অস্ট্রেলিয়া সিরিজে লিটনের দুঃস্বপ্ন, তিন ইনিংসেই শূন্য

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৫ বার

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অস্ট্রেলিয়া সফরের শুরুতেই বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় সাফল্যের অংশ হয়েছিলেন লিটন দাস। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে সিরিজটি তার জন্য পরিণত হয়েছে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে। দুই টেস্টে ব্যাট করার সুযোগ পাওয়া তিন ইনিংসের প্রতিটিতেই কোনো রান না করে ফিরেছেন অভিজ্ঞ এই ব্যাটার। আর তিনবারই তার উইকেট নিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার বাঁহাতি পেসার মিচেল স্টার্ক।

পায়ের চোটের কারণে অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রাথমিক দলে ছিলেন না লিটন। পুনর্বাসন শেষে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠায় পরে তাকে স্কোয়াডে যুক্ত করেন বাংলাদেশের নির্বাচকেরা। অভিজ্ঞতা ও ব্যাটিং সামর্থ্যের কারণে তার প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের মিডল অর্ডারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবেই দেখা হয়েছিল।

কিন্তু মাঠের গল্প হয়েছে সম্পূর্ণ বিপরীত। অস্ট্রেলিয়ার গতি, সুইং এবং বাউন্সের সামনে নিজের স্বাভাবিক ছন্দ খুঁজে পাননি লিটন। বিশেষ করে স্টার্ক যেন পুরো সিরিজেই তার জন্য অমীমাংসিত এক ধাঁধায় পরিণত হয়েছেন।

ডারউনে প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ১২ বল মোকাবিলা করেও রানের খাতা খুলতে পারেননি লিটন। স্টার্কের বলেই শেষ হয় তার ইনিংস। বাংলাদেশ সেই টেস্টে ঐতিহাসিক জয় পাওয়ায় ব্যক্তিগত ব্যর্থতা খুব বেশি আলোচনায় আসেনি। দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের সামনে ছোট লক্ষ্য থাকায় ব্যাট করার প্রয়োজনও পড়েনি তার।

ম্যাকাইয়ে দ্বিতীয় টেস্টে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ এরেনার পেস সহায়ক উইকেটে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপকে রীতিমতো বিধ্বস্ত করেন স্টার্ক। প্রথম ইনিংসে মাত্র ৬৪ রানে গুটিয়ে যায় সফরকারীরা। স্টার্ক একাই নেন ১২ রানে ৬ উইকেট। তার প্রথম পাঁচ উইকেট আসে মাত্র ২২ বলের মধ্যে।

সেই ধস থেকে রেহাই পাননি লিটনও। পাঁচ বল খেলেও কোনো রান করতে পারেননি তিনি। স্টার্কের বলেই আবার ফিরে যেতে হয় সাজঘরে। অর্থাৎ সিরিজে টানা দ্বিতীয় ইনিংসে তার নামের পাশে যোগ হয় শূন্য।

তখনও সামনে ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ। ম্যাকাই টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল অন্তত দীর্ঘ সময় ব্যাট করে ইনিংস ব্যবধানে হার এড়ানো। কিন্তু আবারও স্টার্কের মুখোমুখি হয়ে একই পরিণতি হয় লিটনের।

দ্বিতীয় ইনিংসে ১০ বল টিকেছিলেন তিনি। প্রথম নয়টি বল কোনোভাবে সামাল দিলেও দশম বলে স্টার্কের ডেলিভারি তার ব্যাটের কিনারা নেয়। তৃতীয় স্লিপে দাঁড়িয়ে থাকা বেউ ওয়েবস্টার ক্যাচটি ধরলে শেষ হয় লিটনের আরেকটি রানহীন ইনিংস।

ফলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজে তার ব্যাটিং পরিসংখ্যান দাঁড়ায় অস্বস্তিকর এক জায়গায়—তিন ইনিংস, তিনটি শূন্য। তিনবারই একই বোলারের শিকার।

লিটনের তৃতীয় ডাক আসে এমন মুহূর্তে যখন বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই কঠিন চাপে পড়েছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৪৬ রানে পিছিয়ে থেকে ব্যাটিংয়ে নামে সফরকারীরা। শুরু থেকেই স্টার্কের সুইং ও গতির সামনে আবারও বিপর্যয় শুরু হয়।

সাদমান ইসলামকে ১ রানে ফিরিয়ে প্রথম আঘাত করেন স্টার্ক। পরের বলেই মুমিনুল হকের অফ স্টাম্প উড়িয়ে দেন তিনি। মাত্র ৫ রানে দুই উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের সামনে তখন ইনিংস পরাজয়ের শঙ্কা আরও প্রবল হয়ে ওঠে।

অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত কিছুটা পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করেন। স্টার্ককে টানা দুটি চারও মারেন তিনি। তবু চাপ কাটেনি। তানজিদ হাসান তামিম ৩৪ বলে ৯ রান করে প্যাট কামিন্সের বলে বিদায় নিলে বাংলাদেশের ব্যাটিং আবারও নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

মুশফিকুর রহিমকে সঙ্গে নিয়ে শান্ত ২৭ রানের ছোট একটি প্রতিরোধ গড়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ৪৬ বলে ৩১ রান করে নাথান লায়নের বলে বিদায় নেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।

এরপর ক্রিজে আসেন লিটন। বাংলাদেশের তখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল তার অভিজ্ঞতার। পরিস্থিতির দাবি ছিল ধৈর্য ধরে মুশফিকের সঙ্গে একটি দীর্ঘ জুটি গড়ার।

কিন্তু স্টার্ক আবারও সেই পরিকল্পনা ভেস্তে দেন। লিটনকে ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যান এই বাঁহাতি পেসার।

লিটনের বিদায়ের পর বাংলাদেশের ব্যাটিং আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। মেহেদী হাসান মিরাজ, হাসান মাহমুদ ও তাইজুল ইসলামও দ্রুত ফিরে যান। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৯৫ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ জেতে ইনিংস ও ৫১ রানে। দুই ম্যাচের সিরিজও ১-১ সমতায় শেষ হয়।

ম্যাকাই টেস্টে স্টার্কের বোলিং ছিল বিধ্বংসী। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে আরও চারটি যোগ করেন তিনি। ম্যাচে ৫১ রান দিয়ে ১০ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার জয়ের প্রধান কারিগর হন অভিজ্ঞ পেসার। এটি ছিল টেস্ট ক্যারিয়ারে তার চতুর্থ ১০ উইকেটের ম্যাচ।

বাংলাদেশের ব্যাটারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুগেছেন লিটন। তবে তার তিনটি শূন্যকে শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প হিসেবে দেখলে ম্যাকাইয়ের সামগ্রিক চিত্র পুরোপুরি ধরা পড়ে না।

প্রথম ইনিংসে পুরো বাংলাদেশ দলই স্টার্কের সামনে অসহায় হয়ে পড়ে। ১২ রানে ৫ উইকেট হারানোর পর সফরকারীদের ইনিংস আর দাঁড়াতে পারেনি। দ্বিতীয় ইনিংসেও একইভাবে শুরুতে উইকেট হারায় দল।

বাংলাদেশের ৬৪ ও ৯৫—দুই ইনিংসেই স্কোর একশর নিচে থাকে। নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে প্রথমবার একই ম্যাচের দুই ইনিংসে একশর নিচে অলআউট হওয়ার বিব্রতকর রেকর্ডও তৈরি হয়।

এই ব্যাটিং ব্যর্থতার আড়ালে অসাধারণ এক ব্যক্তিগত অর্জন করেন শরিফুল ইসলাম। অস্ট্রেলিয়ার একমাত্র ইনিংসে ৪৮ রান দিয়ে ৭ উইকেট নেন বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের কোনো বোলারের সেরা টেস্ট বোলিংয়ের রেকর্ডও গড়েন তিনি।

প্রথম দিনের শেষে শরিফুলের বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়াও বড় বিপদে পড়েছিল। দ্বিতীয় দিন ক্যামেরন গ্রিনকে ৬৭ রানে ফিরিয়ে নিজের সপ্তম উইকেট পূর্ণ করেন তিনি। এরপর অস্ট্রেলিয়া ২১০ রানে অলআউট হয়।

কিন্তু বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের মাত্র ৬৪ রানই শেষ পর্যন্ত বিশাল ব্যবধান তৈরি করে দেয়। অস্ট্রেলিয়া ১৪৬ রানের লিড পাওয়ার পর বাংলাদেশের ব্যাটারদের সামনে কঠিন কাজ অপেক্ষা করছিল।

ডারউনের গল্প অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। সিরিজের প্রথম টেস্টে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শীর্ষ দল অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে বড় অঘটন ঘটিয়েছিল বাংলাদেশ। ফলে ম্যাকাইয়ে নামার সময় আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি থাকার কথা ছিল না।

মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই আত্মবিশ্বাস যেন উধাও হয়ে যায়। পেস সহায়ক উইকেট, স্টার্কের ভয়ংকর সুইং এবং অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ বোলিং আক্রমণের সামনে বাংলাদেশের ব্যাটিং টেকেনি।

লিটনের জন্য সিরিজটি আরও হতাশার কারণ তার অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের হয়ে দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার সুবাদে কঠিন পরিস্থিতি সামলানোর দায়িত্ব সাধারণত তার মতো সিনিয়র ব্যাটারদের ওপরই থাকে।

টেস্ট ক্রিকেটে লিটনের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। অসাধারণ টাইমিং ও আক্রমণাত্মক ব্যাটিং দিয়ে বহুবার দলকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন তিনি। আবার ধারাবাহিকতার অভাবও ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে তাকে ভুগিয়েছে।

অস্ট্রেলিয়া সফরের তিনটি ডাক তাই সামনে আনছে নতুন এক মানসিক চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে একই বোলারের কাছে তিনবার রান না করে আউট হওয়া পরবর্তী সিরিজের আগে তার প্রস্তুতিতে আলাদা গুরুত্ব পেতে পারে।

স্টার্কের বিপক্ষে লিটনের সমস্যার মধ্যে শুধু গতি ছিল না। বাঁহাতি পেসারের বল কখনো ভেতরে ঢুকেছে, কখনো বাইরের দিকে সরে গেছে। ম্যাকাইয়ের উইকেট থেকে পাওয়া অতিরিক্ত বাউন্স সেই কঠিনতা আরও বাড়িয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ব্যাটারের ফুটওয়ার্ক, অফ স্টাম্প সম্পর্কে ধারণা এবং বল ছাড়ার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। লিটনের তিনটি ইনিংসই বাংলাদেশের কোচিং স্টাফের জন্য বিশ্লেষণের বড় জায়গা হয়ে থাকবে।

ম্যাকাইয়ের পরাজয়ের পর অধিনায়ক শান্তও কোনো একজন ব্যাটারকে দায়ী করতে চাননি। তিনি স্বীকার করেছেন, দল হিসেবেই বাংলাদেশ খারাপ খেলেছে। সামনে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে এমন কঠিন পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা কাজে লাগানোর কথাও বলেছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।

সেটিই সম্ভবত লিটনের জন্যও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। তিনটি ডাক হতাশাজনক। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একজন ব্যাটারের ক্যারিয়ার এমন ব্যর্থতার মধ্যেই থেমে থাকে না।

অস্ট্রেলিয়া সফর থেকে বাংলাদেশ অন্তত ঐতিহাসিক একটি জয় নিয়ে ফিরছে। ডারউনের সাফল্যের বিপরীতে ম্যাকাইয়ের দুই দিনের পরাজয় দলকে কঠিন বাস্তবতাও দেখিয়েছে।

লিটনের ব্যক্তিগত গল্পে অবশ্য আনন্দের অংশ খুব সামান্য। চোট কাটিয়ে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন বড় প্রত্যাশা নিয়ে। শেষ পর্যন্ত তিনবার ব্যাট হাতে নেমে একটি রানও করতে পারেননি।

এখন সামনে তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে এই ব্যর্থতা কত দ্রুত পেছনে ফেলতে পারেন। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পরের ইনিংসই নতুন শুরু করার সুযোগ। অস্ট্রেলিয়ায় তিনটি শূন্য আপাতত লিটনের নামের পাশে অস্বস্তিকর স্মৃতি হয়ে থাকলেও পরবর্তী সিরিজেই সেই গল্প বদলে দেওয়ার সুযোগ পাবেন বাংলাদেশের অন্যতম অভিজ্ঞ এই ব্যাটার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত