রাখার বিষয়টিও স্পষ্ট করেছে।

আব্রাহাম লিংকনের বিদায়ের ইঙ্গিত আগে থেকেই পাওয়া যাচ্ছিল। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার সম্প্রতি একটি মতামতধর্মী লেখায় রণতরিটির দীর্ঘ মিশনের প্রশংসা করে নাবিকদের উদ্দেশে শুভযাত্রার বার্তা দেন। তিনি তাঁদের দ্রুত প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। এর পরই রণতরিটির মধ্যপ্রাচ্য ত্যাগের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

গত বছরের ২১ নভেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো থেকে আব্রাহাম লিংকন যাত্রা শুরু করেছিল। এরপর টানা ২৭২ দিনের দীর্ঘ সময়ের মধ্যে রণতরিটি সমুদ্রে চলমান দায়িত্ব থেকে মাত্র দুবার বিরতি নেয়। একবার ডিসেম্বরে গুয়ামে অল্প সময়ের জন্য অবস্থান করে এবং অন্যবার ওমানে রসদ সংগ্রহের জন্য থামে। দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রে অবস্থান করে সামরিক অভিযান পরিচালনার কারণে জাহাজটির নাবিকদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপও তৈরি হয়েছে।

একটি বিমানবাহী রণতরি শুধু যুদ্ধবিমান বহনকারী একটি বিশাল জাহাজ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে কয়েক হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবন, খাদ্য, পানি, চিকিৎসা, বিশ্রাম, যোগাযোগ ও নিরাপত্তার বিশাল ব্যবস্থা। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান করলে এসব ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়তে থাকে। আব্রাহাম লিংকনের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ মিশনের শেষ পর্যায়ে নাবিকদের জীবনযাত্রার মান নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা সামনে এসেছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে রণতরিটিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি, পানিদূষণ, পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার সমস্যা এবং নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির মতো বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। মার্কিন ডেমোক্রেটিক পার্টির কয়েকজন আইনপ্রণেতাও এসব সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁদের বক্তব্যে দীর্ঘ সময়ের সামরিক মোতায়েনের কারণে নাবিকদের জীবনযাত্রা কতটা কঠিন হয়ে উঠেছিল, সেই চিত্র সামনে এসেছে।

ইরানের হামলায় বাহরাইনের মানামায় মার্কিন নৌবাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সরবরাহব্যবস্থায়ও সংকট তৈরি হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ঘাঁটি মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক ও সরবরাহকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ফলে ঘাঁটিটির ক্ষয়ক্ষতির প্রভাব শুধু স্থলভিত্তিক সামরিক কার্যক্রমে নয়, সমুদ্রে থাকা মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর সরবরাহ ব্যবস্থাতেও পড়েছিল।

তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার এসব সমস্যার অনেকগুলোকে পুরোনো সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সামরিক কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ মিশনের সময় নাবিকদের জন্য তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে কিছুটা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। ফলে রণতরিটির দীর্ঘ মোতায়েনের শেষ পর্যায়ে নাবিকদের জীবনযাত্রা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা এখনও গুরুত্ব বহন করছে।

আব্রাহাম লিংকনের দেশে ফেরার যাত্রা অবশ্য খুব দ্রুত শেষ হবে না। রণতরিটিকে প্রায় ১৩ হাজার মাইল সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে হবে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই যাত্রায় চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ দীর্ঘ সামরিক মিশন শেষ হলেও নাবিকদের জন্য আরও কয়েক সপ্তাহ সমুদ্রেই কাটাতে হবে। তবে এবার তাঁদের গন্তব্য যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি কোনো সামরিক অঞ্চল নয়, বরং নিজ দেশ ও পরিবারের কাছে ফেরা।

নাবিকদের অনেকেই গত বছরের নভেম্বরের পর থেকে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে দীর্ঘ সময় দূরে রয়েছেন। তাঁদের জন্য দেশে ফেরার এই যাত্রা তাই সামরিক দায়িত্বের পাশাপাশি গভীর মানবিক অনুভূতিরও বিষয়। দীর্ঘদিন সন্তান, বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী কিংবা অন্য প্রিয়জনদের কাছ থেকে দূরে থাকা নাবিকদের কাছে দেশে ফেরার প্রতিটি মাইল নতুন প্রত্যাশা তৈরি করবে। বিশেষ করে নয় মাসের টানা দায়িত্বের পর পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলন তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এদিকে আব্রাহাম লিংকনের জায়গায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখছে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন। জাপানে মোতায়েন থাকা এই বিমানবাহী রণতরি ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে এবং বুধবার থেকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের অধীন কার্যক্রম শুরু করেছে। এর ফলে আব্রাহাম লিংকনের প্রত্যাবর্তনের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরির উপস্থিতিতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়নি।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বর্তমানে বেশ বিস্তৃত। পারস্য উপসাগরের বাইরে অঞ্চলটিতে প্রায় ২০টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে বিমানবাহী রণতরিকে কেন্দ্র করে গঠিত দুটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ রয়েছে। এসব সমন্বিত যুদ্ধদলের মাধ্যমে বিমান হামলা, আকাশ প্রতিরক্ষা, সমুদ্র নিরাপত্তা এবং অন্যান্য সামরিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বজায় রাখা হয়।

এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের একটি অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপও রয়েছে, যার সঙ্গে একটি মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট যুক্ত। এ ধরনের বাহিনী সমুদ্র ও স্থল—দুই পরিবেশেই দ্রুত সামরিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা রাখে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল থাকায় এসব সামরিক ইউনিট যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

এ ছাড়া কয়েকটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারও ওই অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে। এসব যুদ্ধজাহাজ আকাশ ও সমুদ্রপথে নজরদারি, প্রতিরক্ষা এবং সামরিক অভিযানে সহায়তা করছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও সামরিক অবরোধমূলক পদক্ষেপ অব্যাহত থাকায় এসব জাহাজের উপস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে আলাদা গুরুত্ব বহন করছে।

আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ মিশন শেষ হওয়া এবং জর্জ ওয়াশিংটনের দায়িত্ব নেওয়া তাই কেবল একটি যুদ্ধজাহাজের পরিবর্তন নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কৌশলের ধারাবাহিকতারও একটি প্রতিফলন। একদিকে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা নাবিকদের দেশে ফেরানো হচ্ছে, অন্যদিকে একই ধরনের সক্ষমতা নিয়ে নতুন একটি রণতরি ওই অঞ্চলে দায়িত্ব গ্রহণ করছে।

ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি আগামী দিনেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকতে পারে। আব্রাহাম লিংকনের বিদায় সেই উপস্থিতির অবসান ঘটাচ্ছে না; বরং দীর্ঘ দায়িত্ব পালনের পর একটি সামরিক ইউনিটকে বিশ্রাম ও পুনর্গঠনের সুযোগ দিয়ে অন্য একটি ইউনিটের মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ধারাই বজায় থাকছে।

সবচেয়ে বড় মানবিক দিকটি হলো, প্রায় নয় মাস ধরে দায়িত্ব পালন করা হাজারো নাবিক অবশেষে ঘরে ফেরার পথে রয়েছেন। যুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনার খবরের আড়ালে থাকা এসব মানুষের জন্য এই যাত্রা দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানের প্রতীক। সমুদ্রপথে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে যখন তাঁরা সান দিয়েগো বন্দরে পৌঁছাবেন, তখন তাঁদের সামনে থাকবে পরিবার, পরিচিত পরিবেশ এবং দীর্ঘ সামরিক দায়িত্বের পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশা। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে তাঁদের জায়গা নেওয়া নতুন নৌবাহিনী ইউনিটের দায়িত্ব শুরু হবে এক ভিন্ন বাস্তবতায়, যেখানে যুদ্ধের উত্তেজনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত