প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মাঠে গোলের পর ছুটে চলা আর্লিং হালান্ডের পরিচিত দৃশ্যের সঙ্গে যেন অবিচ্ছেদ্য হয়ে গিয়েছিল তার লম্বা সোনালি চুল। কখনো পনিটেল, কখনো খোলা চুল কিংবা ভিন্ন ধরনের বিনুনি—গত কয়েক বছরে ম্যানচেস্টার সিটি ও নরওয়ের এই গোলমেশিনের আলাদা পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছিল তার ‘ভাইকিং’ লুক। নতুন মৌসুম শুরুর ঠিক আগে সেই পরিচিত রূপেই বড় পরিবর্তন আনলেন হালান্ড। লম্বা চুল কেটে ছোট করে ছাঁটা নতুন হেয়ারস্টাইলে হাজির হয়েছেন ২৬ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার।
রোববার (২৩ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের নতুন রূপ প্রকাশ করেন হালান্ড। ভিডিওর শুরুতে পরিচিত লম্বা চুলে দেখা যায় তাকে। এরপর দৃশ্য পরিবর্তনের সঙ্গে সামনে আসে একেবারে ছোট করে ছাঁটা চুলের নতুন হালান্ড। নতুন মৌসুমে ম্যানচেস্টার সিটির প্রথম প্রিমিয়ার লিগ ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগেই এই পরিবর্তন প্রকাশ করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হালান্ড নিজের নতুন চুলের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে লিখেছেন, “New season, new trim.” আরেকটি পোস্টে মজার ছলে ব্যবহার করেছেন “Short hair don’t care” কথাটিও। অল্প সময়ের মধ্যেই ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে তার নতুন লুকের ছবি।
হালান্ডের নতুন হেয়ারস্টাইলকে পুরোপুরি প্রচলিত ‘বাজ কাট’ বলার চেয়ে ছোট করে ছাঁটা ‘ক্রপড’ স্টাইল বলা বেশি যথাযথ। প্রিমিয়ার লিগের আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটও তার নতুন চুলকে ‘short back and sides’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। অর্থাৎ দীর্ঘদিনের লম্বা সোনালি চুল এবার প্রায় সম্পূর্ণই ছোট করেছেন নরওয়েজিয়ান তারকা।
পরিবর্তনটি হঠাৎ মনে হলেও এর আভাস আগেই দিয়েছিলেন হালান্ড। গত জুনে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ভবিষ্যতে কখনো নিজের লম্বা চুল কাটবেন কি না। খুব সংক্ষেপে তিনি জানিয়েছিলেন, কাটবেন। প্রায় দুই মাস পর সেই কথাই বাস্তবে রূপ দিলেন সিটির গোলমেশিন।
হালান্ডের লম্বা চুল গত কয়েক বছরে শুধু ব্যক্তিগত স্টাইলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ফুটবল মাঠে তার পরিচিতির একটি অংশ হয়ে উঠেছিল এটি। সুঠাম শারীরিক গঠন, বিধ্বংসী গতি এবং পনিটেলে বাঁধা সোনালি চুলের কারণে ভক্তদের কাছে তার ‘ভাইকিং’ পরিচিতি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
কখনো ম্যাচের শুরুতে চুল পেছনে শক্ত করে বাঁধা থাকত। আবার গোল উদ্যাপন কিংবা ম্যাচের কোনো পর্যায়ে চুল খুলে যেত। সেই দৃশ্যও ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছিল।
এ কারণেই হালান্ডের নতুন রূপ প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া এসেছে দুই ধরনের। অনেক সমর্থক নতুন ছোট চুলের প্রশংসা করেছেন। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে তার পরিচিত লুক পছন্দ করা অনেক ভক্ত কিছুটা হতাশাও প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ মজার ছলে লিখেছেন, নতুন চুল নিয়ে হালান্ড আরও ভয়ংকর গোলস্কোরার হয়ে উঠবেন।
নতুন লুকের পুরো প্রক্রিয়াও ভক্তদের সামনে তুলে ধরেছেন হালান্ড। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছোট ভিডিওর পাশাপাশি ইউটিউবে প্রায় সাত মিনিটের একটি ভিডিও প্রকাশ করে চুল কাটার মুহূর্ত এবং কাছের মানুষদের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তিনি। সেখানে নতুন চেহারা ঘিরে হাসি-ঠাট্টাও দেখা গেছে।
হালান্ডের চুল নিয়ে আলোচনা অবশ্য নতুন কিছু নয়। মাঠে তার পারফরম্যান্সের পাশাপাশি এই স্টাইল বহুবার সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জায়গা পেয়েছে। তরুণ ফুটবল সমর্থকদের মধ্যেও তার পনিটেল বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
সাবেক ম্যানচেস্টার সিটি তারকা কেভিন ডি ব্রুইনেও একসময় জানিয়েছিলেন, হালান্ডের জনপ্রিয়তার প্রভাব শিশুদের মধ্যেও দেখা যায়। তার নিজের সন্তানদের লম্বা চুল এবং স্কুলে অন্য শিশুদের একই ধরনের স্টাইল দেখে বিষয়টি মজার বলে মন্তব্য করেছিলেন বেলজিয়ান মিডফিল্ডার।
ফুটবল তারকাদের ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিগত স্টাইল অনেক সময় তাদের ব্র্যান্ড পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। ডেভিড বেকহামের বিভিন্ন হেয়ারস্টাইল কিংবা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পরিবর্তিত লুক যেমন বছরের পর বছর আলোচিত হয়েছে, হালান্ডের লম্বা সোনালি চুলও আধুনিক ফুটবলে তার নিজস্ব দৃশ্যমান পরিচয় তৈরি করেছিল।
নতুন হেয়ারস্টাইলের সময়টাও তাই বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬-২৭ মৌসুমের প্রিমিয়ার লিগ অভিযান শুরু করার ঠিক আগে এমন পরিবর্তন এনেছেন তিনি। রোববার বোর্নমাউথের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম লিগ ম্যাচ খেলতে নামার কথা ম্যানচেস্টার সিটির। ফলে নতুন লুকে প্রথম প্রতিযোগিতামূলক লিগ ম্যাচে হালান্ড কেমন করেন, সেটিও সমর্থকদের বাড়তি আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।
এর আগে কমিউনিটি শিল্ডে আর্সেনালের বিপক্ষে পুরোনো পনিটেল নিয়েই মাঠে দেখা গিয়েছিল তাকে। সেই ম্যাচটি অবশ্য ম্যানচেস্টার সিটির জন্য সুখকর হয়নি। আর্সেনালের কাছে ৩-০ ব্যবধানে হেরে যায় সিটি। নতুন কোচ এনজো মারেস্কার অধীনে সেটি ছিল সিটির হতাশাজনক শুরু।
হালান্ডও ম্যাচটিতে নিজের পরিচিত বিধ্বংসী রূপ দেখাতে পারেননি। ফলে নতুন মৌসুমে সিটির আক্রমণভাগ কতটা কার্যকর হবে এবং মারেস্কার নতুন কৌশলে হালান্ড কীভাবে মানিয়ে নেবেন, সেই প্রশ্ন সামনে রয়েছে।
গত মৌসুমেও অবশ্য গোলের সামনে নিজের ভয়ংকর সক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন নরওয়েজিয়ান তারকা। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৮ গোল করেন তিনি। ২০২৬ বিশ্বকাপেও নরওয়ের হয়ে পাঁচ ম্যাচে সাত গোল করেন হালান্ড।
বিশ্বকাপে নরওয়ের যাত্রাটাও ছিল স্মরণীয়। দলটি কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছিল। শেষ আটে ইংল্যান্ডের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ২-১ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় নরওয়ে। সেই ম্যাচে হালান্ডকে আটকে রাখতে সফল হয়েছিল ইংলিশ রক্ষণ।
বিশ্বকাপ শেষে কিছুদিন বিশ্রামেও ছিলেন হালান্ড। জুলাইয়ে ইতালির সিসিলিতে ছুটি কাটাতে দেখা যায় তাকে। তাওরমিনায় ডলচে অ্যান্ড গাব্বানার একটি অনুষ্ঠানে অতিথি হওয়ার পাশাপাশি ইয়টে সময় কাটানোর পরিকল্পনাও ছিল তার।
বিশ্বকাপের ব্যস্ততা এবং গ্রীষ্মের ছুটি পেরিয়ে এবার আবার ক্লাব ফুটবলের কঠিন সূচিতে ফিরছেন হালান্ড। সেই প্রত্যাবর্তনের ঠিক আগেই বাহ্যিক রূপে বড় পরিবর্তন এনে যেন নিজের মতো করে নতুন অধ্যায়ের ঘোষণা দিলেন তিনি।
ম্যানচেস্টার সিটিতেও এবার পরিবর্তন কম নয়। দীর্ঘ সময়ের সফল অধ্যায়ের পর পেপ গার্দিওলার জায়গায় দায়িত্ব নিয়েছেন এনজো মারেস্কা। ফলে নতুন কোচের দর্শন এবং কৌশলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে খেলোয়াড়দের সামনে। কমিউনিটি শিল্ডের হার সেই কাজ যে সহজ হবে না, তার প্রাথমিক ইঙ্গিতও দিয়েছে।
তবে গোল করার প্রশ্নে হালান্ডের পরিসংখ্যান এখনও ভয়ংকর। ২০২২ সালে বরুসিয়া ডর্টমুন্ড থেকে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়ার পর ইংলিশ ফুটবলে দ্রুতই নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। সিটির হয়ে ১৯৯ ম্যাচে ১৬২ গোল করেছেন হালান্ড। এর মধ্যে প্রিমিয়ার লিগেই তার গোল ১১২টি।
সিটির ঐতিহাসিক ট্রেবল জয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার। এরপর ব্যক্তিগত ও দলীয় পর্যায়ে একের পর এক সাফল্য এসেছে। ফলে নতুন মৌসুমেও প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের প্রধান দুশ্চিন্তার নাম যে হালান্ডই থাকবেন, তা নিয়ে সন্দেহ সামান্য।
এবার অবশ্য গোলের পাশাপাশি আলোচনায় থাকবে নতুন চেহারাও। পরিচিত পনিটেল ছাড়াই মাঠে ছুটবেন নরওয়ের গোলমেশিন। বছরের পর বছর যে চুল তার উদ্যাপন, বিজ্ঞাপন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত ছবির অংশ হয়ে ছিল, সেটিই এখন অতীত।
ভক্তদের কেউ নতুন রূপ পছন্দ করছেন। কেউ আবার পুরোনো ‘ভাইকিং’ হালান্ডকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকার কথা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মজা করে নতুন হালান্ডকে নিয়ে গোলের পূর্বাভাসও দেওয়া হচ্ছে।
তবে হালান্ডের নিজের কাছে ব্যাপারটি সম্ভবত আরও সহজ—নতুন মৌসুম, নতুন চুল। শেষ পর্যন্ত ফুটবল মাঠে তার আসল পরিচয় তৈরি হবে গোল দিয়েই।
চুল ছোট হয়েছে, পনিটেল হারিয়েছে। কিন্তু প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের সামনে হালান্ডের ক্ষুধা কতটা বদলেছে, সেই উত্তর পাওয়া যাবে নতুন মৌসুমের মাঠে।