প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বর্তমান সরকার ক্ষমতা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পথ অনুসরণ করছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের মানুষ কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান হয়েছে বলে আশা করেছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটছে না বলে দাবি তার।
রোববার (২৩ আগস্ট) রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে সীরাতুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেন জামায়াত আমির। একই সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ইতিহাসের একপাক্ষিক উপস্থাপনের অভিযোগও তোলেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “৫ আগস্টের পর জনগণ ভেবেছিল ফ্যাসিবাদ বিদায় হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ যে পথে হেঁটেছে, বর্তমান সরকারও সেই একই পথে হাঁটছে।”
বিরোধীদলীয় নেতার এমন বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে সরকার গঠনের পর খুব বেশি সময় না যেতেই প্রধান বিরোধী দলের শীর্ষ নেতার পক্ষ থেকে কর্তৃত্ববাদী আচরণের অভিযোগ ওঠায় ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের সম্পর্ক কোন দিকে যায়, সেটিও আলোচনায় এসেছে।
জামায়াত আমির সতর্ক করে বলেন, সরকার যদি ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থেকে বিরত না থাকে, তাহলে দেশের মানুষ অতীতের মতো আবারও প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। তার দাবি, জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে কোনো সরকার দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে না।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যেভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয়েছে, বর্তমান সরকারও একই ধরনের রাজনৈতিক পরিণতির মুখে পড়তে পারে যদি ক্ষমতা পরিচালনার ক্ষেত্রে পুরোনো সংস্কৃতি অনুসরণ করা হয়।
ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে জুলাই আন্দোলন এবং সেই আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা জাদুঘর থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপাদান সরিয়ে ফেলার অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াত আমির দাবি করেন, “বিশেষ একটি রাষ্ট্রকে খুশি করতে গিয়ে জুলাই জাদুঘরের অনেক উপাদান গায়েব করা হয়েছে।”
তবে কোন রাষ্ট্রকে উদ্দেশ্য করে তিনি এই মন্তব্য করেছেন কিংবা ঠিক কোন কোন উপাদান সরানো হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য বক্তব্যে উল্লেখ করেননি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও তার অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস উপস্থাপন নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তার অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল ছাড়া আন্দোলনে অংশ নেওয়া অন্য রাজনৈতিক দল ও শক্তিগুলোর ভূমিকা যথাযথভাবে তুলে ধরা হচ্ছে না।
তিনি দাবি করেন, “একটি দল ছাড়া বাকি সব দলের ইতিহাসকেও গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।”
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে জুলাই আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছে। আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন, পেশাজীবী, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের ভূমিকা নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা ধরনের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। কোন দল কিংবা গোষ্ঠীর ভূমিকা কতটা ছিল, সেই প্রশ্নে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যও রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস রাষ্ট্রীয়ভাবে কীভাবে সংরক্ষণ ও উপস্থাপন করা হবে, সেটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তথ্যভিত্তিক ও বহুমাত্রিক উপস্থাপন নিশ্চিত করার দাবি বিভিন্ন পক্ষ থেকেই উঠেছে।
ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যেও মূলত সেই বিতর্কের প্রতিফলন দেখা গেছে। তার অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসে সব রাজনৈতিক শক্তির অবদান সমানভাবে তুলে ধরা হচ্ছে না। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারের বক্তব্য পাওয়া গেলে পুরো পরিস্থিতির আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।
বিরোধীদলীয় নেতা তার বক্তব্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জনগণের প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকটের পর মানুষ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা চেয়েছে যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার বক্তব্যের মূল সুর ছিল—ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেই রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রকৃত পরিবর্তন ঘটে না। বরং রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি, প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণ এবং বিরোধী মতের প্রতি সরকারের অবস্থানেই পরিবর্তনের বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট দীর্ঘদিনের। নির্বাচন, রাজনৈতিক কর্মসূচি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিরোধ দেখা গেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এসব জায়গায় কাঙ্ক্ষিত সংস্কার কতটা হয়েছে, তা নিয়েও বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন মূল্যায়ন রয়েছে।
জামায়াত আমিরের বর্তমান বক্তব্য সেই রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। সরকারের বিরুদ্ধে ‘ফ্যাসিবাদী পথে হাঁটার’ অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর রাজনৈতিক দাবি। এমন অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট ঘটনা, নীতি কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিশ্লেষণ প্রয়োজন। একইভাবে সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোর ব্যাখ্যা কিংবা জবাবও জনসাধারণের সামনে আসা গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. শফিকুর রহমান রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য জনগণের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন। তার মতে, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রকৃত উৎস জনগণ। সেই কারণে মানুষের অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রত্যাশাকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।
জামায়াত আমিরের বক্তব্যে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের সমালোচনাও উঠে আসে। তার ভাষায়, আওয়ামী লীগ ১৫ বছর যে রাজনৈতিক পদ্ধতি অনুসরণ করেছে, সেই ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করেই জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তাই নতুন সরকার একই ধরনের আচরণ করলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে বলে মনে করেন তিনি।
তবে বর্তমান সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের মতো একই পথে চলছে—এটি জামায়াত আমিরের রাজনৈতিক মূল্যায়ন। এমন দাবির বিষয়ে সরকারের অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর স্বাধীন মূল্যায়ন ছাড়া একে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি সেমিনারে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ নিয়েও আলোচনা হয়। সীরাতুন্নবী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানটিতে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়বিচার, নৈতিকতা এবং মানুষের অধিকারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
ডা. শফিকুর রহমান ইসলামী আদর্শের আলোকে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব জনগণের অধিকার রক্ষা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক আগামী দিনগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে। সংসদের ভেতরে কার্যকর বিরোধিতা এবং বাইরে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে বিরোধী দলের সমালোচনার জবাব রাজনৈতিক ও নীতিগতভাবে দেওয়া সরকারের দায়িত্বের অংশ।
সরকারের বিরুদ্ধে জামায়াত আমিরের কঠোর বক্তব্য এমন সময় এলো, যখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার, জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং রাজনৈতিক সহাবস্থান নিয়ে আলোচনা চলছে। ফলে তার অভিযোগগুলো শুধু দলীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কেও জায়গা পেতে পারে।
বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে তার অভিযোগ ভবিষ্যতে আরও আলোচনা তৈরি করতে পারে। কোনো জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ভূমিকা যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ইতিহাসের কোনো অংশ অতিরঞ্জিত কিংবা বাদ দেওয়া হলে তা ভবিষ্যতে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।
একই সঙ্গে অতীতের কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রশ্নটিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতার পরিবর্তনের পাশাপাশি রাজনৈতিক আচরণ, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না গেলে গণতান্ত্রিক রূপান্তর অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে।
ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে মূলত সেই জায়গাতেই সরকারের প্রতি সতর্কবার্তা রয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, মানুষ যে পরিবর্তনের প্রত্যাশায় রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল, সেই আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে সরকার গেলে জনগণ আবারও প্রতিবাদী হয়ে উঠবে।
রোববারের বক্তব্যের পর এখন সরকারের প্রতিক্রিয়ার দিকে নজর থাকবে। জামায়াত আমিরের অভিযোগগুলো সরকার প্রত্যাখ্যান করে কি না কিংবা জুলাই জাদুঘর ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তবে সেই বিরোধ যেন সহিংসতা কিংবা প্রতিহিংসার দিকে না গিয়ে সংসদ, রাজনৈতিক সংলাপ এবং জনপরিসরে যুক্তিনির্ভর আলোচনার মাধ্যমে পরিচালিত হয়—রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
একটি রাজনৈতিক সরকারের মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত জনগণই করে। তাই ক্ষমতাসীনদের জন্য যেমন জবাবদিহি জরুরি, বিরোধী দলের ক্ষেত্রেও অভিযোগের পক্ষে তথ্য ও প্রমাণ উপস্থাপন গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার ও বিরোধী পক্ষ কতটা সেই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে, আগামী দিনের রাজনীতিতে সেটিই বড় পরীক্ষা হয়ে থাকবে।