পশ্চিম তীরের বসতি থেকে পণ্য আমদানি বন্ধের আহ্বান

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৮ বার

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিগুলো থেকে উৎপাদিত পণ্য যুক্তরাজ্যে আমদানি বন্ধের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ার ও লেবার পার্টির এমপি ডেম এমিলি থর্নবেরি এবার সরাসরি এমন নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, শুধু ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বসতি সম্প্রসারণ ও সহিংসতা ঠেকানো সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যও বন্ধ করা প্রয়োজন।

থর্নবেরির এই আহ্বান এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন পশ্চিম তীরের বিতর্কিত E1 এলাকায় নতুন বসতি নির্মাণের উদ্যোগ ঘিরে ইসরাইলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বেড়েছে। ব্রিটিশ সরকারও সম্প্রতি এই পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

থর্নবেরি বলেছেন, তিনি ইসরাইলের সব পণ্যের ওপর সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞার পক্ষে নন। তার দাবি মূলত অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্য নিয়ে। এসব বসতির অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ব্রিটিশ অর্থ যেন সহায়তা না করে, সেটিই তার প্রস্তাবের অন্যতম উদ্দেশ্য।

তার মতে, পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে ক্রমশ সংকুচিত করছে। একই সঙ্গে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার কারণে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রভাবশালী এই এমপি মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু নির্দিষ্ট ব্যক্তি কিংবা সংগঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ যথেষ্ট নয়। বসতি অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত বাণিজ্যিক সম্পর্ক সীমিত করার মাধ্যমেও চাপ তৈরি করা প্রয়োজন।

ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিগুলো আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অবৈধ। এসব বসতিতে উৎপাদিত পণ্য যুক্তরাজ্য-ইসরাইল বাণিজ্য চুক্তির আওতায় অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধাও পায় না। তবে বর্তমানে এসব পণ্যের আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়।

এই পার্থক্যটি বর্তমান বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্য সরকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের বসতিগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক এবং আর্থিক কর্মকাণ্ড না করার জন্য কঠোরভাবে পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সামগ্রিক বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এখনো কার্যকর করেনি।

গত জুনে সরকার তার ব্যবসায়িক ঝুঁকিসংক্রান্ত নির্দেশনা আরও কঠোর করে। ব্রিটিশ নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিকৃত অঞ্চলের ইসরাইলি বসতিগুলোয় অর্থনৈতিক কিংবা আর্থিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে স্পষ্টভাবে বলা হয়। বসতি সম্প্রসারণ এবং সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

তবে পার্লামেন্টের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সদস্য মনে করছেন, বর্তমান পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। জুনে ১৪০ জনের বেশি লেবার এমপি পশ্চিম তীরের ইসরাইলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়ে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি দেন। তারা বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার জবাবে আরও দৃশ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চেয়েছিলেন।

পরবর্তীতে অন্যান্য দলের এমপিদের সমর্থন যুক্ত হওয়ায় এমন পদক্ষেপের পক্ষে পার্লামেন্ট সদস্যদের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। বিভিন্ন দলের ২০০ জনের বেশি এমপি কোনো না কোনোভাবে বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন বন্ধের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

এই চাপের মধ্যে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে E1 বসতি প্রকল্প। পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত।

১৯ আগস্ট ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড ইসরাইল সরকারের E1 প্রকল্পের নির্মাণ দরপত্র প্রকাশের সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য ও ধ্বংসাত্মক’ পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, এই প্রকল্প পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের মধ্যে ভৌগোলিক সংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ফলে কার্যকর দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাও ঝুঁকিতে পড়বে।

লন্ডন ওই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতে ইসরাইলি চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে পররাষ্ট্র দপ্তরে তলবও করেছে। একই সঙ্গে ইসরাইল সরকারকে E1 পরিকল্পনা প্রত্যাহার এবং বসতি সম্প্রসারণ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।

ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, ইসরাইলি সরকারের নীতির জবাবে আগামী কয়েক সপ্তাহে একটি বিস্তৃত পদক্ষেপের প্যাকেজ ঘোষণা করা হবে। অবৈধ বসতি সম্প্রসারণে অংশগ্রহণকারীদের লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা সুরক্ষিত রাখার উদ্যোগ এতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

তবে বসতিতে উৎপাদিত সব পণ্যের ওপর সরাসরি আমদানি নিষেধাজ্ঞা সেই প্যাকেজে থাকবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।

এক দিন পর যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, কানাডা ও নরওয়ের নেতারা যৌথ বিবৃতিতে E1 পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন। তারা বলেন, এই প্রকল্প পশ্চিম তীরকে বিভক্ত করার পাশাপাশি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভৌগোলিক ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

যৌথ বিবৃতিতে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার মাত্রা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে E1 কিংবা অন্যান্য বসতি নির্মাণের দরপত্রে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ব্রিটিশ সরকার সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। আগস্টে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেও যুক্তরাজ্য বলেছে, বসতি সম্প্রসারণ দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি উভয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতা বাড়াচ্ছে।

লন্ডনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে ইসরাইল সরকার ১০৪টি বসতি অনুমোদন করেছে। একই সময়ে নতুন বসতি নির্মাণে নজিরবিহীন অর্থ বরাদ্দের কথাও উল্লেখ করেছে যুক্তরাজ্য।

এমন বাস্তবতায় থর্নবেরির যুক্তি হচ্ছে, ব্রিটিশ অর্থ যেন এমন কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় প্রবেশ না করে যা বসতি সম্প্রসারণে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সহায়তা করতে পারে।

বিষয়টি অবশ্য কেবল রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পণ্য কোথায় উৎপাদিত হয়েছে এবং সেগুলোর উৎস কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্যের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, অধিকৃত ভূখণ্ডের ইসরাইলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্য ইসরাইলের স্বীকৃত সীমান্তের মধ্যে উৎপাদিত পণ্যের মতো অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা পায় না।

এই নিয়ম কার্যকর রাখতে আমদানিকারকদের উৎপাদনের উৎসসংক্রান্ত তথ্য দিতে হয়। কোনো পণ্যের ঘোষিত উৎপত্তি নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে এইচএম রেভিনিউ অ্যান্ড কাস্টমস যাচাই করতে পারে। অধিকৃত ভূখণ্ডে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে ভোক্তাকে বিভ্রান্ত না করার জন্য আলাদা লেবেলিং নির্দেশনাও রয়েছে।

তবে থর্নবেরি ও নিষেধাজ্ঞার সমর্থকেরা আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে চান। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, শুল্ক সুবিধা বন্ধ কিংবা ব্যবসায়িক সতর্কতা যথেষ্ট নয়। বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য আইনের মাধ্যমে বন্ধ করা হলে অর্থনৈতিক চাপ অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।

অন্যদিকে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনি ও বাণিজ্যিক জটিলতাও রয়েছে। কোন পণ্য সরাসরি বসতিতে তৈরি এবং কোন পণ্যের সরবরাহব্যবস্থার কোনো অংশ সেখানে যুক্ত—এমন প্রশ্ন বাস্তব প্রয়োগে জটিলতা তৈরি করতে পারে। ব্রিটিশ সরকার সম্ভাব্য বাণিজ্যিক পদক্ষেপ বিবেচনা করছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

বর্তমান বিতর্কে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট রাখা গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিম তীরের বসতি থেকে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব ইসরাইল রাষ্ট্রের সব পণ্যের বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার সমতুল্য নয়। থর্নবেরিও পূর্ণ ইসরাইলি পণ্য নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করেননি। তার প্রস্তাব অধিকৃত পশ্চিম তীরের বসতিতে উৎপাদিত পণ্যকে কেন্দ্র করে।

এই পার্থক্যের মাধ্যমে বসতি এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইসরাইলি ভূখণ্ডের মধ্যে রাজনৈতিক ও আইনি বিভাজন বজায় রাখতে চাইছেন নিষেধাজ্ঞার সমর্থকেরা।

ব্রিটিশ সরকারের বর্তমান নীতিতেও একই ধরনের পার্থক্য রয়েছে। সরকার ইসরাইলের স্বীকৃত সীমান্তের ভেতরে বৈধ বাণিজ্য অব্যাহত রাখার কথা বলছে। একই সঙ্গে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের বসতিগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক কার্যক্রম থেকে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

পশ্চিম তীরকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং E1 প্রকল্প এখন এই পুরোনো বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। ব্রিটিশ সরকারের ঘোষিত নতুন ব্যবস্থা কতটা কঠোর হবে, সেটির ওপর নজর থাকবে পার্লামেন্ট সদস্য, মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক মহলের।

এমিলি থর্নবেরির বক্তব্য সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিল। তার অবস্থান পরিষ্কার—বসতি সম্প্রসারণ ঠেকাতে কূটনৈতিক সমালোচনা কিংবা ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্কেও পরিবর্তন আনতে হবে।

শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার সেই আহ্বান গ্রহণ করে সরাসরি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তবে পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি এবং নতুন বসতি প্রকল্প ঘিরে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া বলছে, লন্ডনের নীতিতে আরও কঠোর পদক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত