ব্যাটিং ধসে দুই দিনেই ইনিংস ব্যবধানে হার বাংলাদেশের

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩১ বার

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ডারউইনে ইতিহাস গড়ার এক সপ্তাহ পরই ম্যাকাইতে সম্পূর্ণ বিপরীত এক বাংলাদেশকে দেখা গেল। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্বাগতিকদের হারিয়ে চমক সৃষ্টি করা দলটি দ্বিতীয় টেস্টে ব্যাটিং বিপর্যয়ের বৃত্ত থেকে বেরোতেই পারল না। দুই ইনিংস মিলিয়ে ১৫৯ রান করা বাংলাদেশকে মাত্র দুই দিনের মধ্যেই ইনিংস ও ৫১ রানে হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ফলে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ শেষ হয়েছে ১-১ সমতায়।

ম্যাকাইয়ের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেমেছিল মাত্র ৬৪ রানে। অস্ট্রেলিয়া জবাবে করে ২১০। ১৪৬ রানে পিছিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে নেমেও ব্যাটিং ব্যর্থতার একই গল্প লিখেছেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা। এবার সংগ্রহ ৯৫। দুই ইনিংসেই দলীয় শতরান স্পর্শ করতে না পারায় ম্যাচ বাঁচানোর সামান্য সম্ভাবনাটুকুও শেষ হয়ে যায়।

বাংলাদেশের ব্যাটিং ধসের প্রধান কারিগর মিচেল স্টার্ক। প্রথম ইনিংসে মাত্র ১২ রান দিয়ে ৬ উইকেট নেওয়া বাঁহাতি পেসার দ্বিতীয় ইনিংসে নেন আরও ৪ উইকেট। ম্যাচে ৫১ রান খরচায় ১০ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যাবর্তনের নায়ক হয়েছেন তিনি। এটি স্টার্কের টেস্ট ক্যারিয়ারে চতুর্থ ১০ উইকেটের ম্যাচ।

স্টার্কের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে আরও একটি মাইলফলক যুক্ত হয়েছে। টেস্টে তার উইকেট এখন ৪৪৫টি। এই ম্যাচেই দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি ডেল স্টেইনকে পেছনে ফেলে টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারিদের তালিকায় দশম স্থানে উঠে এসেছেন অস্ট্রেলিয়ান পেসার।

প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয় এতটাই ভয়াবহ ছিল যে একপর্যায়ে নিজেদের সর্বনিম্ন টেস্ট স্কোর ৪৩ রানের নিচে অলআউট হওয়ার শঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। শেষ উইকেটে তাইজুল ইসলাম ও শরিফুল ইসলামের ২৫ রানের জুটি সেই লজ্জা থেকে দলকে রক্ষা করে। ১৪ রান করে ইনিংসের সর্বোচ্চ স্কোরার ছিলেন ১১ নম্বরে নামা শরিফুল।

মাত্র ৩৪ ওভারে ৬৪ রানে শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস। স্টার্ক একাই নেন ৬ উইকেট। অধিনায়ক প্যাট কামিন্স তিনটি এবং জশ হ্যাজেলউড একটি উইকেট পান। প্রথম দিনেই বাংলাদেশের ব্যাটিংকে ছিন্নভিন্ন করে অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়।

তবে বাংলাদেশের বোলাররা সেদিনই দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন। বিশেষ করে শরিফুল ইসলাম প্রায় একাই অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামান। প্রথম দিন শেষে তার ৬ উইকেটের সুবাদে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ছিল ৮ উইকেটে ১৬৫ রান। ফলে প্রথম ইনিংসে মাত্র ৬৪ করার পরও ম্যাচে ফেরার ক্ষীণ আশা বেঁচে ছিল বাংলাদেশের।

দ্বিতীয় দিনের শুরুতেও সেই লড়াই ধরে রাখেন শরিফুল। আগের দিনের ৬ উইকেটের সঙ্গে আরও একটি যোগ করে ক্যারিয়ারসেরা ৭ উইকেট পূর্ণ করেন তিনি। ৪৮ রানে ৭ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে নতুন নজিরও গড়েন বাঁহাতি এই পেসার। দেশের কোনো পেসার প্রথমবার টেস্টের এক ইনিংসে সাত উইকেট নিলেন।

বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশি বোলারের সেরা ইনিংস বোলিংয়ের রেকর্ডও নিজের করে নেন শরিফুল। আগের রেকর্ড ছিল তাইজুল ইসলামের ৭ উইকেট। ম্যাকাইয়ের গতিময় উইকেটে শরিফুলের বোলিং বাংলাদেশকে ম্যাচে ফেরার সুযোগ এনে দিয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়েও খুব বেশি স্বস্তি ছিল না। প্রথম দিন ৮ উইকেটে ১৬৫ রান নিয়ে খেলা শেষ করেছিল স্বাগতিকরা। দ্বিতীয় দিনে ক্যামেরন গ্রিন ও নাথান লায়নের ব্যাটে লিডটা আরও বড় হয়।

গ্রিনকে ফিরিয়ে নিজের সপ্তম উইকেট পূর্ণ করেন শরিফুল। ইনসুইং ইয়র্কারে গ্রিনের পায়ে আঘাত করলে বাংলাদেশ এলবিডব্লিউর আবেদন করে। মাঠের আম্পায়ার সাড়া না দেওয়ায় রিভিউ নেন নাজমুল হোসেন শান্ত। সিদ্ধান্ত বদলে যায় এবং শেষ হয় গ্রিনের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস।

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৬৭ রান করেন ক্যামেরন গ্রিন। নাথান লায়ন অপরাজিত থাকেন ৩২ রানে। শেষ পর্যন্ত ২১০ রানে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের তুলনায় স্বাগতিকদের লিড দাঁড়ায় ১৪৬ রান।

বোলাররা নিজেদের কাজ করার পর বাংলাদেশের সামনে তখন একটাই চ্যালেঞ্জ ছিল—দীর্ঘ সময় ব্যাট করা। অন্তত ১৪৬ রানের ব্যবধান মুছে অস্ট্রেলিয়াকে আবার ব্যাটিংয়ে নামাতে হতো। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতেই সেই পরিকল্পনা ভেঙে দেন স্টার্ক।

বাংলাদেশের স্কোর তখন মাত্র ৫। তৃতীয় ওভারে স্টার্কের বলে পয়েন্টে মার্নাস লাবুশেনের হাতে ক্যাচ দেন সাদমান ইসলাম। পরের বলেই মুমিনুল হকের অফ স্টাম্প উড়িয়ে দেন স্টার্ক। টানা দুই বলে দুই উইকেট হারিয়ে আবারও বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ।

প্রথম ইনিংসের মতো দ্বিতীয় ইনিংসেও নতুন বলের সুইং এবং গতির সামনে বাংলাদেশের টপ অর্ডারের দুর্বলতা প্রকট হয়ে ওঠে। পায়ের কাজ কিংবা বল ছাড়ার সিদ্ধান্তে আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা যায়। ম্যাকাইয়ের কন্ডিশন কাজে লাগিয়ে অস্ট্রেলিয়ান পেসাররাও চাপ ধরে রাখেন।

তানজিদ হাসান তামিম কিছুক্ষণ টিকে থাকার চেষ্টা করেন। তবে ৩৪ বল খেলে মাত্র ৯ রান করে কামিন্সের বলে স্টার্কের হাতে ক্যাচ দেন তিনি। ডারউইনে প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করার পর পরবর্তী ইনিংসগুলোতে সেই ছন্দ ধরে রাখতে পারেননি তানজিদ।

একপ্রান্তে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করেন। স্টার্ককে পরপর দুটি চারও মারেন তিনি। তবে ব্যক্তিগত ৩১ রানে নাথান লায়নের বলে আউট হয়ে গেলে বাংলাদেশের প্রতিরোধ আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় ইনিংসে এটিই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ।

শান্তর বিদায়ের পর লিটন দাসকে ফিরিয়ে ম্যাচে নিজের দশম উইকেটের পথে আরও এগিয়ে যান স্টার্ক। লিটনের জন্য ম্যাকাই টেস্ট ছিল ভুলে যাওয়ার মতো। দ্বিতীয় ইনিংসে কোনো রান করতে পারেননি তিনি।

এরপর প্যাট কামিন্সের তোপে দ্রুত ফিরে যান মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদ। দ্বিতীয় সেশনে মাত্র ৩১ রানের মধ্যে পাঁচ উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে কার্যত ছিটকে যায় বাংলাদেশ।

তাইজুল ইসলাম কিছু সময় মুশফিকুর রহিমকে সঙ্গ দেওয়ার চেষ্টা করেন। ২৪ বলে ৭ রান করার পর স্টার্কের বলে বোল্ড হন তিনি। শেষ দিকে মুশফিক একপ্রান্ত ধরে রাখলেও ম্যাচের ফল বদলানোর মতো কোনো জুটি গড়ে ওঠেনি।

মুশফিকুর রহিম ২৯ রানে অপরাজিত থাকেন। অন্যপ্রান্তে উইকেট পড়তে থাকায় অভিজ্ঞ এই ব্যাটারের লড়াই শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত প্রতিরোধেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাংলাদেশ ৩৮.৩ ওভারে ৯৫ রানে অলআউট হলে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস জয় নিশ্চিত হয়।

দ্বিতীয় ইনিংসে স্টার্ক ৩৯ রানে চার উইকেট নেন। প্যাট কামিন্স মাত্র ১০ রান দিয়ে তিনটি এবং নাথান লায়ন ২৫ রানে তিন উইকেট শিকার করেন। অস্ট্রেলিয়ার তিন অভিজ্ঞ বোলারের সামনে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ কার্যত কোনো দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারেনি।

ম্যাকাইয়ের এই হার বাংলাদেশের জন্য আরও হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডারউইনের পারফরম্যান্স বিবেচনায়। সিরিজের প্রথম টেস্টে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছিল বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সেটি ছিল বাংলাদেশের স্মরণীয় এক টেস্ট জয়।

প্রথম ম্যাচের সেই সাফল্যের পর সিরিজ জয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। অন্তত ড্র করতে পারলেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক সিরিজ জয় নিশ্চিত হতো। অথচ ম্যাকাইয়ে দুই দিনের মধ্যেই সব হিসাব বদলে যায়।

ব্যাটারদের ব্যর্থতার মাঝেও শরিফুলের পারফরম্যান্স বাংলাদেশের জন্য বড় প্রাপ্তি। চোটের কারণে প্রথম টেস্টে খেলতে না পারা ২৫ বছর বয়সী পেসার ম্যাকাইয়ে ফিরে ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করেছেন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এমন পারফরম্যান্স বাংলাদেশের পেস আক্রমণের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদী হওয়ার সুযোগ দিয়েছে।

কিন্তু বোলিংয়ের সাফল্য আড়াল করতে পারছে না ব্যাটিংয়ের ভয়াবহ ব্যর্থতা। দুই ইনিংসে যথাক্রমে ৬৪ ও ৯৫—টেস্ট ক্রিকেটে এমন সংগ্রহ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশের জন্য ম্যাকাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই ব্যাটিং নিয়েই।

অধিনায়ক শান্তও ম্যাচ শেষে কঠিন কন্ডিশনে আরও ভালোভাবে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে নিয়মিত টেস্ট খেলার সুযোগ পেলে ক্রিকেটারদের উন্নতি হবে বলে মত দিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে ডারউইনের পরাজয়ের পর অস্ট্রেলিয়ার প্রতিক্রিয়া ছিল নির্মম। অধিনায়ক কামিন্স দলের প্রত্যাবর্তনে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে স্টার্কের নতুন বলের স্পেল এবং ক্যামেরন গ্রিনের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংসের প্রশংসা করেছেন তিনি।

শেষ পর্যন্ত সিরিজের ছবিটা তাই অদ্ভুত বৈপরীত্যে ভরা। ডারউইনে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ক্রিকেট বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। ম্যাকাইয়ে সেই অস্ট্রেলিয়াই দুই দিনের মধ্যে ইনিংস ব্যবধানে জিতে কঠিন জবাব দিয়েছে।

বাংলাদেশ সিরিজ জিততে পারেনি। অস্ট্রেলিয়াও ঘরের মাঠে সিরিজ জিততে পারেনি। দুই ম্যাচ শেষে ট্রফি ভাগাভাগি হয়েছে ১-১ ব্যবধানে।

তবু বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া সফর শুধু ম্যাকাইয়ের ব্যাটিং বিপর্যয় দিয়ে মূল্যায়ন করলে পুরো চিত্র ধরা পড়বে না। ডারউইনের ঐতিহাসিক জয় এবং শরিফুলের রেকর্ডগড়া বোলিং সফরের বড় অর্জন হয়ে থাকবে। পাশাপাশি ম্যাকাইয়ের দুই ইনিংসের ধস মনে করিয়ে দেবে, কঠিন কন্ডিশনে ধারাবাহিকভাবে ভালো করতে হলে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে এখনও অনেক কাজ বাকি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত