কলকাতার হোটেল অগ্নিকাণ্ডে আতঙ্ক, ফিরছেন বাংলাদেশিরা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৭ বার

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশিসহ নয়জনের মৃত্যুর পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশি পর্যটকদের মধ্যে। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে অনেকে নির্ধারিত সময়ের আগেই হোটেল ছেড়ে দেশে ফিরছেন। অগ্নিকাণ্ডের পর প্রশাসন একাধিক আবাসিক হোটেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন নিউমার্কেটকেন্দ্রিক হোটেল ব্যবসায়ীরাও।

কলকাতা পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, মধ্য কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের পাঁচতলা একটি ভবনে থাকা ‘শিখা ইন’ হোটেলে গভীর রাতে আগুন লাগে। ঘন ধোঁয়া ভবনের ভেতর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে অনেক অতিথি কক্ষেই আটকা পড়েন। উদ্ধারকর্মীরা প্রায় ৮০ জনকে ভবন থেকে বের করে আনলেও নয়জনের মৃত্যু হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের সাতজন বাংলাদেশি নাগরিক বলে শনাক্ত হন।

ঘটনার পর থেকেই নিউমার্কেটসংলগ্ন সদর স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট, লিন্ডসে স্ট্রিট ও মির্জা গালিব স্ট্রিটে থাকা বাংলাদেশি পর্যটকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে পরিচিত। বিশেষ করে চিকিৎসা, কেনাকাটা কিংবা স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণে যাওয়া বাংলাদেশিদের বড় অংশ তুলনামূলক কম খরচে থাকার জন্য এই এলাকার হোটেল ও গেস্টহাউস বেছে নেন।

অগ্নিকাণ্ডের পর পশ্চিমবঙ্গের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিরাপত্তা তদারকি জোরদার করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অগ্নিনিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে অন্তত ১১টি হোটেল বন্ধ করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক বাংলাদেশি পর্যটক দ্রুত হোটেল ছাড়ছেন কিংবা বিকল্প আবাসন খুঁজছেন। কেউ কেউ নির্ধারিত সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন।

নিউমার্কেটের এই এলাকা স্থানীয়ভাবে ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামেও পরিচিত। বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর নির্ভর করে এখানে বহু হোটেল, রেস্তোরাঁ, মানি এক্সচেঞ্জ, পরিবহন কাউন্টার ও ছোট ব্যবসা গড়ে উঠেছে। কয়েক বছর ধরে করোনা মহামারি এবং বাংলাদেশ-ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবে পর্যটক কমে যাওয়ার পর ব্যবসা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছিল। নতুন অগ্নিকাণ্ড সেই পুনরুদ্ধারেও বড় ধাক্কা দিয়েছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করছেন।

অগ্নিকাণ্ডের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। কলকাতা পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের ফায়ার অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সার্ভিস সংশ্লিষ্ট ভবন খালি ও সিল করার নির্দেশ দেয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত দল বা এসআইটি গঠন করা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অবহেলা কিংবা অগ্নিনিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘিত হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।

ঘটনায় শিখা ইনের লিজগ্রহীতা আবু জাফরকে গ্রেপ্তার করেছে কলকাতা পুলিশ। পাশাপাশি আরও দুজন কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করেছে এবং আগুনের কারণসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণের চেষ্টা চালাচ্ছে।

তদন্তে বৈদ্যুতিক ত্রুটির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্ত সম্পন্ন না হওয়ায় আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা হয়নি। প্রাথমিক প্রতিবেদনে ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না বলে অভিযোগ সামনে এসেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবনটি মূলত আবাসিক হিসেবে নির্মিত হলেও পরবর্তী সময়ে এর বিভিন্ন অংশ বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার হতে থাকে। সেখানে একাধিক গেস্টহাউস, লজ, অফিস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছিল। আগুন লাগা ভবনটি পশ্চিমবঙ্গ ফায়ার ব্রিগেডের সদর দপ্তর থেকেও খুব বেশি দূরে নয়।

এ ঘটনায় কলকাতা পৌর কর্তৃপক্ষ শহরের হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনায় উদ্যোগ নিয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ফলে নিউমার্কেট এলাকায় যেসব ছোট হোটেল কিংবা গেস্টহাউস বছরের পর বছর পুরোনো ভবনে পরিচালিত হচ্ছে, তাদের লাইসেন্স, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা এবং অগ্নিনিরাপত্তার প্রস্তুতি নতুন করে scrutiny-র মুখে পড়েছে।

বাংলাদেশি পর্যটকদের অভিযোগ, এ অঞ্চলের কিছু হোটেলের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ অত্যন্ত সরু। আবার পুরোনো ভবনের ভেতরে ছোট জায়গা ভাগ করে একাধিক কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। জরুরি অবস্থায় দ্রুত বের হওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা সব জায়গায় দেখা যায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে পুরো এলাকার সব হোটেলের ক্ষেত্রে একই পরিস্থিতি রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো সরকারি পূর্ণাঙ্গ অডিট এখনো প্রকাশিত হয়নি।

অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেল নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কের পাশাপাশি মানবিক বেদনাও গভীর। নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে একই পরিবারের কয়েকজন ছিলেন বলে বাংলাদেশি ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। তারা চিকিৎসাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে ভারতে গিয়েছিলেন। আগুনের ঘটনায় মৃত্যু হওয়ায় স্বজনদের মধ্যে শোক নেমে আসে। নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশন সহযোগিতা করেছে।

অগ্নিকাণ্ডের পর বেঁচে ফেরা মানুষের অভিজ্ঞতাও পর্যটকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ঘন ধোঁয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অনেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাননি। উদ্ধারকারী বাহিনীর সদস্যরা ভবন থেকে বহু মানুষকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হন। নিহতদের বেশিরভাগের মৃত্যুর পেছনে ধোঁয়ার কারণে শ্বাসরোধের বিষয়টি প্রাথমিক চিকিৎসা তথ্যেও উঠে এসেছে।

বাংলাদেশিদের কাছে কলকাতা দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা ও পর্যটনের অন্যতম পরিচিত গন্তব্য। ভাষাগত মিল, তুলনামূলক সহজ যোগাযোগ এবং বিভিন্ন হাসপাতালের অবস্থানের কারণে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী বিশেষ করে সীমিত বাজেটের রোগী ও স্বজনদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নিউমার্কেট এলাকায় আবার একই সঙ্গে হোটেল, খাবার, পরিবহন ও অর্থ বিনিময়ের সুবিধা পাওয়া যায়। ফলে এই অঞ্চলের হোটেল ব্যবসার সঙ্গে বাংলাদেশি পর্যটকের সম্পর্ক বহু বছরের। বর্তমান আতঙ্ক দীর্ঘস্থায়ী হলে স্থানীয় পর্যটননির্ভর ব্যবসার ওপর তার বড় অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে।

এ কারণেই অগ্নিকাণ্ডের পর বাংলাদেশি পর্যটকদের দ্রুত চলে যাওয়ার প্রবণতা স্থানীয় হোটেল মালিকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পর্যটকের সংখ্যা কমে গেলে শুধু হোটেল নয়, আশপাশের রেস্তোরাঁ, দোকান, ট্রাভেল এজেন্সি, পরিবহন প্রতিষ্ঠান এবং মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসাও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

তবে পর্যটকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিরাপত্তা নিয়ে দৃশ্যমান ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বৈধ লাইসেন্স রয়েছে কি না, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আছে কি না, বৈদ্যুতিক সংযোগ নিরাপদ কি না এবং জরুরি বের হওয়ার বিকল্প পথ রয়েছে কি না—এসব বিষয় নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

অগ্নিকাণ্ডের পর প্রশাসনিক তৎপরতাও বেড়েছে। কিন্তু স্থানীয়দের একটি অংশের প্রশ্ন, এত বড় দুর্ঘটনার আগে কেন ঝুঁকিগুলো শনাক্ত করা হয়নি। বিশেষ করে একাধিক ছোট হোটেল একই ভবনের মধ্যে পরিচালিত হলে সেখানে সর্বোচ্চ কতজন অতিথি থাকতে পারবেন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে তাদের কীভাবে সরিয়ে নেওয়া হবে, এসব বিষয়ে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।

অবৈধভাবে হোটেল পরিচালনা কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশের যেসব অভিযোগ স্থানীয়ভাবে উঠেছে, সেগুলো এখনো তদন্তাধীন। নির্ভরযোগ্য তদন্তে প্রমাণ ছাড়া কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

বর্তমানে কলকাতা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের তদন্তের ওপর নজর রয়েছে বাংলাদেশি পর্যটক এবং নিহতদের পরিবারের। তদন্তে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, নিরাপত্তায় কী ধরনের ঘাটতি ছিল এবং কারও অবহেলা প্রাণহানিতে ভূমিকা রেখেছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে কলকাতায় অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য ঘটনাটি কঠিন একটি সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। কম খরচে থাকার সুবিধার পাশাপাশি হোটেল বাছাইয়ের সময় জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা এবং বৈধতার বিষয়গুলো যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে।

হোটেল শিখা ইনের আগুন তাই এখন শুধু একটি ভবনের দুর্ঘটনা নয়। সাত বাংলাদেশিসহ নয়জনের প্রাণহানির ঘটনায় পর্যটন, হোটেল নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক নজরদারি—তিনটি বিষয়ই বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আতঙ্কে যারা কলকাতা ছেড়ে ফিরছেন, তাদের আস্থা পুনরুদ্ধারে তদন্তের পাশাপাশি বাস্তব ও দৃশ্যমান নিরাপত্তা সংস্কারই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত