সংসদের তৃতীয় অধিবেশন আজ, অগ্রাধিকার কমিটি ও বিল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৫ বার
সংসদের তৃতীয় অধিবেশন আজ, অগ্রাধিকার কমিটি ও বিল

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেল ৩টায় শুরু হচ্ছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে বসবে এই অধিবেশন। রাজনৈতিক ও জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় সামনে রেখে এবারের অধিবেশনকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিল উত্থাপন ও আইন প্রণয়নের কার্যক্রমে এবার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, তৃতীয় অধিবেশনে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গঠনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের নাম পাওয়া মাত্রই কমিটিগুলো চূড়ান্ত করা হবে। সংসদীয় কার্যক্রমকে আরও গতিশীল এবং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাজের ওপর কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে এসব কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো মূলত সংসদের কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাতীয় সংসদে কোনো আইন পাস হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা, আলোচনা ও প্রয়োজনীয় যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হয় এসব কমিটির মাধ্যমে। একই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা, নীতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেওয়ার ক্ষেত্রেও কমিটিগুলোর ভূমিকা রয়েছে। ফলে নতুন সংসদের শুরুতে কমিটিগুলো গঠনকে কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চিফ হুইপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের অধিবেশনটি পাঁচ, সাত অথবা ১০ দিনের সংক্ষিপ্ত অধিবেশন হতে পারে। তবে সংসদের কাজের পরিমাণ ও প্রয়োজন বিবেচনায় অধিবেশনের মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে। অর্থাৎ প্রাথমিকভাবে স্বল্প সময়ের জন্য অধিবেশন বসানোর পরিকল্পনা থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন বা সংসদীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হলে সেই সময় বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।

তৃতীয় অধিবেশনে প্রায় ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিল উত্থাপনের সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। এর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং মানবাধিকার সুরক্ষাসংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব আইন সাধারণ মানুষের জীবন, অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত হওয়ায় সংসদে এগুলো নিয়ে আলোচনা জনসাধারণের আগ্রহেরও বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইনে বাবা-মায়ের সম্পত্তি সন্তানদের নামে লিখে দেওয়ার পরও তাঁদের জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগদখল ও ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। প্রচলিত সামাজিক বাস্তবতায় অনেক বাবা-মা জীবনের শেষ পর্যায়ে সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। কিন্তু সম্পত্তি হস্তান্তরের পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের প্রতি অবহেলা বা অসহযোগিতার অভিযোগও সামনে আসে। প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে এমন পরিস্থিতিতে বাবা-মায়ের অধিকার সুরক্ষার একটি আইনি কাঠামো তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

আইনটি চূড়ান্ত হলে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে শুধু মালিকানা পরিবর্তনের বিষয় নয়, সম্পত্তির ওপর পূর্ববর্তী মালিকের ব্যবহার ও ভোগের অধিকারও আইনি সুরক্ষার আওতায় আসতে পারে। এর ফলে বিশেষ করে প্রবীণ বাবা-মায়ের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নতুন একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রস্তাবিত আইনের সুনির্দিষ্ট বিধান, প্রয়োগের ধরন এবং বাস্তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা ও চূড়ান্ত অনুমোদনের ওপর।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত আইনও এবারের অধিবেশনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেতে পারে। গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের জন্য প্রতিকার নিশ্চিত করা, ঘটনার তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার মতো বিষয় এ ধরনের আইনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলো তাদের স্বজনদের অবস্থান ও ভাগ্য সম্পর্কে জানতে চেয়ে যে অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাদের জন্য এ ধরনের আইনি উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করতে পারে।

মানবাধিকার সুরক্ষাসংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইনও জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তৈরি করতে পারে। নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা, অভিযোগের প্রতিকার, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহির মতো বিষয়গুলো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সংসদে এ ধরনের বিল উত্থাপিত হলে শুধু আইন প্রণয়নের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়, এর বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে হবে—সেটিও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।

এবারের অধিবেশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংসদীয় কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও গতিশীল করার প্রত্যাশা। জাতীয় সংসদে সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলের ভূমিকা গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নোত্তর, আলোচনা, বিল পর্যালোচনা, বিভিন্ন প্রস্তাব এবং সংসদীয় কমিটির কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদে মতামত প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে সংসদীয় কমিটিগুলো দ্রুত গঠন হলে নিয়মিত তদারকি ও পর্যালোচনার কাজও আরও সক্রিয় হতে পারে।

তৃতীয় অধিবেশনকে ঘিরে রাজনৈতিকভাবেও আগ্রহ রয়েছে। নতুন সংসদের কার্যক্রম কোন পথে এগোয়, আইন প্রণয়নে কতটা গতি আসে এবং সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংসদীয় বিতর্ক কতটা কার্যকর হয়—এসব বিষয় পর্যবেক্ষণে থাকবে রাজনৈতিক মহল। একই সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশা থাকবে, সংসদের ভেতরের আলোচনা যেন দেশের বাস্তব সমস্যা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত থাকে।

সংসদীয় কার্যক্রম শুধু আইন পাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি কার্যকর সংসদ সরকারের নীতি ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। তাই নতুন সংসদের প্রতিটি অধিবেশনই দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করে। তৃতীয় অধিবেশনে সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যায়, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন ১৫ জুলাই শেষ হয়। এরপর প্রায় দেড় মাসের ব্যবধানে তৃতীয় অধিবেশন বসছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির আহ্বানে এই অধিবেশন শুরু হচ্ছে। প্রথম দিনের কার্যসূচিতে সংসদীয় কমিটি গঠনের পাশাপাশি কয়েকটি বিল উত্থাপন এবং বেসরকারি সদস্যদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত-প্রস্তাবও থাকার কথা রয়েছে।

সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনকে আইন প্রণয়ন, সংসদীয় কমিটি গঠন এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্পত্তি হস্তান্তর থেকে শুরু করে গুম ও মানবাধিকার সুরক্ষার মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আলোচনা হলে তা সাধারণ মানুষের জীবন ও অধিকারেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আজকের অধিবেশন শুধু সংসদ ভবনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং গুরুত্বপূর্ণ কিছু আইন ও সংসদীয় কাঠামোর ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নির্ধারণে এর আলোচনা ও সিদ্ধান্ত বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত