এস্পির শেষ মুহূর্তের গোলে রিয়ালের নাটকীয় জয়

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৮ বার

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সময় তখন ৯০ মিনিট। এস্পানিওলের মাঠে স্কোরবোর্ডে ১-১ সমতা। দ্বিতীয় মেয়াদে রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে ফেরা হোসে মরিনহোর প্রথম লা লিগা ম্যাচটি ড্র দিয়েই শেষ হওয়ার অপেক্ষা। ঠিক তখনই দৃশ্যপটে এলেন বদলি হিসেবে নামা কার্লোস এস্পি। কিলিয়ান এমবাপ্পের আক্রমণ থেকে আলগা হয়ে যাওয়া বল নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ঠান্ডা মাথায় জালে পাঠালেন তরুণ স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড। মুহূর্তেই বদলে গেল ম্যাচের গল্প। ২-১ গোলের নাটকীয় জয়ে নতুন মৌসুম শুরু করল রিয়াল মাদ্রিদ।

শনিবার রাতে আরসিডিই স্টেডিয়ামে জয়টা শুধু রিয়ালের প্রথম তিন পয়েন্টের গল্প নয়। ১৩ বছর পর মাদ্রিদের ক্লাবটিতে ফিরে হোসে মরিনহোর নতুন অধ্যায়ের শুরুটাও হলো জয় দিয়ে। পর্তুগিজ কোচের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম লিগ ম্যাচে শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা যেন ফিরিয়ে আনল তার আগের সময়ের পরিচিত আবেগও।

ম্যাচের আগে অবশ্য প্রতিপক্ষ নিয়ে বেশ সতর্ক ছিলেন মরিনহো। এস্পানিওলকে ভালো দল হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানিয়েছিলেন, দীর্ঘ সময় একই কোচের অধীনে থাকা দলটির নির্দিষ্ট ছন্দ ও খেলার ধরন রয়েছে। প্রতিপক্ষের প্রাক-মৌসুম এবং লেভান্তের বিপক্ষে আগের ম্যাচও বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছিল রিয়াল।

মাঠে নেমে শুরুটা হয় মরিনহোর প্রত্যাশামতোই। মাত্র ৯ মিনিটে এগিয়ে যায় রিয়াল। ডান দিক থেকে আরদা গুলারের নেওয়া ফ্রি-কিকে মাথা ছুঁইয়ে বল জালে পাঠান জুড বেলিংহাম। এস্পানিওল গোলরক্ষক মার্কো দিমিত্রোভিচকে পরাস্ত করে ইংলিশ মিডফিল্ডার নতুন মৌসুমে রিয়ালের প্রথম লিগ গোলটি এনে দেন।

শুরুতেই গোল পাওয়ায় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ সহজে রিয়ালের হাতে চলে আসবে বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু নিজেদের মাঠে এস্পানিওল দ্রুতই ঘুরে দাঁড়ায়। তারা রিয়ালের তারকাবহুল আক্রমণভাগের সামনে নিজেদের গুটিয়ে না রেখে পাল্টা আক্রমণের সুযোগ খুঁজতে থাকে।

৩০ মিনিটে সেই প্রচেষ্টার ফল পায় স্বাগতিকরা। জাভি হার্নান্দেজের তৈরি করা সুযোগ থেকে অ্যালেক্স ক্যালাত্রাভা বল জালে পাঠিয়ে স্কোরলাইন ১-১ করেন। থিবো কোর্তোয়ার সামনে সুযোগটি কাজে লাগাতে ভুল করেননি এস্পানিওল মিডফিল্ডার।

সমতায় ফেরার পর ম্যাচ আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিলিয়ান এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে নিয়ে সাজানো রিয়ালের আক্রমণভাগ মাঝেমধ্যে বিপজ্জনক হয়ে উঠলেও প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি। বিশ্বকাপের পর দেরিতে ছুটি কাটিয়ে ফেরার প্রভাব দুই তারকার ছন্দে কিছুটা দেখা গেছে বলে ম্যাচ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে রয়টার্স।

প্রথমার্ধ শেষ হয় ১-১ সমতায়। বিরতির পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দিকে ফেরাতে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে রিয়াল।

দ্বিতীয়ার্ধের ৫৩ মিনিটে আবারও বেলিংহাম প্রায় গোল পেয়েছিলেন। গুলারের কর্নার থেকে তার হেড দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন দিমিত্রোভিচ। বল ক্রসবারে লাগায় হতাশ হতে হয় রিয়ালকে।

সময়ের সঙ্গে রিয়ালের ওপর চাপও বাড়ছিল। মরিনহোর প্রত্যাবর্তনের ম্যাচে পয়েন্ট হারানোর আশঙ্কা তখন ক্রমেই বাস্তব হয়ে উঠছিল। একদিকে এস্পানিওলের সংগঠিত প্রতিরোধ আর অন্যদিকে সুযোগ কাজে লাগাতে না পারা—দুইয়ে মিলে সফরকারীদের জন্য রাতটা কঠিন হয়ে ওঠে।

৭৮ মিনিটে আরও একবার গোলের খুব কাছে পৌঁছে যায় রিয়াল। ফেদেরিকো ভালভার্দের প্রচেষ্টা প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের শরীরে লেগে দিক পরিবর্তন করে পোস্টে আঘাত হানে। অল্পের জন্য দ্বিতীয় গোল পাওয়া হয়নি সফরকারীদের।

এর আগেই বেঞ্চের দিকে নজর দিয়েছিলেন মরিনহো। ৬৪ মিনিটে ইয়ান দিওমান্দে ও মার্ক কুকুরেয়াকে মাঠে নামান তিনি। ৮০ মিনিটে আরও তিনটি পরিবর্তন আসে। এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা, ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ড এবং কার্লোস এস্পিকে নামিয়ে শেষ দশ মিনিটে জয়ের জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন পর্তুগিজ কোচ।

মরিনহোর শেষ চালটিই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

বেলিংহামের বদলি হিসেবে ৮০ মিনিটে মাঠে নামা এস্পির হাতে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য ছিল মাত্র কয়েক মিনিট। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে লা লিগায় অভিষেকের রাত। সামনে বিশ্বের অন্যতম বড় ক্লাবের জার্সি এবং ম্যাচ তখন সমতায়। চাপ সামলে তরুণ ফরোয়ার্ড ঠিক সময়েই নিজের উপস্থিতি জানান দেন।

৯০ মিনিটে এমবাপ্পে বল নিয়ে এস্পানিওলের পেনাল্টি এলাকায় ঢুকে পড়েন। তার কাছ থেকে বল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর সেটি এসে পড়ে এস্পির সামনে। তরুণ স্ট্রাইকার দ্রুত বল নিজের ডান পায়ে নেন। গোলরক্ষক দিমিত্রোভিচকে পরাস্ত করে ফাঁকা জালে বল পাঠিয়ে দেন। ২-১।

গোলের সঙ্গে সঙ্গেই রিয়াল বেঞ্চে বিস্ফোরিত হয় উচ্ছ্বাস। মরিনহোও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। মুষ্টিবদ্ধ হাতের উদ্‌যাপনে স্বাগত জানান নিজের দ্বিতীয় মাদ্রিদ অধ্যায়ের প্রথম লিগ জয়কে।

কার্লোস এস্পির জন্য মুহূর্তটি আরও বিশেষ। চলতি গ্রীষ্মেই লেভান্তে থেকে তাকে দলে নিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। ২১ বছর বয়সী স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডের সঙ্গে ২০৩১ সাল পর্যন্ত চুক্তি করেছে ক্লাব। মরিনহোর সম্মতিতেই তার দলবদল সম্পন্ন হয়েছিল।

প্রাক-মৌসুমেও নিজের সামর্থ্যের আভাস দিয়েছিলেন এস্পি। সীমিত সময় মাঠে পেয়েও গোল করে মরিনহোর আস্থা অর্জন করেন তিনি। ফলে লিগের প্রথম ম্যাচেই কঠিন মুহূর্তে তরুণ ফরোয়ার্ডের ওপর ভরসা রাখেন কোচ। সেই আস্থার প্রতিদান দিতে তার প্রয়োজন হয়েছে মাত্র ১০ মিনিট।

রিয়ালের নতুন মৌসুমে আরও কয়েকটি নতুন মুখের আনুষ্ঠানিক যাত্রাও শুরু হয়েছে। গ্রীষ্মকালীন দলবদলে ক্লাবটি মার্ক কুকুরেয়া, ইব্রাহিমা কোনাটে, ডেনজেল ডামফ্রিজ, বার্নার্দো সিলভা, ইয়ান দিওমান্দে ও এস্পিকে দলে এনেছে। এস্পানিওলের বিপক্ষে ম্যাচের স্কোয়াডে নতুন খেলোয়াড়দের সবাইকে রেখেছিলেন মরিনহো।

এস্পানিওলের বিপক্ষে জয়টি রিয়ালের জন্য ২০২৬-২৭ লা লিগা মৌসুমের প্রথম ম্যাচ। ক্লাব বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলোয়াড় থাকা দলগুলোর প্রথম রাউন্ডের ম্যাচ স্থগিত হওয়ায় দ্বিতীয় রাউন্ড দিয়েই লিগ অভিযান শুরু করেছে মাদ্রিদের ক্লাবটি।

মরিনহোর জন্য অবশ্য এই প্রত্যাবর্তনের গল্প আরও পুরোনো। ২০১০ সালে প্রথমবার রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। সেই মেয়াদে লা লিগা, কোপা দেল রে ও স্প্যানিশ সুপার কাপ জেতানোর পর ২০১৩ সালে ক্লাব ছাড়েন পর্তুগিজ কোচ। এক যুগের বেশি সময় পর আবার সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর ডাগআউটে ফিরেছেন ‘স্পেশাল ওয়ান’।

দ্বিতীয় অধ্যায়ের শুরুতেই তার সামনে বড় প্রত্যাশা। গত দুই মৌসুমের লা লিগা চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনাকে সরিয়ে স্প্যানিশ ফুটবলে শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে দল সাজিয়েছে রিয়াল। নতুন খেলোয়াড়দের আগমন সেই পরিকল্পনারই অংশ।

তবে এস্পানিওলের বিপক্ষে জয় স্বস্তি দিলেও মরিনহোর সামনে কাজ বাকি থাকার ইঙ্গিতও মিলেছে। তারকাবহুল আক্রমণভাগ পুরো ম্যাচে প্রত্যাশিত আধিপত্য দেখাতে পারেনি। রক্ষণেও কয়েকবার জায়গা তৈরি করে দিয়েছিল রিয়াল। স্বাগতিকদের সমতাসূচক গোল সেই দুর্বলতারই একটি উদাহরণ।

ম্যাচ শেষে মরিনহো দলের লড়াই করার মানসিকতা এবং বদলি খেলোয়াড়দের ক্ষুধার প্রশংসা করেন। বিশেষ করে বেঞ্চ থেকে এসে এস্পির তাৎক্ষণিক প্রভাব তার পরিকল্পনার সফলতার বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে বেলিংহাম ও গুলারের পারফরম্যান্সও রিয়ালের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। প্রথম গোলটিতে দুই তরুণ তারকার সমন্বয় ছিল নিখুঁত। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ তৈরিতেও দুজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

তবু রাতের শেষ আলোটা নিজের করে নিয়েছেন এস্পি। এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস কিংবা বেলিংহামের মতো বিশ্বখ্যাত তারকার ভিড়ে লিগ অভিষেকের মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে ম্যাচ জেতানো গোল করে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন তরুণ ফরোয়ার্ড।

একটি গোল কখনো কখনো শুধু স্কোরলাইন বদলায় না। সেটি একজন খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারের গতিপথ বদলে দিতে পারে। একই সঙ্গে নতুন কোচিং অধ্যায়ের শুরুতে পুরো দলের আত্মবিশ্বাসেও বড় প্রভাব রাখতে পারে।

আরসিডিই স্টেডিয়ামে এস্পির ৯০তম মিনিটের গোল আপাতত সেই দুই কাজই করেছে। তরুণ ফরোয়ার্ডকে দিয়েছে স্বপ্নের অভিষেক। মরিনহোকে দিয়েছে দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম জয়।

ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর স্কোরবোর্ডে লেখা ছিল এস্পানিওল ১, রিয়াল মাদ্রিদ ২। কিন্তু সেই সংখ্যার পেছনে ছিল অপেক্ষা, চাপ, পোস্টে বল লাগার হতাশা এবং একেবারে শেষ মুহূর্তে বদলি খেলোয়াড়ের নায়ক হয়ে ওঠার গল্প।

১৩ বছর পর রিয়াল মাদ্রিদে ফিরে মরিনহোর নতুন যাত্রা তাই শুরু হলো তার ক্যারিয়ারের সঙ্গে মানানসই নাটকীয়তায়। জয়টা নিখুঁত ছিল না। তবে লিগের শুরুতে তিন পয়েন্টই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর সেটি এনে দিলেন এমন একজন, যিনি মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও রিয়ালের তারকাবহুল আক্রমণভাগে ছিলেন নতুন মুখ—কার্লোস এস্পি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত