তুরস্কের সঙ্গে সংঘাত এড়াতে ইসরাইলের গোপন যোগাযোগ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৪ বার

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিরিয়ায় সামরিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে তুরস্ক ও ইসরাইলের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়লেও সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চায় না তেলআবিব। দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান এবং ভুল বোঝাবুঝি থেকে সামরিক সংঘর্ষ ঠেকাতে গোপন যোগাযোগের চ্যানেল সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসরাইলের এক জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা।

ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম কান নিউজকে ওই কর্মকর্তা বলেন, তুরস্ককে শত্রুতে পরিণত করা ইসরাইলের লক্ষ্য নয়। তবে সিরিয়ার ভূখণ্ডে তুর্কি সামরিক উপস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছালে, যা ইসরাইল নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে, তখন ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে গোপন চ্যানেলের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। সেই বার্তা কার্যকর না হলে সামরিক পদক্ষেপের পথ বেছে নিতে পারে ইসরাইল।

সাম্প্রতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটি। গত ১৮ আগস্ট ইসরাইলি যুদ্ধবিমান ঘাঁটিটিতে একাধিক হামলা চালায়। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আটটি বিমান হামলায় রানওয়ে ও সংরক্ষণাগারের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

ইসরাইলের দাবি, তুরস্ক সেখানে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বিশেষ করে রাডার এবং অন্যান্য সামরিক সক্ষমতা স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ ছিল তেলআবিবের। ইসরাইলি সূত্রগুলো বলছে, এমন অবকাঠামো কার্যকর হলে সিরিয়ার আকাশসীমায় ইসরাইলি বিমানবাহিনীর স্বাধীনভাবে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা প্রভাবিত হতে পারে।

তবে এই দাবির সঙ্গে একমত নয় আঙ্কারা। তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলার সময় আবু আল-দুহুর ঘাঁটিতে কোনো তুর্কি সেনা উপস্থিত ছিল না। ইসরাইলের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তুরস্ক বলেছে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে নিয়মিত ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।

সিরিয়ার সরকারও ইসরাইলের ব্যাখ্যার বিরোধিতা করেছে। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি জানিয়েছেন, আবু আল-দুহুর ঘাঁটিকে স্থায়ী তুর্কি সামরিক ঘাঁটিতে রূপান্তরের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। তার দাবি, ঘাঁটির পুনর্বাসন সিরিয়ার নিজস্ব বিমানবাহিনীর জন্য করা হচ্ছিল এবং হামলার আগেই বিষয়টি ইসরাইলকে জানানো হয়েছিল।

এই বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। সিরিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত এবং তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাক বলেছেন, ইসরাইল যে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তুর্কি সামরিক উপস্থিতির আশঙ্কা করেছিল, ওয়াশিংটনের যাচাইয়ে সেই দাবি সত্য বলে প্রতীয়মান হয়নি।

ব্যারাক আরও বলেছেন, হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা তুরস্ককে আগাম জানানো হয়নি। এমন পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, কারণ তুরস্ক সামরিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখালে দুই আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটি সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশে, তুরস্ক সীমান্ত থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সময় ঘাঁটিটি একাধিকবার হাতবদল হয়েছে এবং ২০১৩ সাল থেকে পূর্ণাঙ্গ সামরিক বিমানঘাঁটি হিসেবে কার্যত অচল ছিল। বাশার আল-আসাদের পতনের পর নতুন সিরীয় বাহিনীর প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে জায়গাটি ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে স্থানীয় সামরিক সূত্র জানিয়েছে।

সিরিয়ার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তুরস্কের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সমর্থক আঙ্কারা। সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং পুনর্গঠন কার্যক্রমেও তুরস্ক সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

অন্যদিকে সিরিয়ায় তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাবকে সতর্কতার সঙ্গে দেখছে ইসরাইল। বিশেষ করে উন্নত রাডার, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন হলে তা ইসরাইলের আকাশপথে সামরিক তৎপরতার ওপর নতুন সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে দেশটির নিরাপত্তা মহলে।

এ কারণেই ইসরাইল সিরিয়ার সামরিক পুনর্গঠন পুরোপুরি ঠেকাতে চায় না বলে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা সূত্রের ভাষ্য। তবে সেই সক্ষমতা যেন ইসরাইলের সীমান্ত এবং বিমানবাহিনীর কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য পর্যায়ে না যায়, সেটিকে তেলআবিব তার ‘রেড লাইন’ হিসেবে বিবেচনা করছে।

তবে এই ‘রেড লাইন’ কোথায় শেষ হবে এবং সিরিয়ার সার্বভৌম সামরিক পুনর্গঠন কোথা থেকে শুরু হবে—সেটি নিয়েই মূল বিরোধ। দামেস্ক বলছে, নিজের ভূখণ্ডে সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের অধিকার সিরিয়ার রয়েছে। সাম্প্রতিক ইসরাইলি হামলাকে দেশটির সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন হিসেবেও নিন্দা করেছে সিরীয় সরকার।

তুরস্কও একই ধরনের ভাষায় হামলার সমালোচনা করেছে। আঙ্কারার অভিযোগ, সিরিয়ার স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হওয়ার মতো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং ইসরাইল নিজের নিরাপত্তার যুক্তি ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরে অভিযান চালাচ্ছে।

তবে তীব্র বাকযুদ্ধের মধ্যেও গোপন যোগাযোগ চালু থাকার তথ্য দেখাচ্ছে, দুই পক্ষই সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন। তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর অধিকারী। অন্যদিকে ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি। ফলে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুধু সিরিয়া নয়, গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আমূল পাল্টে দিতে পারে।

এই ঝুঁকি কমাতে যুক্তরাষ্ট্রও একটি আরও আনুষ্ঠানিক ‘ডিকনফ্লিকশন মেকানিজম’ বা সংঘর্ষ এড়ানোর যোগাযোগব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে। টম ব্যারাক জানিয়েছেন, তুরস্ক, ইসরাইল এবং সিরিয়ার মধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে ওয়াশিংটন কাজ করছে। এর লক্ষ্য হবে সামরিক তৎপরতা সম্পর্কে আগাম তথ্য বিনিময় এবং ভুল হিসাব থেকে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করা।

আবু আল-দুহুর হামলার ঘটনাই এমন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাটি আগে জানানো না হওয়ায় আঙ্কারা পরিস্থিতিকে সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে পারত। তুরস্ক পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নিলে সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।

সিরিয়ার জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল। দেশটি দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। এই প্রক্রিয়ায় তুরস্কের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগকে পুরোপুরি উপেক্ষা করাও দামেস্কের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে সিরিয়া ও ইসরাইলের মধ্যে নিরাপত্তা আলোচনা আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন সিরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে আস্থার ঘাটতি গভীর হলেও দামেস্ক ইসরাইলি হামলা বন্ধ এবং স্থিতিশীল নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরির জন্য আলোচনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী।

এমন পরিস্থিতিতে তুরস্ক-ইসরাইল উত্তেজনা সিরিয়া ও ইসরাইলের সম্ভাব্য আলোচনাকেও প্রভাবিত করতে পারে। কারণ দামেস্কের নতুন সরকারের সঙ্গে আঙ্কারার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। ফলে সিরিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোয় তুরস্কের ভূমিকা কোন পর্যায়ে থাকবে, সেটি ভবিষ্যৎ যেকোনো সমঝোতার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠছে।

আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের নজর এখন তাই শুধু প্রকাশ্য বিবৃতি কিংবা বিমান হামলার দিকে নয়। পর্দার আড়ালে কী ধরনের বার্তা বিনিময় হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গোপন যোগাযোগ সফল হলে অন্তত অনিচ্ছাকৃত সংঘর্ষের ঝুঁকি কমতে পারে।

তবে গোপন যোগাযোগ থাকলেও পারস্পরিক সন্দেহ কমেছে—এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। ইসরাইল সিরিয়ায় তুরস্কের উন্নত সামরিক ব্যবস্থা স্থাপনকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখছে। তুরস্ক আবার সিরিয়ার সঙ্গে নিজের বৈধ প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় ইসরাইলের হস্তক্ষেপ মেনে নিতে রাজি নয়।

ফলে এখনকার পরিস্থিতিকে শান্তি বলা কঠিন। বরং এটি এমন এক উত্তেজনাপূর্ণ ভারসাম্য, যেখানে দুই পক্ষ প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান বজায় রেখে আড়ালে সংঘর্ষ এড়ানোর চেষ্টা করছে।

আগামী দিনে সিরিয়ার সামরিক পুনর্গঠন কত দ্রুত এগোয় এবং সেখানে তুরস্ক কী ধরনের সরঞ্জাম কিংবা জনবল মোতায়েন করে, তার ওপর উত্তেজনার মাত্রা অনেকাংশে নির্ভর করবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত যোগাযোগব্যবস্থা কার্যকর হলে সামরিক ভুল হিসাব থেকে বড় সংঘর্ষের ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে।

আপাতত ইসরাইলের বার্তা পরিষ্কার—তুরস্কের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না তেলআবিব। আবার নিজের ঘোষিত নিরাপত্তাসীমা অতিক্রম হয়েছে বলে মনে করলে সামরিক পদক্ষেপ থেকেও পিছিয়ে থাকবে না। এই দ্বৈত অবস্থানের মধ্যেই সিরিয়াকে ঘিরে তুরস্ক ও ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন এক আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরি করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত