রংপুরের ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায় নিতে হবে: জামায়াত আমির

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৮ বার

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক কয়েকটি সহিংস ঘটনা সামনে এনে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। পরিস্থিতির দায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেছেন জামায়াত আমির।

রোববার (২৩ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে ডা. শফিকুর রহমান রংপুরের হত্যাকাণ্ডকে ‘নিন্দনীয়, বেদনাদায়ক ও লোমহর্ষক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ঢাকা ও ময়মনসিংহে চিকিৎসকদের কাছে চাঁদা দাবি এবং হামলার অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে অপরাধ দমনে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি বাড়ি থেকে শনিবার রাতে একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগমনী চক্রবর্তী প্রার্থী এবং ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর রংপুরজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। কয়েকদিন ধরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে স্বজনদের সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। শনিবার রাতে বাড়ির ভেতর থেকে দুর্গন্ধ পাওয়ার পর পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে।

ডা. শফিকুর রহমান তার পোস্টে বলেন, একটি গোটা পরিবারকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তা অত্যন্ত নৃশংস। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে সামাজিক অপরাধ, খুন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।

জামায়াত আমির লেখেন, “জনগণ উদ্বিগ্ন। জনগণ এর সুরাহা চায়।”

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এর দায় নিতে হবে।”

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তার অভিযোগ, বাহিনীগুলোর ‘নির্লিপ্ত ভূমিকা’ সাধারণ মানুষের মধ্যে শঙ্কা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে রংপুরের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

তবে জামায়াত আমিরের পোস্টের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রংপুরের হত্যাকাণ্ড নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির তথ্য জানায় পুলিশ। রংপুর মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই তরুণকে আটক করা হয়েছে।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রাথমিক তদন্তে ডাকাতি নয়, মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত দুই তরুণ বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিলেন। গণপতি চক্রবর্তী বিষয়টি দেখে ফেলায় প্রথমে তাকেই হত্যা করা হয়।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, গণপতির পর তার স্ত্রী, মেয়ে এবং সর্বশেষ ১২ বছর বয়সী ছেলেকেও হত্যা করা হয়। পরে ঘটনাকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করে রাখা হয় এবং আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পরও অভিযুক্তরা কিছু সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করেন। তারা বাথরুমে গোসল করেন এবং পরে খাবার গ্রহণ ও ইয়াবা সেবন করেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে। এরপর বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকার নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

অবশ্য এসব তথ্য এখন পর্যন্ত পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে সামনে এসেছে। বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে আটক ব্যক্তিদের অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

জামায়াত আমির তার বক্তব্যে শুধু রংপুরের ঘটনা নয়, সাম্প্রতিক আরও কয়েকটি অপরাধের প্রসঙ্গ এনেছেন। এর মধ্যে ময়মনসিংহে এক পশুচিকিৎসকের চেম্বারে হামলার ঘটনাও রয়েছে।

ময়মনসিংহ নগরের একটি পশু চিকিৎসাকেন্দ্রে ঢুকে চিকিৎসককে মারধর, ভাঙচুর ও টাকা লুটের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী চিকিৎসকের দাবি, পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় হামলা চালানো হয়। ওই ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর এক ছাত্রদল নেতাকে বহিষ্কারও করা হয়েছে।

ডা. শফিকুর রহমানের মতে, একের পর এক এমন ঘটনা মানুষের নিরাপত্তাবোধে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অপরাধের পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

তিনি বলেন, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ভুক্তভোগীরা যথাযথ বিচার না পেলে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। আদালতে বিচারের দীর্ঘসূত্রতাও সেই হতাশা বাড়ায় বলে মন্তব্য করেন জামায়াত আমির।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে সামাজিক সচেতনতা তৈরির আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে সরকার যেন নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়, সেই চাপ জনগণকেই তৈরি করতে হবে বলে মনে করেন বিরোধীদলীয় নেতা।

তার ভাষায়, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে অপরাধের হাত থেকে রক্ষায় সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে।

রংপুরের ঘটনাটি এমন সময় সামনে এসেছে যখন জননিরাপত্তা, চাঁদাবাজি এবং সহিংস অপরাধ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা চলছে। একটি পরিবারের চার সদস্যের এমন মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশেষ করে একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও দেখা দিয়েছে। নিহত গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার মেয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ছেলে পড়ছিল রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে।

একটি পরিবারের চার সদস্যের জীবন এভাবে শেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনা অপরাধের সামাজিক কারণ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলেছে। পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য সত্য প্রমাণিত হলে মাদকাসক্তি এবং অপরাধপ্রবণতার সম্পর্কও তদন্ত ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পাবে।

একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের পর দ্রুত সন্দেহভাজনদের শনাক্ত ও আটক করার ঘটনাও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এখন পুলিশের সামনে বড় দায়িত্ব হচ্ছে সংগৃহীত আলামত, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রমাণের মাধ্যমে পুরো ঘটনাপ্রবাহ প্রতিষ্ঠা করা।

ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না কিংবা হত্যার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অন্যদিকে ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায় নেওয়ার দাবি তুললেও সরকারের পক্ষ থেকে এই বক্তব্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

কোনো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অপরাধের পাশাপাশি সামগ্রিক অপরাধের পরিসংখ্যান, তদন্তের সফলতা, বিচারপ্রক্রিয়া এবং নাগরিকদের নিরাপত্তাবোধ বিবেচনা করা প্রয়োজন। ফলে জামায়াত আমিরের বক্তব্য রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচিত হলেও তার উত্থাপিত ঘটনাগুলো জননিরাপত্তার প্রশ্নে গুরুত্ব বহন করে।

রংপুরের হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত এখন নিহত পরিবারের স্বজনদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও প্রত্যাশা। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের জন্য যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্ট সব আলামত সংরক্ষণ জরুরি।

একই সঙ্গে সাম্প্রতিক চাঁদাবাজি ও হামলার অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইন প্রয়োগের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। কারণ অপরাধের ঘটনায় বিচার নিশ্চিত না হলে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থা বাড়ার ঝুঁকি থাকে।

ডা. শফিকুর রহমানও তার পোস্টের শেষাংশে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অপরাধের বিরুদ্ধে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সব পর্যায়ে সচেতনতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

রংপুরের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড এখন তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ককেও নতুন মাত্রা দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত দ্রুত তদন্ত, প্রমাণনির্ভর বিচার এবং অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপই পারে এমন ঘটনার পর মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া ভয় ও উদ্বেগ কমাতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত